অর্ধেক শিক্ষার্থী নিয়ে চলছে রাবির অনলাইন ক্লাস

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

১০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে কোথাও উপস্থিত ৩০, কোথাও ৪০। ক্লাসে গড়ে সর্বোচ্চ শিক্ষার্থী উপস্থিতি মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেক। বাকি অর্ধেক শিক্ষার্থীকে রেখেই চলছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অনলাইন ক্লাস।

বাকিরা বলছেন, ইন্টারনেট সমস্যা ও স্মার্ট ডিভাইসের অভাবে তারা ক্লাসে যুক্ত হতে পারছেন না।

শিক্ষকদের অনেকে বলছেন, পরিকল্পনা ছাড়া অনলাইন ক্লাস শুরু করায় এখন হযবরল অবস্থা। এই অবস্থা চলতে থাকলে বাকি শিক্ষার্থীরা শুধু ক্লাস থেকেই বঞ্চিত হবেন না, পরীক্ষাতেও বসতে হবে ক্লাস ছাড়াই।

মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘ সাড়ে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ছিল। গত সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সভাপতিদের সঙ্গে উপাচার্যের ভার্চুয়াল এক সভা থেকে অনলাইন ক্লাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আসে। সভায় অনেকটা তড়িঘড়ি করে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) থেকেই সব বিভাগকে অনলাইন ক্লাসে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়।

কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই হুট করে এমন সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষা বৈষাম্যের শিকার ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী। উন্নত দেশগুলো অনেক আগে থেকেই অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা মানিয়ে নিলেও সে ব্যবস্থা প্রচলনে আমাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ধীরগতির ইন্টারনেট, শিক্ষার্থীদের সবার হাতে স্মার্টফোন থাকার নিশ্চয়তা, উচ্চ দামে ইন্টারনেট ডাটা প্যাক কেনার সক্ষমতাসহ শিক্ষকদের প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে নানা মহল থেকে। বিশেষ করে প্রান্তিক পরিবার থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের এ ধরনের ক্লাসে যুক্ত হওয়ার সক্ষমতাই নেই। তাদের বঞ্চিত করার নৈতিক অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অনেকেই।

সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী কামরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে আমার অনেক বন্ধু আছে যাদের ঈদ বাজার ছিল ১০ কেজি চাল, দুই কেজি আলু আর এক কেজি লবণ। যেখানে বেঁচে থাকতেই লড়াই করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত সেখানে অনলাইন ক্লাস এটা অনেকটা হাতি পোষার মতো। বর্তমানে এক জিবি ইন্টারনেটের যে দাম তা দিয়ে এমন অনেক পরিবার আছে যাদের এক বেলার আহার জোটে। বিশেষ করে যারা টিউশনি করে তাদের পড়াশোনার খরচ চালায়।

আদনান নামে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, গ্রামে নেটওয়ার্কের যে অবস্থা তাতে ফেসবুকের একটা পোস্ট দেখতে গেলে বারবার বাফারিং করে। সেখানে অনলাইনে ক্লাস? যাদের সমস্যা এরা কি তাহলে ক্লাস করবে না? নাকি যাদের নেট স্পিড ভালো শুধু তাদের জন্য অনলাইন ক্লাসের আয়োজন।

এই অবস্থার মধ্যে ক্লাস চললে বাকি শিক্ষার্থীরা ক্লাস থেকে বঞ্চিত হবেন বলে জানান আরবি বিভাগের অধ্যাপক ইফতেখারুল আলম মাসউদ। তিনি বলেন, যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো চাপ ছিল না, তবু অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে অনলাইনে ক্লাস শুরু করা হয়েছে। ক্লাস নিতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ২০ শতাংশের কম শিক্ষার্থী উপস্থিত হচ্ছে ক্লাসে।

তিনি আরও বলেন, যে ক্লাসগুলো করা হচ্ছে সেগুলো নতুন করে বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য নেয়া সম্ভব হবে না। এভাবে চলতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অবস্থা হযবরল হয়ে যাবে।

রাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি সাকিলা খাতুন বলেন, এই মুহূর্তে অনলাইন ক্লাস অবশ্যই ইতিবাচক। তবে সকল শিক্ষার্থীর অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুবিধা নিশ্চিত করে তবেই অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা দরকার ছিল। অনেক শিক্ষার্থী গ্রাম ও পার্বত্য এলাকায় অবস্থান করছেন, যেখানে ইন্টারনেট ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। অনেকের কাছে স্মার্ট ডিভাইস পর্যন্ত নেই। এই পরিস্থিতিতে অনেকের ইন্টারনেটের ডাটা প্যাক কেনার মতো সামর্থ্যও নেই। সেক্ষেত্রে প্রস্তুতিহীনভাবে তড়িঘড়ি করে অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও ছাত্র উপদেষ্টা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, আমরা শুরুটা করতে চেয়েছি। সেটা হয়েছে। সম্পূর্ণ নতুন একটা পদ্ধতি হওয়ায় কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সমস্যায় কথা বিবেচনায় রেখে উপাচার্য টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করেছেন। কমিটি অনলাইন ক্লাসের খুঁটিনাটি সমস্যা সম্পর্কে প্রশাসনকে অবহিত করলে পরবর্তীতে আবার সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। এরই মধ্যে তাদের কাছে সমস্যা-সম্ভাবনা, অভিযোগ-অনুযোগ দিতে বলা হয়েছে। আশা করছি সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠে পুরোদমে ক্লাসে ফিরবে শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হবেন কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সকল শিক্ষার্থী যাতে উপকৃত হন সেদিকে খেয়াল রেখে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কোনো শিক্ষার্থীকে বঞ্চিত করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না।

এদিকে যেসব শিক্ষার্থীর সমস্যা তাদের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে লজিস্টিক সাপোর্টের ব্যাপারে জানানো হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক লুৎফর রহমান।

খবর কৃতজ্ঞতাঃ বাংলানিউজ