বন্যায় ভেসেছে রাজশাহীর ৫৩ টন মাছ

2

রাজশাহীতে বন্যায় ভেসে গেছে ৩২০ বাণিজ্যিক মাছের খামার। এতে ভেসে গেছে ৫৩ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন মাছ। ২০৮ জন বাণিজ্যিক খামার ও পুকুর মালিকের ক্ষতি হয়েছে ৫৮ লাখ ৩২ হাজার টাকা। পুকুর ভেসে যাওয়ায় রাজশাহী থেকে ঢাকায় তাজা মাছ সরবরাহ কিছুটা হলেও বাধগ্রস্ত হচ্ছে।

জানা গেছে, রাজশাহীর মোহনপুরে শিবনদীর এবং বাগমারা উপজেলায় ফকিন্নি নদীর বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে ১৬ ইউনিয়ন এবং দুই পৌর এলাকা। মোহনপুরের একটি এবং বাগমারার দুটি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙেছে। গত ১৩ আগস্ট বাঁধ ভাঙলেও এখনো মেরামত করতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে ডুবছে আরো লোকালয়।

বন্যা কবলিত হয়েছে বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর ও ভবানীগঞ্জ পৌর এলাকাসহ বাসুপাড়া, কাচারীকোয়ালীপাড়া, গোয়ালকান্দি, গণিপুর, নরদাশ, সোনাডাঙ্গা, দ্বীপপুর, ঝিকড়া, শ্রীপুর এবং যোগীপাড়া ইউনিয়ন। তলিয়ে রয়েছে মোহনপুর উপজেলার ধুরইল, ঘাসিগ্রাম ও মৌগাছি ইউনিয়ন।

অপরিকল্পিত পুকুর খননে ডুবে গেছে দুর্গাপুর, পুঠিয়া ও পবা উপজেলার বিলগুলো। এছাড়া ভারি বৃষ্টিতে তলিয়ে রয়েছে জেলার তানোর উপজেলায় তানোর পৌর এলাকাসহ চান্দুরিয়া, তালন্দ, কামারগাঁও এবং কলমা এলাকা। একই অবস্থা গোদাগাড়ী উপজেলায় বন্যা কবলিত হয়েছে গোদাগাড়ী পৌর এলাকাসহ চব্বিশনগর, বিড়ইল, কাঁঠালবাড়িয়া, ভাটোপাড়া, দেওপাড়া, ঈশ্বরীপুর এবং রিশিকুল ইউনিয়ন। তবে পুঠিয়া বাদে অন্য চার উপজেলার পুকুর ভেসে যাবার খবর নেই মৎস দফতরে।

জেলা মৎস দফতরের সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, জেলার বাগমারা, মোহনপুর এবং পুঠিয়া উপজেলার ৩২০টি পুকুর ভেসে গেছে। এতে ভেসে গেছে ৫৩ দশমিক ২৫ মেট্রিকটন মাছ ও এক দশমিক ১২ টন পোনা। ২০৮ জন বাণিজ্যিক খামার ও পুকুর মালিকের ক্ষতি হয়েছে ৫৮ লাখ ৩২ হাজার টাকা।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার বাগমারা উপজেলায়। সেখানকার ১৫৬ মালিকের ২০৮টি বাণিজ্যিক মাছের খামার ভেসে গেছে। বানের পানিতে ভেসে গেছে ২২ মেট্রিক টন মাছ এবং দশমিক ৭০ মেট্রিক টন পোনা। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩২ লাখ ৪৫ টাকা।

এরপর রয়েছে মোহনপুর উপজেলা। বন্যায় এ উপজেলার ১৮ মালিকের ২৮ পুকুর ভেসে গেছে। ভেসে গেছে ১৪ দশমিক ৩৩ মেট্রিকটন মাছ। সবমিলিয়ে চাষিদের ক্ষতি হয়েছে ১৭ লাখ টাকা। পুঠিয়া উপজেলার ১০ পুকুর মালিকের ক্ষতির পরিমাণ ৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। তাদের ১২ পুকুরের ৩ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন মাছ এবং দশমিক ৪২ মেট্রিক টন পোনা ভেসে গেছে বন্যায়।

