ঈদে নতুন ফ্যাশনকেও টেক্কা দিচ্ছে রেশমের আভিজাত্য

রাজশাহী

রাজশাহীকে বলা হয় রেশম নগরী। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই এখানে শুরু হয় রেশম চাষ। তবে এ অঞ্চলে রেশম উৎপাদনের সেই স্বর্ণযুগ এখন আর নেই। তাতে কি? রেশমের নামটি শুনলে এখনও চোখে ভেসে ওঠে রাজশাহীর নাম। স্মৃতিতে আঁচর কাটবে অনিন্দ্য সুন্দর রেশমি পোশাকের স্বতন্ত্রতা। তাই তো এর অভিজাত্য এখনও টেক্কা দিচ্ছে নতুন ফ্যাশনকে।

রাজশাহীর রেশম শিল্পের কদর কেবল দেশেই নয় বিদেশেও সমাদৃত। চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক। নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও এই শিল্প ও তার ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে রাজশাহীর রেশম হাউজগুলো। রেশমের তৈরি কাপড় সারাবছর ধরে বিক্রি হলেও ঈদে এর কদর বেড়ে যায় দ্বিগুণ। ঐতিহ্যের পরম্পরায় তাই রেশম ও রাজশাহী দু’টি নামই বহন করছে একে অপরের পরিচিতি।

রাজশাহীর মানুষের ঈদ আর সিল্ক যেন তাই একই সুতোয় গাঁথা। রেশমের পোশাক ছাড়া যেনো ঈদের খুশিই মলিন হয়ে যায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সবার সামনে হাজির করছে নিত্য নতুন রেশমি পোশাক। নানান রঙের থ্রি-পিস, রেশমি শাড়ি না হয় পাঞ্জাবি। ঈদে তাই রাজশাহীর মানুষের শরীরে রেশমের শুভ্রতা লাগবেই।

বাজার ঘুরে দেখলেই বোঝা যায় ক্রেতাদের মধ্যে রেশমের চাহিদা কত। আর এই বিষয়টি মাথায় রেখেই শেষ সময়ে রাত-দিন এক করে কাজ যাচ্ছেন ঐতিহ্যবাহী রাজশাহীর বিভিন্ন সিল্ক ফ্যাক্টরির কারিগর ও মালিকরা। সিল্ক সুতা দিয়ে নতুন নতুন ডিজাইনের শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস ও শিশুদের পোশাক তৈরি করছেন তারা। লক্ষ্য চাঁদ রাত পর্যন্ত উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া।রাজশাহী মহানগরীর সপুরায় থাকা রেশমপল্লীতে ঈদের প্রস্তুতিটা শুরু হয় ঈদের এক মাস আগেই। রোজাজুড়েই থাকে জমজমাট বেচাকেনা। রোজার শুরুতে ভিড় কম থাকলেও শেষ দশকে যেন দম ফেলারও সুযোগ নেই রেশম কারখানার শ্রমিকদের। ক্রমবর্ধমান ক্রেতাদের চাহিদাকে মাথায় রেখে এখানে রোজাজুড়েই চলছে রেশমি কাপড় বুননের কাজ।

শুক্রবার (৩১ মে) থেকে অনেকেরই ঈদের টানা এক সপ্তাহের ছুটি শুরু হচ্ছে। তাই বৃহস্পতিবার (৩০ মে) মহানগরীর সপুরায় থাকা রেশমপল্লীতে যেন ক্রেতারদের ঢল নেমেছে। প্রতিটি শো-রুমই যেন ক্রেতায় ঠাসা। হাতে আর মাত্র কয়েকটি দিনই রয়েছে তাই শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় পুরোদমে জমে উঠেছে রাজশাহীর সিল্ক হাউসগুলো। প্রতিটি পোশাকেই যেনো আলোর ঝিলিক।

সপুরা সিল্কের শো-রুমে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছিলেন মহানগরীর সুলনাতাবাদ এলাকার গৃহিনী শবনম মোস্তারি।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, শাশুড়ি ও তার জন্য রেশমের শাড়ি এবং স্বামীর জন্য রেশমের পাঞ্জাবি কিনতে এসেছেন। একই ছাদের নিচে রয়েছে সন্তানের পোশাকও। রাজশাহী সিল্ক দেশজুড়ে সমৃদ্ধ। তাই ঈদে তার পরিবারের পছন্দে রেশমি পোশাকের কদরই বেশি বলে যোগ করেন শবনম।

