ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে রামেক হাসপাতালে অচলাবস্থা

রাজশাহী

রোগীর স্বজনদের সঙ্গে মারামারির ঘটনায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি অব্যাহত আছে। এতে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ছে।

সোমবার (২৬ ডিসেম্বর) রাত ৯টার দিকে হাসপাতালের ২২ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এক প্রসূতির স্বজনদের সঙ্গে হাতাহাতিতে রামেকের ৫২তম এমবিবিএসের ছাত্র ও ইন্টার্ন চিকিৎসক আবু নাঈম পরাগের (২৮) মাথা ফেটে যায়। এর প্রতিবাদে রাত সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতালে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।

মঙ্গলবার (২৭ ডিসেম্বর) দুপুরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তালা দিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। ওই কর্মসূচি শেষে ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের মুখপাত্র রায়হান শরীফ জানিয়েছেন, পরাগের ক্ষত না শুকানো পর্যন্ত তারা কাজে যোগ দেবেন না।

কর্মবিরতি চলাকালে হাসপাতালের মধ্যে তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া পরাগের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অব্যাহত এ কর্মবিরতিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন রামেক হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ওয়ার্ডে না থাকায় চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না তারা। ভর্তি থাকা রোগীরা এরই মধ্যে হাসপাতাল ছাড়তে শুরু করেছেন।

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে জরুরি বিভাগের চিকিৎসাসেবাও ভেঙে পড়েছে।

মহানগরীর মেহেরচণ্ডি এলাকার রিকশাচালক বাবুল ইসলাম জানান, সোমবার (২৬ ডিসেম্বর) রাতে তার স্ত্রীর প্রসব ব্যথা ওঠে। এর পর পরই তিনি তার স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু ২২ নম্বর ওয়ার্ডে পড়ে থাকলেও কোনো চিকিৎসা পাননি। নার্সরা কেবল স্যালাইন দিয়ে রেখেছেন। বলেছেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নরমাল ডেলিভারি না হলে সিজার করাতে হবে। কিন্তু চিকিৎসক না থাকলে কিভাবে তা হবে- তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন তিনি।

দুপুরে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মোহনপুরের মৌগাছি গ্রামের কৃষক জয়নাল হোসেন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় তার ছেলের পা ভেঙ্গে গেছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তালা থাকার কারণে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করেও চিকিৎসাসেবা পাননি। তাই বাধ্য হয়ে ক্লিনিকে যাচ্ছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত জরুরি বিভাগ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। জরুরি বিভাগের দরজায় তালা দিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভ মিছিলটি জরুরি বিভাগের সামনে থেকে বের হয়ে মূল ফটক হয়ে লক্ষীপুর মোড়ের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের গেটে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে মানববন্ধন করেন তারা।

মানববন্ধন চলাকালে আন্দোলনরত ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের নেতাকর্মীরা হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকালে তাদের নিরাপত্তা প্রদান ও হামলাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। পরে রামেক ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের মুখপাত্র রায়হান শরীফ উপস্থিত গণমাধ্যকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদাহরণ টেনে তিনি  বলেন, সেখানে নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশের পাশাপাপাশি দেড়শ’ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। আর রামেক হাসপাতালে মাত্র ৪০ জন আনসার রয়েছেন। এতে হরহামেশাই চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে তারা রোগীর স্বজনদের হামলা শিকার হচ্ছেন।

হাসপাতালের পরিচালককে দিনের পর দিন তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বললেও কোনো লাভ হয়নি। ঘটনা ঘটলে দফায় দফায় সমঝোতা বৈঠক হয়। কিন্তু তাদের দাবি কখনও পূরণ করা হয় না।

এজন্য আর বৈঠক বা আশ্বাস নয়, এবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ দেখতে চান তারা। এছাড়া পরাগের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। না হলে তাদের আন্দোলন ও কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএফএম রফিকুল ইসলাম জানান, সকালে তিনি সিনিয়র চিকিৎসকদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন। বৈঠকে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে তিনি বিভাগীয় প্রধান ও রেজিস্ট্রারদের নির্দেশ দিয়েছেন। তারা বর্তমানে সেভাবেই দায়িত্ব পালন করছেন। তাই বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে চিকিৎসা কার্যক্রম চালু রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, বৈঠকের জন্য ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তারা আসেননি। তবে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে। সন্ধ্যার পর তাদের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে। তারা আলোচনায় বসলে রাতের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন হাসপাতাল পরিচালক।

রাজশাহীর রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমান উল্লাহ জানান, রামেক হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে অ্যাডমিন অফিসার ইসমাইল মজুমদার বাদী হয়ে শাহীন ও জিমি নামে দুই ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেছেন। এর মধ্যে রোগীর স্বামী জিমিকে তার অলোকার মোড়ের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে শাহীনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিকেলে ওই মামলায় জিমিকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এছাড়া রামেক হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে বলেও জানান ওসি।

খবরঃ বাংলানিউজ

1 thought on “ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে রামেক হাসপাতালে অচলাবস্থা

Comments are closed.