এবার আম বেচাকেনায় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের পরিকল্পনা

রাজশাহী

রাজশাহীর আম, আম আর রাজশাহী যেন একই সুতোয় গাঁথা। এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য যেন একে অপরের পরিপূরক। একটির নাম নিলেই অন্যটির ছবি ভেসে ওঠে স্মৃতিপটে। বলা হয় একটি অপরটির পরিচিতি বহন করে। বাংলাদেশ তো বটে, বিশ্বজুড়েই যার সুখ্যাতি। তাই বছরজুড়েই চলে রাজশাহীর সুমিষ্ট আমের অপেক্ষা। রুদ্র বৈশাখ শেষে মধুমাস এলেই চারিদিকে শুরু হয় আম উৎসব।

এবারও হবে। কিন্তু প্রবাহমান করোনা সঙ্কটের কারণে মন ভালো নেই আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের। একে তো করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেকটা অবহেলা অনাদরে বেড়ে উঠেছে আম, এরপরও যা ফলন হয়েছে তা দিয়ে রাজশাহীসহ গোটা দেশেরই চাহিদা পূরণ সম্ভব। কিন্তু বন্ধ পরিবহন, লকডাউন ও ঈদ ভাবাচ্ছে রাজশাহীর আমচাষি এবং ব্যবসায়ীদের।

আম নিয়ে তাদের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠেছে। এরই মধ্যে আম ভাঙার জন্য সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে রাজশাহী জেলা প্রশাসন। সেইমতে আর মাত্র একদিন পরই (১৫ মে) রাজশাহীর বাগান থেকে ভাঙা হবে আম। প্রথমেই নামবে আগাম গুটি জাতের আম।

তাই লকডাউন শিথিল না হলেই বিপদ। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে দেশব্যাপী আম বাজারজাত করা কঠিন হয়ে পড়বে; বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই আম নিয়ে এবার উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার শেষ নেই চাষি ও ব্যবসায়ীদের।

আর দেশের বাজারে সরবরাহ করা গেলেও এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে এবার ইউরোপসহ বিশ্ববাজারেও আমের বাজার হারাতে হতে পারে এই অঞ্চলকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবছর বিকল্প হিসেবে দেশীয় বাজার ধরার কৌশল হিসেবে অনলাইন মার্কেট প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের পরিকল্পনাও করছেন অনেকে।

প্রতি বছরে আমের মৌসুমে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের চর্চা রয়েছে এই অঞ্চলে। গোটা মৌসুমজুড়ে কেবলই আমকেন্দ্রিক বাণিজ্য হয় এখানে। এতেই চাঙা হয়ে ওঠে রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতি।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, জেলায় আমবাগান রয়েছে ১৭ হাজার ৫৭৪ হেক্টর জমিতে। চলতি মৌসুমে সমপরিমাণ জমিতে আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে- ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮ টন।

রাজশাহী জেলায় সবচেয়ে বেশি আমের ফলন হয় বাঘা উপজেলায়। এখানে বাগানের সংখ্যাও বেশি। সেখানকার আমচাষি জিল্লুর রহমান বলেন, মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। এ অবস্থায় আম ভাঙবো না গাছেই রাখবো তাই নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। লকডাউন শিথিল না হলে কোথাও থেকে পাইকাররা আসবে না।

চারঘাট উপজেলার আম ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাগান থেকে আম নামানো ও বাজারজাত করাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তাই আম নিয়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা ভর করেছে। করোনা সঙ্কটকালে সরকার যদি রাজশাহীর আম বাজারজাত করার ব্যাপরে এখনই উদ্যোগ না নেয়, তাহলে বাঁচার উপায় থাকবে না।

এদিকে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও রয়েছে রাজশাহীর আমের চাহিদা। বাংলাদেশের আম যাচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। কিন্তু করোনার কারণে বিশ্ববাজারও স্থবির। আন্তর্জাতিক বাজারের আকাশপথে পণ্য পরিবহন বন্ধ। এ নিয়ে হতাশায় আছেন সংশ্লিষ্টরা।

আম বাজারজাত ও ব্যবসা নিয়ে একই রকম হতাশার কথা বলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক শামীম খানও। তিনি বলেন, অন্য বছর ব্যবসায়ীরা আম কিনতে যেভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়তেন, এবছর তার ছিটেফোঁটাও নেই। ব্যবসায়ীরা যোগাযোগই করছেন না। খুব উদ্বেগে দিন কাটছে তাদের।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আম কেনবেচায় অনলাইন মার্কেটিংয়ের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানান শামীম খান।

তিনি জানান, তারা আশাবাদী সঠিকভাবে বাজারজাত করতে পারলে খুব বেশি সমস্যা হবে না। এবছর তাই অনলাইন মার্কেটের বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। সারা দেশে ভোক্তার কাছে তারা সরাসরি নিরাপদ আম পৌঁছানোর একটা সার্কেল তৈরির চেষ্টা করছেন। এ কাজে তারা নতুন অনেক উদ্যোক্তা একসঙ্গে করতে পারবেন। কৃষি বিভাগের সঙ্গে কথাও হয়েছে।

তারা নতুন এই প্ল্যাটফর্মের নাম দিয়েছেন ‘অনলাইন ম্যাঙ্গো ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’। এখানকার ৮০ জন রেজিস্ট্রার্ড সদস্যসহ মোট সদস্য সংখ্যা ৩শ জন বলেও জানান শামীম খান।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. শামসুল হক বলেন, রাজশাহী থেকে গত মৌসুমে প্রায় ৩৭ টন আম পাঠানো হয়েছিল ইউরোপের বাজারে। এবার টার্গেট ধরা হয়েছে ৫০ টন। তবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আম পাঠানো যাবে। না হলে তা সম্ভব হবে না।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. হামিদুল হক জানান, করোনাকালে কীভাবে আম ব্যবাসা করা যায় তা নিয়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে এরই মধ্যে হোম ওয়ার্ক করা হয়েছে।

বাগান থেকে আম নামানোর পর কীভাবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে আম বাজারজাত করা যায় সে ব্যাপারে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সারাদেশে নিরাপদ আম বাজারজাত করতে গাছ থেকে আম ভাঙার সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক।

খবর কৃতজ্ঞতাঃ বাংলানিউজ