জেলা মৎস দফতরের হিসেবে, রাজশাহীতে বছরে মাছের চাহিদা ৫৩ হাজার ৯৯৩ মেট্রিক টন। তবে উৎপাদন হয় ৮০ হাজার ২৮১ মেট্রিক টন। প্রতিবছর উদ্বৃত্ত থাকে ২৬ হাজার ২৮৮ মেট্রিক টন মাছ। রাজশাহী থেকে প্রতিদিন অন্তত ৫০০ ট্রাক তাজা মাছ চলে যায় রাজধানীতে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজশাহী জেলায় ৪১ হাজার ৮৭৬ পুকুর ও দিঘি মিলিয়ে ৭ হাজার ২৯৪ হেক্টর জলাশয়ে মাছ চাষ হচ্ছে। জেলার সড়ক মহাসড়কের পাশের ৩৬৭ দশমিক ৬৮ হেক্টর জলাশয়েও মাছ চাষ হচ্ছে। মাছ চাষের আওতায় রয়েছে এখনকার ৯ হাজার ১৬০ দশমিক ৪৭ হেক্টর আয়তনের ২১টি নদী।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছরই ১২৩ হেক্টর জমিতে পুকুর খনন করা হয়েছে। এবছর আরো ৩০০ হেক্টর জমিতে পুকুর খনন করা হয়। প্রতি বছরই প্রান্তিক কৃষকের জমি গিলছে প্রভাবশালীদের খননযন্ত্র। বাণিজ্যিক খামার গড়তে বিল ও নিচু এলাকায় ফসলি জমিতে একের পর এক পুকুর খনন করেই চলেছেন তারা। জেলার নয় উপজেলায় চলছে অবাধে পুকুর খনন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সাহা বলেন, কয়েক বছরে রাজশাহী অঞ্চলে বেড়েছে মাছের বাণিজ্যিক চাষ। এতে উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ। গত ১৬ আগস্ট পর্যন্ত বন্যায় ৩২০ বাণিজ্যিক মাছের খামার ভেসে গেছে। এতে ভেসে গেছে ৫৩ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন মাছ এবং এক দশমিক ১২ টন পোনা। ২০৮ জন বাণিজ্যিক খামার ও পুকুর মালিকের ক্ষতি হয়েছে ৫৮ লাখ ৩২ হাজার টাকার। অবকাঠামোগত যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বাঁধ মেরামত না হলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, অপরিকল্পিত পুকুর খননেই সৃষ্টি হচ্ছে এ জলাবদ্ধতা। এতে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণ করেননি তারা। তবে তা মাছ চাষের লাভ থেকে কয়েকগুন বেশি হবে। মাছ চাষে কিছু লোক লাভবান হলেও জলাবদ্ধতায় প্রান্তিক চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে তাদের করণীয় নেই জানিয়ে জেলা মৎস কর্মকর্তা বলেন, এনিয়ে কৃষি ও ভূমি দফতরের আইন রয়েছে। তাদেরই এনিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার কথা। কিন্তু নানান জটিলতায় সেটি হচ্ছে না। পুকুর খননের পর বাণিজ্যিক মাছ চাষিরা কেবল পরামর্শের জন্য তাদের কাছে আসেন। আগে আসলে তারা পরিকল্পিত পুকুর খননে চাষিদের নিরুৎসাহিত করতেন।রাজশাহীর মাটি-পানি মাছ চাষের অনুকূল হওয়ায় প্রতিবছরই বাণিজ্যিক মাছ চাষ বাড়ছে বলেও জানান তিনি।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক দেব দুলাল ঢালি বলেন, অধিকাংশ অপরিকল্পিত পুকুর খনন হয়েছে নিষ্কাশন নালা এমনকি ব্রিজ-কালভার্টের মুখে। এতে হালকা বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। শিবনদীর ভেঙে যাওয়া বাঁধের স্লুইসগেইট বন্ধ করে পুকুর খননের অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

তিনি আরো বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার পবা, বাগমারা, মোহনপুর, তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলা। এর মধ্যে মোহনপুর ও বাগমারায় জলাবদ্ধতা হয়েছে বাঁধ ভেঙে। এতে পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে গেছে ৬ হাজার ১৩২ হেক্টর ফসলি জমি।

খবরঃ জাগোনিউজ২৪

Share.



2 Comments

Open