একজন শহীদ শিক্ষক এবং একটি দাবী

0

আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি শহীদ ড. জোহা দিবস, ১৯৬৯ সালের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে শহীদ হন ড. জোহা। তিনিই প্রথম বাঙালী শহীদ বুদ্ধিজীবী।

স্যার শহীদ সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা ছিলেন একজন বাঙালী শিক্ষাবিদ এবং অধ্যাপক। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (তৎকালীন রিডার) ছিলেন। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করে।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি দেশের জনগণকে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি, ছাত্রনেতা আমানুল্লাহ আসাদুজ্জামান, ১৫ ফেব্রুয়ারি, সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক শহীদ শামসুজ্জোহার মৃত্যু দেশবাসীকে স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে। শহীদ শামসুজ্জোহাকে দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে গন্য করা হয়। বাংলা ভাষা আন্দোলনের সময়ও তিনি প্রত্যক্ষভাবে আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন।

স্যার শহীদ সৈয়দ মুহম্মদ শামসুজ্জোহার জন্ম মে ১, ১৯৩৪ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলায়। পিতা মুহম্মদ আব্দুর রশীদ ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের নিম্নবেতনভোগী চাকরিজীবি। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। শহীদ শামসুজ্জোহার প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয় পশ্চিমবঙ্গে। বাঁকুড়া জিলা স্কুলে তিনি ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত শিক্ষাগ্রহণ করে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম শ্রেনীতে উত্তীর্ন হন এবং বাঁকুড়া ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে ১৯৫০ সালে প্রথম শ্রেণীতে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন।

দেশ ভাগের পর ১৯৫০ সালের প্রথমদিকে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে শামসুজ্জোহা তার পরিবার নিয়ে পূর্ব বাংলায় চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে স্নাতক সম্মান শ্রেনীতে ভর্তি হন। এসময় ভাষা আন্দোলনের সাথে তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৩ সালে স্নাতক সম্মান পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেনীতে উত্তীর্ন হওয়ার পর তিনি রসায়নবিদ ড. মোকাররম হোসেন খন্দকারের তত্ত্বাবধানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর জন্য গবেষণা শুরু করেন। গবেষণার বিষয় ছিলো “বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে ক্রোমাইট খনিজের জারণ প্রকৃয়া”, যা পরবর্তীকালে ১৯৫৪ সালে লন্ডনের “রসায়ন শিল্প” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৫৪ সালে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স, টেকনোলজিতে অ্যান্ড মেডিসিনে অধ্যয়ন করেন এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৫৫ সালের শেষের দিকে শামসুজ্জোহা পাকিস্তান অর্ডন্যান্স কারখানায় সহযোগী কারখানা পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হন। একই বছর ১৪ ই ডিসেম্বর তিনি যুক্তরাজ্যের সাউথ ওয়েলসে রয়্যাল অর্ডিনেন্স কারখানায় বিষ্ফোরক দ্রব্যের উপর প্রশিক্ষন লাভের জন্য যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে ওয়াহ ক্যান্টনমেন্টে সহকারি পরিচালক পদে যোগদান করেন। ১৯৬১ সালে রয়্যাল অর্ডিনেন্স থেকে ইস্তফা নিয়ে শহীদ জোহা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং একই বছর উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের লেকচারার পদে যোগদান করেন। সেখানে অধ্যাপনাকালে তিনি বৃত্তি নিয়ে পুনরায় লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজে চলে যান। পিএইচডি ও ডিআইসি ডিগ্রি লাভ করে তিনি ১৯৬৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসে পুনরায় অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে তাকে রিডার পদে উন্নীত করা হয়। পরবর্তীবছর ১৯৬৫ সালে তিনি শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষক এবং ১৯৬৬ সালে প্রাধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হন। লন্ডনে গবেষণাকালে তিনি কিছুকাল বেরেট স্ট্রিট ওয়েস্ট লন্ডন কমার্স কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬৮ সালে নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক বছর মেয়াদী বৃত্তি পেলেও বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ছাড়েনি অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাবে।

১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ১৯৬৬-এর ছয় দফা ও ১১ দফা দাবিতে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আনিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। ২০ জানুয়ারি পাকিস্তানী পুলিশের গুলিতে মিছিল করা অবস্থায় ছাত্র ইউনিয়নের নেতা আমানুল্লাহ আসাদুজ্জামান শহীদ হন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করা হয়। এই দুটি হত্যাকান্ডে আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে ওঠে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কেন্দ্রীয় সরকার সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে, সান্ধ্যকালীন আইন জারি করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেইন গেটের সামনের মহাসড়কে পাকিস্তানী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে ।  অনেক ছাত্রের জীবননাশের আশঙ্কা থাকায় খবর পেয়েই তৎকালীন প্রক্টর ড. জোহা স্যার মেইন গেটে ছুটে যান । তখন তিনি বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের শান্ত করার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। শিক্ষার্থীরা পিছু হটতে না চাইলে পাকবাহিনীর ক্যাপ্টেন হাদী তাদের ওপর গুলি করার নির্দেশ দেন।