শো-রুমটি ঘুরে দেখা গেছে, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এবার বিপুল রেশম পণ্যের সমাহার ঘটিয়েছেন তারা। সুই-সুতোর কাতান, বলাকা কারচুপি, কোটি সিল্ক, জয়শ্রী, সিল্ক কাতান, এনডি, থ্রি-স্টার কাতান, ওয়াটার কাতান, জামদানি কাতান, র-কাতান, দুপিয়ানা, ঝরনা কাতান, কারুচুপিসহ হরেক নামের শাড়ি-কাপড়, থ্রি-পিস, ওড়না, পাঞ্জাবি-পায়জামা, শার্ট, ফতুয়া, স্কার্প এবং টাই থরে থরে সাজানো রয়েছে সপুরা সিল্কের জাঁকজমক এই শো-রুমে। লাল, নীল, সবুজ, বেগুনি, বর্ণিল সব রঙের আলোয় সব সময় ঝলমল করছে শো-রুমে থাকা নতুন রেশমি পোশাকগুলো।

এখানে সিল্ক শাড়ি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৯৯ টাকা থেকে ২২ হাজার টাকার মধ্যে। পাঞ্জাবি রয়েছে ৮৯৯ টাকা থেকে ৩ হাজার ৫শ টাকার মধ্যে। সিল্ক ছাড়াও সুতির পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে। মসলিন সিল্ক রয়েছে ৫ হাজার ৫শ টাকা থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে। মটকা সিল্ক রয়েছে ৩ হাজার টাকা থেকে ৬ হাজার ৫শ টাকার মধ্যে। থ্রি-পিস রয়েছে ২ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকায়। সিল্কের শার্ট রয়েছে ৭শ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকার মধ্যে।ফুলহাতা ও হাফহাতা ডিজাইনের বিভিন্ন রঙের ফতুয়া রয়েছে সাড়ে ৫শ থেকে ১ হাজার ৮শ টাকার মধ্যে। সুতি শার্ট রয়েছে ৮শ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে। কাটোয়ার ডিজাইনের শাড়ি, সফট সিল্ক শাড়ি রয়েছে ১ হাজার ৬৫০ থেকে ৭ হাজারের মধ্যে।

এন্ডি সিল্ক রয়েছে ৩ হাজার ৭শ থেকে ৫ হাজার টাকায়। বলাকা সিল্ক রয়েছে ৪ হাজার ২শ থেকে ৫ হাজার টাকায়। র-মসলিন রয়েছে ৬ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে। বলাকা স্টিজ শাড়ি রয়েছে ৬ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকার মধ্যে। এছাড়া রয়েছে পার্টি ড্রেস, কন্ট্রাস্ট থান শাড়ি, সুতি পোশাক, স্যান্ডেল ও জুতোসহ বাহারি সব পণ্যের সমারোহ।

রাজশাহীর সপুরা শো-রুমের ম্যানেজার সাইদুর রহমান বলেন, ঈদকে সামনে রেখে প্রতিদিনই নতুন নতুন আইটেম যোগ করছেন তারা। বিশেষ করে গ্রীষ্ম-বর্ষা সব ঋতুর উপযোগী করে এবার বিভিন্ন ডিজাইনের মসলিন সিল্কের পোশাক তৈরি করা হয়েছে। তবে এবারের ঈদে বড় আকর্ষণ কাটোয়ার ডিজাইনের শাড়ি। আর আছে র-সিল্কের ওপর হাতের কারুকাজ। এবছর ঈদে বেশি বিক্রি হচ্ছে ‘পার্টি ড্রেস’। এটি শিশু-কিশোরদের মধ্যে বেশ সারা ফেলেছে।

বিকিকিনি এখন জমজমাট। সব মিলিয়ে চাঁদ রাত পর্যন্ত বেচা-কেনা চলবে। এ সময় তাদের কারখানা ও শো-রুমের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দম ফেলার ফুরসত নেই বলে যোগ করেন ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার।

খবর কৃতজ্ঞতাঃ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর