অন্ধ হয়েও শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন তিন বোন

জাতীয়

পৃথিবীর আলো কেমন তারা কখনো দেখেননি। কখনো দেখার সুযোগ হয়নি সুন্দর পৃথিবীর রঙ। জন্ম থেকেই অদৃশ্য আঁধারে বড় হলেও অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর মেধা তাদের পিছিয়ে রাখতে পারেনি। জন্মান্ধ হয়েও তারা শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন। আলোকিত করছেন অন্যের জীবন। জন্মান্ধ তিন বোন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও পদক।

এই তিন বোন হলেন চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার উম্মে তানজিলা চৌধুরী, উম্মে হাবিবা চৌধুরী এবং উম্মে তাসলিমা চৌধুরী। এই তিন বোনের আরো একটি ছোট বোন রয়েছে। তিনি উন্মে সালমা চৌধুরী। সেও জন্মান্ধ। তবে থেমে নেই তারও পড়া লেখা।

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামের নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও শামীমা আক্তার চৌধুরী দম্পতির ঘরে জন্ম নেন চার কন্যা এবং এক পুত্র সন্তান। এদের মধ্যে চার কন্যায় জন্মান্ধ। একমাত্র পুত্র চোখে দেখতে পান। কন্যারা জন্ম থেকে অন্ধ হলেও তাদের পিতা-মাতা কখনো অন্যসব স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে কোনো অংশে পিছিয়ে রাখেননি। ছোট বেলা থেকেই তাদের পড়ালেখায় সাধ্যের সবটুকু করেছেন নাছির উদ্দিন ও শামীমা চৌধুরী। গ্রামের বাড়ি পটিয়া উপজেলায় হলেও তারা বসবাস করতেন চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুর এলাকায়। স্কুলে ভর্তির বয়স হলেই তাদের নগরীর মুরাদপুর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী স্কুলে ভর্তি করে দেন নাছির উদ্দিন। পরে হাবিবা, সালমা ও তাসলিমা নগরীর বন গবেষণা উচ্চ বিদ্যালয় আর তানজিলা রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এর পর হাবিবা ও তানজিলা চট্টগ্রামের হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজ থেকে এবং সালমা ও তাসলিমা চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে ব্রেইল পদ্ধতিতে এইচএসসি পাস করেন। পরে চার বোনই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

বর্তমানে উম্মে তানজিলা চৌধুরী পটিয়া সদরের মোহছেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা, উম্মে হাবিবা চৌধুরী পটিয়া সদরের শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা এবং উম্মে তাসলিমা চৌধুরী পটিয়া সদরের দক্ষিণ গোবিন্দারখিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। উম্মে সালমা চৌধুরী এখন টিউশনি করে পিতাকে সহায়তা করেন। এই চার বোনের একমাত্র ভাই নাঈম উদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে এখন চট্টগ্রামের একটি বায়িং হাউসে কর্মরত রয়েছেন।

অন্ধ হয়েও শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান রাখায় উম্মে তানজিলা চৌধুরী দেশের শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক শিক্ষকের পুরস্কার পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে তানজিলার হাতে পদক তুলে দেন। এ ছাড়া তানজিলা গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে পেয়েছেন অনন্যা পুরস্কার-২০১৬।

একই পরিবারের চার বোনের অন্ধত্ব নিয়ে গবেষণা করছেন সুইজারল্যান্ডের লসন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনিকুলার জেনেটিকস বিভাগের প্রধান ডা. জহিরুল আলম ভুঁইয়া। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদের মাধ্যমে একই পরিবারের পাঁচ ভাই-বোন ও তাদের মা বাবার রক্তের নমুনা ও ডিএনএ সংগ্রহ করে সুইজারল্যান্ডে প্রেরণের পর ডা. জহিরুল আলম চার বোনের অন্ধতের কারণ নির্নয় করেন।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমার বন্ধু এবং সুইজারল্যান্ডের লসন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনিকুলার জেনেটিকস বিভাগের প্রধান ডা. জহিরুল আলম ভুঁইয়ার অনুরোধে আমি পাঁচ ভাই-বোনের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে গত ১৫ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডে প্রেরণ করি। জহিরুল ইসলাম গবেষণা করে তাদের অন্ধত্বের কারণ নির্ণয় করেছেন। গবেষণা প্রতিবেদনে চার বোন বিরল রোগ ‘কনজেনিটেল এমায়ারোসিস’ এ আক্রান্ত বলে জানানো হয়েছে। চারবোন, তাদের একমাত্র ভাই ও মা-বাবার রক্ত পরীক্ষা করে এ রোগ শনাক্ত করা হয়েছে।’

ডা. নাছির উদ্দিন জানান, এটি বিরল রোগ। এ রোগে জন্মগতভাবে মানুষ দৃষ্টিহীন হয়ে যায়। দেশে প্রথমবারের মত ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে এই রোগ শনাক্ত করা হল। তবে ইতোপূর্বে ভারত ও পাকিস্তানে এই রকম রোগী পাওয়া গেলেও তাদের ডিএনএ টেস্ট করা হয়নি। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বিরল রোগ শনাক্ত হলেও তা নিরাময় করা সম্ভব হবে না। তবে রোগটির পরবর্তীতে বংশ বিস্তার রোধ করা সম্ভব। একই সঙ্গে জন্মান্ধ এবং এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব।

বিভিন্ন গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ জানান, প্রতি ৮০ হাজার মানুষের মধ্যে একজন এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। রোগটি মা-বাবা দুইজনের থাকলেই সন্তানদের মধ্যে বিস্তার হতে পারে। জন্মের সময় অথবা জন্মের দুই মাস পর সন্তান অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

খবরঃ রাইজিংবিডি