প্রক্টর শামসুজ্জোহা নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন সেনা সদস্যদের কাছে । তখন ড. জোহা চিৎকার করতে থাকেন। এমনকি তিনি সৈন্যদের উদ্দেশে বলেন, ছাত্ররা ক্যাম্পাসে ফিরে যাবে । এক পর্যায়ে বেলা ১১টার সময় ক্যাপ্টেন হাদী তার পিস্তল দিয়ে ড. জোহাকে গুলি করে । সেদিন ড. জোহার বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল মতিহারের সবুজ চত্বর। অবশেষে হাসপাতালে নেওয়ার পথে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ড. শামসুজ্জোহা মৃত্যর কোলে ঢলে পড়েন। সেদিন তিনি তার জীবন বলিদান করে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করেছিলেন পাকহানাদার বাহিনীর হাত থেকে।

প্রফেসর ড. সৈয়দ মুহম্মদ শামসুজ্জোহা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালে নিলুফার ইয়াসমিনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নিলুফার ইয়াসমিন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের একজন শিক্ষয়িত্রী। ১৯৬৬ সালে এই দম্পতি একটি কন্যাসন্তান লাভ করে।

জোহা স্যারের মৃত্যু তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ভীত নাড়িয়ে দিয়েছিলো এবং প্রভাব ছিলো সূদূরপ্রসারী, যা দেশকে স্বাধীন করতে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলো। দেশ স্বাধীনের পর তার অবদানের কৃতজ্ঞতাস্বরুপ তাকে শহীদ বুদ্ধিজীবির সম্মানে ভূষিত করা হয়। তার মৃত্যুর পরপরই তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার নামানুসারে নবনির্মিত আবাসিক হলের নামকরন করেন শহীদ শামসুজ্জোহা হল। নাটোরে তার নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়াও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ প্রতিবছর জোহা সিম্পজিয়াম পালন করা হয়ে থাকে।  তার নামানুসারে নির্মিত আবাসিক হল শহীদ শামসুজ্জোহা হলের মূল ফটকের পাশে একটি স্মৃতি স্মারক স্ফুলিঙ্গ নির্মান করা হয় ২০১২ সালে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু হয়েছিল পাক- হানাদার বাহিনী হটাও আন্দোলন। সেদিন স্যার নিজের জীবনের বিনিময়ে বাঁচিয়ে ছিলেন হাজারো শিক্ষার্থীর জীবন।

স্যারের অমর উক্তি “আজ আমি ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত,  এরপর কোন গুলি হলে তা ছাত্রকে না লেগে যেন আমার গায়ে লাগে। ” আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ধূলিকণার কাছে চিরভাস্বর হয়ে আছে। এরপর থেকে এই দিনটিকে ড. জোহা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে রাবি কর্তৃপক্ষ। তিনিই পাক-হানাদারদের হাতে নিহত প্রথম বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবী।

ড. জোহার স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মেইন গেটে ড. জোহার গুলীবিদ্ধ হওয়ার স্থানটিতে নির্মাণ করা হয়েছে জোহা স্মৃতি ফলক এবং মেইন গেইট দিয়ে প্রবেশ করলে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থিত শহীদ জোহার মাজার। শহীদ শামসুজ্জোহা হলের সামনে নির্মিত হয়েছে শহীদ শামসুজ্জোহা স্মৃতি ভাস্কর্য ‘স্ফুলিঙ্গ’।

এই দিনটি সমস্ত ছাত্র-শিক্ষকবৃন্দের কাছে অতি গুরুত্ববহ এবং অতি তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন।
কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্যি আমরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও অনেক শিক্ষার্থী এই দিনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে অনেকেই অবগত নয়।

একজন জোহা স্যার হতে পারতো পুরো বাংলাদেশের সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আদর্শ, থাকতে পারতো সকল ছাত্র-শিক্ষার্থীর হৃদয়ে। কিন্তু আমরা বাঙ্গালী,আমরা স্যারকে মনে রাখিনি সেই ভাবে।

সেদিন কোনো ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগেই স্যারের গায়ে গুলি লেগেছিলো।
বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে,সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে অতি তাৎপর্যপূর্ন মহান এই দিবসটি আমরা পালন করতে পারতাম।  কিন্তু আমরা তা করিনি, একাত্তর পরবর্তী কোন সরকার,কোন শিক্ষাবিদ, কোন সাংবাদিক,কোন বুদ্ধিজীবী কোন উদ্যোগ গ্রহন করেননি এই দিনটি যথাযথভাবে দেশব্যাপী পালনে।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বিরল ঘটনা আছে বলে আমার জানা নেই।  সম্প্রতি দেশের শিক্ষকসমাজ স্যারের মৃত্যুদিবসকে “জাতীয় শিক্ষক দিবস” হিসেবে পালনের দাবী জানিয়ে আসলেও আজ পর্যন্ত এই দাবিটি আলোর মুখ দেখে নি।
আমাদের দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা গোটা জাতি কেন এই দিবসটি পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে? এ দিবসটি জাতির সামনে সঠিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য অবিলম্বে ১৮ ই ফেব্রয়ারীকে “জাতীয় শিক্ষক দিবস” হিসেবে ঘোষণা প্রদান এবং প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্য বইয়ে ড. জোহার মহান আত্মত্যাগের ঘটনা তুলে ধরার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখা: এস.কে শরিফ মাহমুদ,
ছাত্র, আইন ও ভূমি প্রশাসন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

তথ্য সূত্র: উইকিপিডিয়া এবং গুগল।

Share.



Comments are closed.

Open