কাঁদলেন, কাঁদালেন ফজলু মিয়ার অন্ধ মা

জাতীয়

আদরের সন্তানের খোঁজে কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে গেছেন বাকপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধা মা। সেই ফজলু মিয়াকে ২৫ বছর পর কাছে পেয়ে অঝোরে কাঁদলেন মা। আদরের ছেলের চোখে-মুখে হাত বুলিয়ে আনন্দে কাঁদেন তিনি। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন ফজলুর বোন, মামাসহ অন্য আত্মীয়-স্বজন। তারাও দীর্ঘদিন পর ফজলুকে দেখতে পেয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মায়ের হাঁটা-চলায় সাহায্য নিতে হয় অন্যের। শরীর শুকিয়ে হয়েছে হাড্ডিসার। কথা বলতেও মুখে জড়তা দেখা দেয়। নয়নের জল যেন শুকিয়ে গেছে অনেক আগেই। ২৫ বছর পর গর্ভধারিনী মায়ের সান্নিধ্য পান ফজলু মিয়া। যেন সন্তানকে জীবন সায়াহ্নে একবার দেখে যাওয়ার জন্য খোদা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। ফজলুর জীবনের ২২টি বসন্ত কেটেছে কারাগারের প্রকোস্টে। আর আদরের সন্তানের জন্য কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হতে হয়েছে মা মজিরন বেওয়াকে। আজ শনিবার মমতাময়ী মায়ের বুকে ঠাঁই নেন ফজলু মিয়া। শ্বাস নেন প্রাণ ভরে। সন্তান আর মায়ের এ যেন এক অবিস্বরণীয় দিন। জীবনের সায়াহ্নে এসে যখন দেখা হচ্ছে, তখন ফজলু মিয়াও ষাটের কোটায়। আর তার মায়ের বয়স ৮০ পেরিয়ে। শনিবার জামালপুর থেকে সিলেটে আসেন ফজলু মিয়ার মা মজিরন বেওয়া (৮০)। জামালপুর জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে ফজলু মিয়ার মা-বোন ও আত্মীয়রা আসেন তাকে নিয়ে যেতে। এর আগে শুক্রবার বিকেলে সিলেটে ফজলুর কাছে পৌঁছেন তারই ছোট মামা মফিজ উদ্দিন ও চাচা মীর ফিরোজ আহমেদ। তাদের কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরেন ফজলু। ভাগ্নেকে কাছে পেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তারা। আজ শনিবার সন্ধ্যায় সিলেট দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তেতলী ইউনিয়ন পরিষদ রেস্ট হাউসে ফজলুর পরিবারের এ মিলন হয়। এ সময় উপস্থিত ফজলুর বন্ধু, জামালপুর জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের মধ্যে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টায় আলাপ হয় মফিজ উদ্দিনের। তিনি বলেন, আমরা জানতাম ফজলু মারা গেছে। কয়েকদিন আগে ঢাকা থেকে চাচাতো ভাই রাজু আহমেদ তাদের এ খবর দেন। ফজলু আমার চেয়ে দশদিনের বড় এবং ফিরোজ ১৩ দিনের। জীবনের সায়াহ্নে হলেও প্রিয় মানুষকে বাকি জীবন কাছে রাখতে চান তারা। তবে যারা ফজুলর জীবনের এতোগুলো বছর নষ্ট করেছে, তাদের বিচার দাবি করেছেন মফিজ উদ্দিন। এক সময়ের তরুণ টগবগে যুবক ফজলু এখন চলতে পারেন না আপন খেয়ালে। বিনা অপরাধে ২২ বছর সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিজীবন কাটিয়ে মুক্ত ফজলু মিয়া অবশেষে পেলেন আপন ঠিকানা। জামালপুর জেলার সদর উপজলার শাহবাজপুর সাউনিয়া গ্রামের মৃত ‍বিষু মিয়ার ছেলে ফজলু মিয়া। ফজলুর পরিবারের বরাত দিয়ে জেলা প্রশাসক জানান, ১৯৮৪ সালে কিশোর বয়সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন ফজলু। এরপর ১৯৮৭ সালে একবার সিলেটে আশ্রিত পালক পিতা মওলা মিয়াকে নিয়ে বাড়িতে যান। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে বাড়িতে বেড়িয়ে আসেন। এরপর তার আত্মীয়-স্বজনরা ফজলুর কোনো খবর পাননি। সিলেটে ফজলুর বাল্যবন্ধু কামাল উদ্দিন রাসেল বলেন, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কর্মকর্তা তমিজ উদ্দিনের মাধ্যমে ফজলু কারাগারে রয়েছে জানতে পারেন। এরপর লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ব্লাস্ট’র সহায়তায় তাকে আদালতের মাধ্যমে ছাড়িয়ে আনেন। তিনি বলেন, ’৯৩ সালে এক পুলিশ সার্জেন্ট তাকে আটক করে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠান এবং পরবর্তীতে পাগল আইনের ১৩ ধারায় আদালতে প্রসিকিউশন দেন জনৈক ওই পুলিশ সার্জেন্ট। ফজলুর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। স্বজনরা জানান, ফজলু মিয়ার বাবা বিষু মিয়া ৭৬ সালে মারা যান। ভিটেমাটিহীন ফজলুর মা থাকেন ভাইদের আশ্রয়ে। আর একমাত্র বোন হামিদা বেগম ঝিয়ের কাজ করে জীবন-যাপন করেন। তার নানা মৌলভী হাসমত উল্লাহ, মামা আব্দুল হালিম, আব্দুল গনি, আব্দুর রেজ্জাক, আব্দুস ছাত্তার ও মফিজ উদ্দিন জীবিত আছেন। ৩১ বছর আগে রাগ করে বাড়ি থেকে চলে আসার পর ফজলুর আশ্রয় হয়েছিল সিলেটের দক্ষিণ সুরমার গোলাম মাওলা নামের এক ব্যক্তির কাছে। তাকে নিয়ে বছর তিনেক পর একবার শাউনিয়া গ্রাম ঘুরে যাওয়ার পর ফজলুর সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি কারো। একমাত্র সন্তানের সন্ধান না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়েছেন মজিরন বেওয়া। সম্প্রতি গণমাধ্যমের সংবাদে ফজলুর স্বজনরা জানতে পারে তার জেলমুক্তির কথা। কিন্তু পরিচয়ের ‘সঠিকতা’ যাচাইয়ের সুযোগ হচ্ছিল না। অবশেষে গত বুধবার জামালপুর জেলা প্রশাসক শাহাবুদ্দিন খান এ বিষয়ে উদ্যোগী হন। তিনি নিজ বাসায় ডেকে পাঠান ফজলুর পরিবারের সদস্য ও স্বজন দাবিদারদের। তিনি বৃহস্পতিবার সকালে সিলেটে অবস্থানরত ফজলু মিয়ার সঙ্গে তাদের ফোনে কথা বলার সুযোগ করে দেন। নানা-মামাসহ আত্মীয়রা কথা বলে নিশ্চিত হন। জীবনের শেষবেলায় মা ডাক শুনতে পেয়ে অঝোরে কাঁদলেন মজিরন বেওয়া। কাঁদলেন তার স্বজনরা। চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি উপস্থিত অনেকেই।

 

/এমটিনিউজ২৪/