মহাস্থানগড় সম্পর্কে জানুন

0

পূর্ব ও উত্তর পাশে করতোয়া নদী, পশ্চিমে কালীদহ সাগরখ্যাত জলাশয় আর পশ্চিম-দক্ষিণে বারনসি খাল দিয়ে ঘেরা এলাকাটি এখন মহাস্থানগড় নামে পরিচিত। ইতিহাসে এর পরিচয় এক প্রসিদ্ধ নগরী হিসেবে। পুণ্ড্রনগর নামে অভিহিত সেই নগরীটি তৃতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে পঞ্চদশ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে মৌর্য, সুঙ্গ, গুপ্ত, পাল, সেন প্রভৃতি বৌদ্ধ ও হিন্দু রাজবংশের রাজত্বের রাজধানী ও শাসনকেন্দ্র ছিল। দেশের সর্বপ্রাচীন নগরী বা সমৃদ্ধ প্রাচীন জনপদের নাম উঠলেই উচ্চারিত হয় পুণ্ড্রবর্ধনের নাম। এই জনপদের রাজধানীটি কালের বিবর্তনে প্রোথিত হয়েছে মহাস্থানগড়ের ভূগর্ভে। মহাস্থানগড় তাই বিশ্ব ঐতিহ্যে (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) স্থান পাওয়ার অপেক্ষায়। এ জন্য গড় এলাকায় এখনো পুরোদমে চলছে উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ। সেই সঙ্গে দীর্ঘ বিরতির পর পুণ্ড্রনগরের শহরতলি ভাসুবিহারেও প্রত্নতাত্ত্বিক খনন জোরদার হয়। আড়াই হাজার বছরের সভ্যতা নিয়ে মাটির নিচে নগরীটি চাপা পড়লেও তার দুর্গপ্রাচীর আর প্রবেশদ্বারের ধ্বংসাবশেষ এখনো দৃশ্যমান।

image_384_71887

প্রত্নতাত্ত্বিক খননে বেরিয়ে আসা নানা নিদর্শন যেমন পর্যটকদের এখানে টানে, একইভাবে বৌদ্ধ, হিন্দু আর মুসলমানদের তীর্থস্থান হিসেবেও বর্তমানের মহাস্থানগড়ে আসে হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী। আর শুধু মহাস্থানগড়ই নয়, এর পার্শ্ববর্তী প্রায় পাঁচ বর্গমাইল এলাকায় প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের নানা ইতিহাস-ঐতিহ্য আর স্থাপত্য নিদর্শন ছড়িয়ে থাকায় সেসব স্থানও সমান আকর্ষণীয় সর্বসাধারণের কাছে।

বগুড়া শহর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তরে শিবগঞ্জ উপজেলায় মহাস্থানগড়ের অবস্থান। সমতলভূমির চেয়ে ১৫ থেকে ৪৫ ফুট উঁচু বলে এই এলাকাটি গড় (উঁচু স্থান) হিসেবে পরিচিত। প্রাচীরবেষ্টিত পাঁচ হাজার ফুট দীর্ঘ ও চার হাজার ৫০০ ফুট প্রশস্ত গড়ের ভেতরে রয়েছে নানা প্রত্ননিদর্শন। এর মধ্যে যেমন পরশুরাম প্যালেস, জিয়ৎ কুণ্ড বা জীবন্ত কূপ, গোবিন্দ ভিটা, বৈরাগীর ভিটা, খোদার পাথর ভিটা, মানকালীর কুণ্ডু, মুনির ঘোন, শিলা দেবীর ঘাট ও মহাস্থান মাজার অবস্থিত; তেমনি নগরীর বাইরের প্রায় পাঁচ বর্গমাইল এলাকার মধ্যে রয়েছে বেহুলার বাসরঘরখ্যাত গোকুল মেড়, ভীমের জাঙ্গাল, ভাসুবিহার, বিহার ধাপসহ নানা প্রত্নস্থল ও নিদর্শন।

mahasthangardh

ইতিহাসে পুণ্ড্রনগর : বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৬৩৮ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি রাজমহলের কাছের জঙ্গল থেকে পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করে গঙ্গা পেরিয়ে পুণ্ড্রবর্ধনে পৌঁছেন। তিনি তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে পুন-ন-ফ-তন-ন নামে যে নগরীর কথা উল্লেখ করেছেন, ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে বুকানন হ্যামিল্টন সেটিই যে বর্তমান মহাস্থানগড় তা নিশ্চিত করে লিপিবদ্ধ করেন। দ্বাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পণ্ডিত পরশুরাম রচিত ‘করতোয়া মাহাত্ম্য’ নামে এক সংস্কৃত কাব্যগ্রন্থেও পুণ্ড্রনগরের উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণেও পুণ্ড্র জাতি ও পুণ্ড্রনগরীর উল্লেখ রয়েছে। এসব যেমন এই জনপদের প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে তার চেয়েও প্রকৃষ্ট প্রমাণ মিলেছে এখানে ১৯৩১ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে প্রাপ্ত ব্রাহ্মী লিপিতে। সেই প্রস্তরখণ্ডের লিপিতে পুণ্ড্রনগরের মহামাত্রকে (প্রাদেশিক শাসক) সম্রাট অশোক দুর্ভিক্ষপীড়িত জনতাকে রাজভাণ্ডার থেকে খাদ্যশস্য ও অর্থ সহায়তার নির্দেশ দেন।

mnazamblog_1250367960_1-Image020

পুণ্ড্রনগর হলো মহাস্থান : মহাস্থান নামটি এসেছে নানা কিংবদন্তি থেকে। এই জনপদের ইতিবৃত্ত নিয়ে রচিত ‘পুণ্ড্র’ গবেষণা গ্রন্থে অধ্যাপক মোস্তফা আলী এবং ‘ইতিকথা-পৌণ্ড্রবর্ধন’ গ্রন্থে অধ্যাপক মো. আব্দুল মান্নান উল্লেখ করেছেন, মহাস্থান শব্দের আভিধানিক অর্থ বিখ্যাত জায়গা। স্থানটির নাম মহাস্থান হয়েছে বিখ্যাত স্নানের জায়গা থেকে। ‘করতোয়া মাহাত্ম্য’ কাব্যগ্রন্থে মহাস্থানকে বিষ্ণুর স্থায়ী আবাসস্থল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রতি ১২ বছর (এক যুগ) পর পৌষ নারায়ণী মেলায় হাজারো পুণ্যার্থী এখানে স্নানের জন্য সমবেত হন এবং প্রতিবছর চৈত্র মাসের অমাবস্যা তিথিতে এখানে স্নান অনুষ্ঠিত হয়। তবে মুসলমানদের কাছে এটি ‘মস্তানগড়’ হিসেবে পরিচিত। শাহ সুলতান মাহমুদ মাহীসওয়ার বলখী (র.) এই নগরী আক্রমণ করে ক্ষত্রিয় নৃপতি পরশুরামকে পরাজিত করে বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন।

Share.



Comments are closed.

Open