উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্ততা চান উত্তরাঞ্চলের হিজরারা

রাজশাহী রাজশাহী বিভাগ

তামান্না ইয়াসমিন
maxresdefault
উন্নয়নের মূল ধারায় নিজেদেরকে সম্পুক্ত করতে চান উত্তরাঞ্চলের হিজরা জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। নিজেদেরকে আর পিছিয়ে রাখতে চান না তারা। তাইতো পশ্চাদপদ পেশা ছেড়ে তাদের অনেকেই এখন এগিয়ে এসেছেন সামনের দিকে। কিন্তু যৌনকাজে তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য নিয়জিত থাকায় তারা রয়েছেন এইডস ঝুঁকিতে। তবে হিজরাদের এই এইডস ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করে যাচ্ছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংগঠন। এ কাজে তারা অনেকটা সফল হয়েছে বলে দাবি সংগঠনগুলোর কর্মকর্তাদের।

যে সমস্ত পুরুষ নিজেদেরকে পুরুষ মনে করেন না এবং নারীও মনে করেন না বরং অন্য একটি জেন্ডারে নিজেদেরকে প্রকাশ করতে চান তারাই হলেন হিজরা। এরা মেয়েদের পোশাক পরে থাকে। রয়েছে নিজস্ব সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কমিউনিটি। এদের নিজস্ব ভাষাও আছে যাকে বলে উল্টি।

উত্তরাঞ্চলের হিজরা সম্প্রদায়ের লোকজন একসময় মানবেতর জীবন যাপন করতেন। সমাজের মানুষের কাছ থেকে ছিলেন বিচ্ছিন্ন। তাদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিলো খুবই নেতিবাচক। রাস্তা-ঘাটে বেরুলেই সাধারণ মানুষেরা তাদেরকে বিভিন্নভাবে উত্যক্ত করতো। ফলে তারা ঘর থেকে আগে বের হতে পারতেন না।
তবে দৃশ্যপট অনেকটা বদলেছে। ২০১৩ সালে রাষ্ট্র তাদেরকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতিও দিয়েছে। এখন তারা গর্ব করে নিজেদেরকে পরিচিত করতে পারে মানবদরবারে। নওগাঁর হিজরাদের গুরু সান্ত¦না বেগম। জানালেন, একটা সময় তাদের পেটের খাবার জুটাতেই হিমশিম খেতে হতো। রাস্তা-ঘাটে বের হলে মানুষের উত্যক্তের শিকার হতে হতো। প্রতিবাদের ভাষাও ছিলো না। কেনো না পুলিশ এবং স্থানীয় সরকারের লোকজন তাদেরকে সহায়তা করতো না। থানায় গেলে কিংবা ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের কাছে কোনো দাবি-দাওয়া নিয়ে গেলে উল্টো হেনস্তা হতে হতো। কিন্তু সেই দৃশ্যপটের এখন অনেকটায় পরিবর্তন হয়েছে। এখন পুলিশ ও স্থানীয় সরকার প্রশাসন তাদেরকে সম্মানের সাথেই মূল্যায়ন করে। তবে যতটা হিজরারা আশা করেন তা পুরোপুরি এখনো পাচ্ছেন না বলে দাবি তাদের।

পেটের দায়ে হিজরারা একসময় বাড়ি বাড়ি গিয়ে নবজাতক বাচ্চাকে কোলে নিয়ে নাচগান করতেন টাকার বিনিময়ে। তারা অনেক-সময় জোর-জবরদস্তি করতেন। তবে হিজরাদের অনেকেই এখন জবরদস্তি করে মানুষের পকেট কাটা থেকে দূরে সরে এসছেন। এদরই একজনের নাম মেনেকা আহমদ। বসবাস দিনাজপুর সদর এলাকার মানবপল্লীতে। মেনেকাকে ওই অঞ্চলের মানুষ রাত্রী নামেই ডাকে। রাত্রী নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন নৃত্য ও সংগীত শিল্পী হিসেবে।

রাত্রী জানান, আগের চাইতে অনেক ভালো আছেন দিনাজপুর অঞ্চলের হিজরারা। তারা এখন বেশ সম্মানজনক জীবন-যাপন করছেন। তিনি নিজেকে তৈরি করেছেন একজন স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান ও নৃত্য পরিবেশন করে জয় করেছেন মানুষের মন। পেয়েছেন খ্যাতি। তবে হিজরাদের সম্পর্কে আজও অনেক মানুষ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে বলে আক্ষেপও রয়েছে রাত্রীর। তিনি বলেন, ‘আমরাও তো মানুষ। তাহলে কেনো আমাদের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় না?’

বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন লাইট হাউসের ডেপুটি চিফ এক্সিকিউটিভ তারেক মাহমুদ জানান, আইসিডিডিআরবির সহায়তায় তারা হিজরাদের জীবন-মান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন অঞ্চলে তারা ড্রপ-ইন-সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে হিজরাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষকরে হিজরাদের মাধ্যমে যেনো এইচআইভি ভাইরাস না ছড়ায় সে ব্যাপারে তারা কাজ করে যাচ্ছেন।’

তারেক বলেন, ‘আমরা তিন ধরনের কর্মসূচি পালন করছেন হিজরাদের জীবন-যাত্রার মান উন্নয়নে। প্রথম ড্রপ-ইন-সেন্টার থেকে এইচআইভি ভাইরাস প্রতিরোধে কনডম সরবরাহ করছেন। দ্বিতীয়ত যাদের যৌনরোগ হয়ে গেছে তাদের ক্লিনিক্যাল সেবা প্রদান করা হচ্ছে। তৃতীয়ত তাদেরকে উন্নয়নের ¯্রােতধারায় আনতে বিভিন্ন কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছেন তারা।’

তবে উত্তরাঞ্চলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হিজরা এখনো চোরাচালান এবং কেবলই যৌনকর্মে লিপ্ত। যারা রয়েছেন এইচআইভি ঝুঁকিতে। তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে এই পথ থেকে ফিরিয়ে আনা অনেকটায় কঠিন বলে মনে করছেন উন্নয়নকর্মীরা। এ জন্য হিজরাদের গুরু প্রথাকেও দায়ী করছেন অনেকে। হিজরাদের সামাজিক নীতি অনুযায়ী গুরুরা যা বলবেন তাদেরকে তাই শুনতে হবে। ফলে অনেক সময় কিছু বিপথগামী গুরু হিজরাদেরকে বাধ্য করেন কেবলই অনিরাপদ যৌনকর্মে কিংবা চোরাচালানে। তাই গুরুদের নিয়েও কাজ করছে অনেক সংগঠন।

লাইট হাউসের রাজশাহীর ড্রপ ইন সেন্টারের ম্যানেজার আনিসুজ্জামান জানান, গুরুরা যা বলেন হিজরারা তা মান্য করেন। ফলে হিজরাদের উন্নত জীবনদানের জন্য যেকোনো কর্মসূচি নিতে গেলে অবশ্যই গুরুদের সম্পৃক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, ‘অনেক গুরু এখন অনুধাবন করতে পেরেছেন তাদের জীবন-যাত্রার মান উন্নয়ন প্রয়োজন। তাই তারা তাদের সদস্যদের নিয়মিত ড্রপ-ইন-সেন্টারে পাঠাচ্ছেন। হিজরা যৌনকর্মীদের কনডম গ্রহণে উৎসাহিত করছেন অনেক গুরু।’

হিজরাদের মাধ্যমে যেনো এইচআইভি ভাইরাস না ছড়ায় এবং তারা যেনো চোরাচালানে সম্পৃক্ত হতে না পারে সে ব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছে জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিপ্তরের স্থানীয় অফিস এবং পুলিশ প্রশাসন। হিজরাদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করছে পুলিশ প্রশাসন। নিয়মিত সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে বৈঠক করছে জেলা প্রশসন এবং সমাজসেবার পক্ষ থেকে দেয়া হচ্ছে অর্থনৈতিক সুবিধা। আর এ সুবিধা নিয়ে অনেক হিজরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

রাজশাহীর জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী জানান, এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে একটি কমিটি আছে। কমিটি নিয়মিত বৈঠক করে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। সেখানে হিজরা জনগোষ্ঠীর লোকজনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। শুধু তাই নয়; সমাজসেবার মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মমুখী করা হচ্ছে। এছাড়া কাজর বিনিময়ে খাদ্য, বয়স্কভাতা, স্বাস্থ্যভাতাসহ হিজরাদের বিভিন্ন ভাতা দিচ্ছে সরকার।

তবে সরকারের এসব কর্মকা- নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে হিজরাদের। তাদের দাবি, সরকার খুব বেশি আন্তরিক নয় তাদের ব্যাপারে। চাপের মুখে তৃতীয় জেন্ডার হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও এখন পর্যন্ত হিজরাদের অনেক মৌলিক দাবি পূরণ করতে পারে নি সরকার। আবার সরকারি যেসব কর্মকর্তা মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন তাদের অনেকেই অ-হিজরাদের দ্বারা প্রভাবিত বলে দাবি করেন হিজরা গুরুরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের লক্ষ্মীপুর এলাকার হিজরাগুরু মোসা. ববিতা অভিযোগ করেন, তাদের এলাকায় সরকারি লোকজন কিছুদিন আগে তালিকায় সাত শতাধিক হিজরা দেখিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হিজরার এ সংখ্যা ৫০ এর বেশি হবে না। সুবিধা নেয়ার জন্য অনেকে হিজরাদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। তবে সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক তালিকায় ভুলভ্রান্তি থাকলেও কোনো অনুদান দেয়ার ব্যাপারে যাচাই-বাছাই করেই কাজ করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.