রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী তিন গম্বুজের শাহী মসজিদ

2

রাজশাহী শহরের কোলাহল ঠেলে চলে যেতে হবে উত্তরের দিশায়। ১৫ কিলোমিটার পথ পেরোলেই পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার বাগধানী কাচারীপাড়া।

আর সেখানেই রয়েছে ২২৩ বছর পুরোনো তিন গম্বুজ বিশিষ্ট ঐতিহাসিক শাহী জামে মসজিদ। এখন পর্যন্ত রাজশাহী জেলার যে ক’টি প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম এটি।

মসজিদের একপাশ দিয়ে চলে গেছে সবুজ বেষ্টনীর রাজশাহী-তানোর সড়ক। অন্যপাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বারনই নদী। উন্নত যোগাযোগের জন্য এর উপর দিয়ে সংযোগ সেতুও নির্মিত হয়েছে। এমন সতেজ-শ্যামল প্রান্তরে প্রাচীন আমলের দৃষ্টি নন্দন তিন গম্বুজ মসজিদটি আজও দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে।

ঐতিহ্যবাহী মসজিদটির দৃষ্টিনন্দন নির্মাণ শৈলী যে কোনো পর্যটককে বিমোহিত করবে। মসজিদটির ভেতরে ঢুকতেই সদর দরজার শিলা লিপিতে চোখে পড়বে ফার্সি হরফের লেখা। যেখানে কালো অক্ষরে লেখা আছে মুন্সি মোহাম্মদ এনায়েতুল্লাহ বাংলা ১২শ’ সালে এ মসজিদটি নির্মাণ করেছেন।

যারা নান্দনিক সৌন্দর্যের খোঁজে দেশের আনাচে-কানাচে চষে বেড়ান, তাদের পিপাসা মেটাবে এই মসজিদ। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৮০ ফুট এবং প্রস্থ ৪০ ফুট। আয়তন হচ্ছে ৩ হাজার ২০০ বর্গফুট।

মসজিদটির চার কোনায় নকশা খচিত গম্বুজ আকৃতির মনোরম পিলার রয়েছে। মসজিদটিতে তিনটি মেহেরাব, তিনটি দরজা, দু’টি জানালা ও একটি মিনার রয়েছে। এছাড়াও মসজিদের চারপাশের দেয়ালের বাইরে ও ভেতরে চিনামাটি খচিত নকশা রয়েছে। যা এক পলকেই ভালো লাগবে পর্যটকদের।

একটা সময় ছিল যখন বারনই নদীই একমাত্র পথ ছিল বাগধানী গ্রামের। তখন এই মসজিদের পাশে ঘাট ছিল। নদী তীরের এই ঘাট ঘেঁষে সপ্তাহে দু’দিন করে হাটও বসতো। এটাই ছিল পবার সবচেয়ে পুরোনো হাট। এখন সেই জমজমাট অবস্থা নেই। তবে শুক্র ও মঙ্গলবার এখনও হাট বসে সেখানে।

স্থানীয়রা জানান, মনবাসনা পূরণের জন্য বর্তমানে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসেন পুরোনো আমলের এই মসজিদে নামাজ আদায় করতে। এজন্য জুম্মার দিন বাড়তি মুসল্লিদের ভীড় হয় সেখানে।

স্থানীয় নাজমুল ইসলাম জানান, ১৯৯০ সালে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মসজিদটি। এর পর অনেক দিন  থেকে মসজিদটি সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন তারা। কিন্তু জেলা বা উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামায়নি। তবে বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্প্রতি এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছেন।

তিনি বলেন, মসজিদ ও তার পাশের কাচারী ঘরের ধ্বংসাবশেষ এখনো কালের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। সংরক্ষণ ও সংস্কার করা হলে মসজিটিকে ঘিরে এই এলাকায় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠবে।

এদিকে, রাজশাহীর পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিম হোসেনের বদৌলতে অতি সম্প্রতি  বাগধানী তিন গম্বুজ শাহী মসজিদটি নজরে আসে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের। কাচারীপাড়ার এই ঐতিহাসিক শাহী মসজিদটি সংরক্ষণের জন্য এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মসজিদটি সংরক্ষণের জন্য গত ১২ জুলাই প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের উপ-সচিব গাজী ওয়ালি-উল-হক স্বাক্ষরিত একটি চিঠি আসে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে। এরপর নির্দেশনা অনুযায়ী মসজিদটির সার্বিক অবস্থা ও ভূমি তফসিল উল্লেখ করে চিঠি পাঠায় উপজেলা প্রশাসন।

রাজশাহীর পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিম হোসেন বলেন, দুই সপ্তাহ আগে তারা উল্লেখিত কাগজপত্রসহ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে চিঠি পাঠিয়েছেন। গত ৭ আগস্ট তারা সেসব কাগজপত্র পেয়েছে। এর পর তিনি বগুড়ার আঞ্চলিক পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

সেখান থেকে জানানো হয়েছে, কাগজপত্র পাওয়ার পর ওই দিনই প্রক্রিয়া শেষে তারা তা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন সেখান থেকে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হবে। পরে তার কাগজপত্র বিজি প্রেসে যাবে গ্যাজেট আকারে প্রকাশ হওয়ার জন্য। গ্যাজেট প্রকাশ হলেই এটা প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের সম্পদ হয়ে যাবে।

এক প্রশ্নের জবাবে ইউএনও সেলিম হোসেন বলেন, ঐতিহাসিক এই জামে মসজিদটি প্রথমে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে অন্তর্ভুক্ত হবে। তারপর দ্বিতীয় ধাপে এটি সংস্কারের জন্য বাজেট বরাদ্দ করা হবে। স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় তখন দ্রুততার সঙ্গে মসজিদটির সংস্কার কাজটিও শেষ করা হবে। যা আছে, তা দিয়েই ভবিষ্যতে মসজিদটি রাজশাহীর অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে রূপ পাবে বলে তার প্রত্যাশা।

এখানে যোগদানের পর কাজটি করতে পেরে তিনি খুশি বলে জানান এই নির্বাহী কর্মকর্তা।

খবরঃ বাংলানিউজ

Share.