রাজশাহীতে পানি কমছে, কর্মযজ্ঞ বাড়ছে পদ্মাপাড়ে

1

প্রায় তিন কিলোমিটার পর পর পাহাড়ের মত উঁচু উঁচু বালুর স্তুপ। পাথরের বিশাল বিশাল খণ্ড ছড়িয়ে আছে চারপাশ। শ্রমিকরা কেউ মেশিনে পাথর ভাঙছেন। কেউ খাঁচে ঢালছেন কংক্রিটের মিক্সার।

আগের তৈরি করা সিসি ব্লকগুলো সাজানো হচ্ছে থরে থরে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে ইট-পাথরের স্বরলিপিতে পদ্মাপাড়ে গাঁথা হচ্ছে বিশাল কোনো স্থাপত্যের ভিত।

রাজশাহীর পদ্মানদীর তীরে শহররক্ষা বাঁধজুড়ে এখন ভর করেছে এমনই কর্মব্যস্ততা। কীর্তিনাশা পদ্মায় ধীরে ধীরে কমছে পানি, তাই বাড়ছে কর্মযজ্ঞ। ক’দিন আগেই প্রমত্তা হয়ে উঠেছিল পদ্মা। বাঁধ ভাঙার ভয়ে বুক কাঁপছিল শহরবাসীর। বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে কোনো রকমে ভাঙন ঠেকেছে। এজন্য পদ্মার পানি কমতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহী শহররক্ষা বাঁধকে নিরাপদ করার স্থায়ী বন্দোবস্ত হচ্ছে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাজশাহী সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মোট ২৩টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর মধ্যে পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে শহর রক্ষা করার জন্য সোনাইকান্দি থেকে বুলনপুর এলাকা রক্ষা প্রকল্পটিও ছিল। মূলত আগে থেকে কাজ শুরু হলেও প্রধানমন্ত্রীর আগমনের পর থেকে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় শহররক্ষা বাঁধ সংস্কার প্রকল্পের কাজ।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, সোনাইকান্দি থেকে বুলনপুর পর্যন্ত শহররক্ষা বাঁধের পরিধি হচ্ছে পাঁচ কিলোমিটার। বাঁধ নির্মাণের পর ১৯৮২ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণ করা হয়েছিল মহানগরীর শ্রীরামপুর এলাকার টি-গ্রোয়েন। এটি ১৯৯৮ সালে সর্বশেষ সংস্কার করা হয়। ২০১৬ সালের আগস্টে পদ্মার পানির তোড়ে টি-গ্রোয়েনে ফাটল দেখা দেয়। প্রবল স্রোতে প্রায় পাঁচ ফুট ভেঙে যায় এবং আরও পাঁচ ফুট মাটির গভীরে দেবে যায়। এই অবস্থায় পুরো বাঁধ সংস্কারের দাবি ওঠে।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার এনামুল হক বলেন, রাজশাহীতে পদ্মার পানির বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার। গতবছর বিপদসীমার মাত্র ৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল পদ্মার পানি। এতেই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল শহররক্ষার এই টি-গ্রোয়েনটি। এ বছরের বর্ষায় হু হু করে পদ্মায় পানি বাড়ছিল। ফলে বাঁধে এবারও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছিল।

গত ১৫ বছরে রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে মাত্র দু’বার। এর মধ্যে ২০০৪-২০১২ সাল পর্যন্ত টানা নয় বছর রাজশাহীতে পদ্মার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। কেবল ২০০৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহীতে পদ্মার উচ্চতা ছিল ১৮ দশমিক ৮৫ মিটার।

এরপর ২০১৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহীতে পদ্মার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে। ওই বছর পদ্মার উচ্চতা ছিল ১৮ দশমিক ৭০ মিটার। আর ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট রাজশাহীতে পদ্মার পানির বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১৮ দশমিক ৪৬ মিটার। তারপর থেকে পানি কমতে থাকে। এ বছর ২৫ আগস্ট পদ্মায় পানির উচ্চতা দাঁড়িয়েছিল ১৭ দশমিক ৫৪ মিটার। এর পর থেকে পানি আবারও কমতে শুরু করেছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টায় কমে ঠেকেছে ১৪ দশমিক ৪০ মিটারে।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোকলেসুর রহমান বলেন, পানি কমতে শুরু করেছে, প্রতিদিনই পানি কমছে। এজন্য সোনাইকান্দি থেকে বুলনপুর পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার বাঁধ সংরক্ষণ কাজ শুরু হয়েছে। তবে পদ্মায় বর্ষার পানি কমতে সাধারণত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত সময় লাগে। সেজন্য কেবল সিসি ব্লক সাজাতে কিছুটা অপেক্ষা করা হচ্ছে। এ কাজে ১২ লাখ ব্লক লাগবে।

বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় গত ২৬ জুন থেকে পদ্মাপাড়ে ব্লক তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী গত ১৪ সেপ্টেম্বর এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করায় সংস্কার কাজে গতি এসেছে। ২শ’ ৬৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুনভাবে রাজশাহী শহররক্ষা বাঁধটি সংস্কার করা হচ্ছে। দুই বছর মেয়াদী এই প্রকল্পটি ২০১৯ সালের জুনে শেষ হবে। তবে ২০১৮ সালের অক্টোবরেই এর কাজ দৃশ্যমান হবে।

এরই মধ্যে প্রকল্পের পাঁচটি গ্রুপের কাজের টেন্ডার হয়েছে। এর মধ্যে শুরু হয়েছে চারটি গ্রুপের কাজ। বর্তমানে বুলনপুরে সিসি ব্লক তৈরির কাজ চলছে। ডিসেম্বরের মধ্যে এই প্রকল্পের আরও পাঁচটি গ্রুপের  টেন্ডার আহ্বান করা হবে। ভাঙন ঠেকাতে এবার স্থায়ী ব্যবস্থা হচ্ছে। প্রকল্পটি শেষ হলে বর্ষা-বাদলে শহর রক্ষা বাঁধ নিয়ে নগরবাসীকে আর শঙ্কায় থাকতে হবে না বলেও জানান নির্বাহী প্রকৌশলী মোকলেসুর রহমান।

খবরঃ বাংলানিউজ

Share.



Open