কোনোমতে খুঁড়িয়ে চলছে রাজশাহী ‘জিপিও’

রাজশাহী

প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়লো চিঠি ফেলার তিনটি ডাকবাক্স। মহানগর, সারাদেশ ও বিদেশ– এই তিন রকম স্থানের চিঠির জন্য তিনটি ডাকবাক্স। একটির গায়ের রঙ লাল। অপরটির নীল আর শেষটির হলুদ।

যদিও ডাকবক্সগুলোর রঙ অনেক ফ্যাকাশে, মলিন  হয়ে গেছে। বোঝা গেল, ডাকঘরের আগের জৌলুস আর নেই! আগের মত এগুলোর ব্যবহারও নেই। ভেতরে পা বাড়াতেই দেখা গেল বেশ ফিটফাট পরিবেশ। তবে তেমন লোকজনের ভিড় নেই। সব কাউন্টারই ফাঁকা। দুজনমাত্র কর্মচারী কাজ করছেন।

দেখে বোঝার উপায় নেই রাজশাহীর এই বিশালায়তন কার্যালয়টি দেশের চারটি জিপিও’র (জেনারেল পোস্ট অফিস) একটি। এক সময়ের জমজমাট জিপিও কার্যালয়টি এখন প্রায় জনমানবহীন। কেন এই অবস্থা? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই জানা গেল জনবল ও পরিবহন সংকটের কারণে সরকারি সেবাদানকারী এই প্রতিষ্ঠানাটি এখন ধুঁকছে।

একুশ শতকে এসে আর তাল মেলাতে পারছে না। প্রযুক্তির প্রতিযোগিতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছে এই ডাকঘর। অথচ এককালে রাজশাহী জিপিও ছিল বিভাগের অন্য সব ডাকঘরের প্রাণকেন্দ্র। ছিল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। চিঠি, পণ্য পার্সেল, টাকা পরিবহনে একমাত্র ভরসাস্থল ছিল এই জিপিও কার্যালয়। ছিল টেলিগ্রাম করার ব্যবস্থাও।

কিন্তু সময়ের অতলে হারিয়ে গেছে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা। নড়বড়ে হয়ে পড়েছে অন্যসব সেবা কার্যক্রমও। এসএমএস, ই-মেইল আর ফেসবুকের যুগে কোনোভাবে ঠেলেঠুলে চালানো হচ্ছে জনগুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানটি।

জিপিও কার্যালয়ের পূর্বপ্রান্তের গেট দিয়ে পেছনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ডাক বিভাগের অচল পরিবহনগুলোর ডাম্পিং স্টেশন করা হয়েছে। আর সেই ডাম্পিং স্টেশনটি যেন ডাকবিভাগের গাড়িগুলোর সমাধিস্থল।

কার্যালয়ের ভেতরে গিয়ে জানা গেল, ঊর্ধ্বতন কর্তাদের সংখ্যা মোটামুটি ঠিক থাকলেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জনবল ঠিক নেই। প্রায় ১০ বছরে নতুন কোনো নিয়োগ হয়নি ডাকবিভাগে। তাই পুরনোদের অবসর এবং বদলিতে শূন্যপদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এর ওপর পরিবহন সংকটেও ভুগছে প্রতিষ্ঠনটি। মেয়াদোত্তীর্ণ ভাঙাচোরা পরিবহনে কোনো রকমে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে রাজশাহী জিপিও’র মেইল ও ক্যাশ শাখার বর্তমান কার্যক্রম।

আর এমন নানান কারণে ডাকঘরে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েও কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। এতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। সেবা না পেয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে গ্রাহকরা ডাকঘর বিমুখ হয়ে অন্যদিকে ঝুঁকছেন।

জানতে চাইলে রাজশাহী জিপিও কার্যালয়ের সহকারী পোস্ট মাস্টার মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে সিনিয়র পোস্ট মাস্টার রয়েছেন একজন। পোস্টমাস্টার একজন। সিনিয়র অ্যাকাউন্ট্যান্টের পদটি শূন্য। এখানে একজন জুনিয়র অ্যাকাউন্ট্যান্ট কাজ করছেন। তবে বেতন পাচ্ছেন জুনিয়র হিসেবেই। তাকে অন্য একটি শাখা থেকে এখানে আনা হয়েছে। সহকারী পোস্ট মাস্টার থাকার কথা আটজন। আছেন চারজন। ডেপুটি পোস্ট মাস্টার থাকার কথা দুইজন। আছেন একজন। একজন পরিদর্শকের পদ থাকলেও তা শূন্য।

বেতার লাইসেন্স পরিদর্শককে তার দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্বে এখানে রাখা হয়েছে। সাব পোস্ট মাস্টার ১৬ জন থাকার কথা। ১৬ জনই আছেন। পোস্টাল অপারেটর ৭৮ জনের মধ্যে ১০ জনের পদ শূন্য। সহকারী পরিদর্শক থাকার কথা সাতজন, আছেন পাঁচজন। পোস্ট ম্যান ৪৫ জনের স্থলে আছেন ১৩ জন। প্যাকার ২৫ জনের স্থলে আছেন ১০ জন। তবে একজন দফতরি, দুইজন অফিস সহায়ক, তিনজন চালক ও তিনজন নৈশপ্রহরী, দুইজন সুইপার রয়েছেন। অনেকের অবসরের সময় হয়ে গেছে। তাদের পদগুলো শূন্যই থাকবে।

রাজশাহী জিপিও’র সিনিয়র পোস্ট মাস্টার মো. এমদাদুল বারী বলেন, তারা জনবল সংকটে ভুগছেন। চাহিদার প্রায় অর্ধেক জনবল দিয়ে এখন রাজশাহী জিপিও চলছে। এর ওপর পরিবহন সংকট-তো রয়েইছে। তবে এরই মধ্যে শহরের কাজে ব্যবহারের জন্য একটি জিপগাড়ি পাওয়া গেছে।

আর নভেম্বরেই ঢাকা রুটের জন্য পাঁচ টনের একটি ট্রাক পাওয়া যাবে। মেইল শাখার জন্য তিন টনের আরও একটি ট্রাক পাওয়া যাবে। এছাড়া ক্যাশ শাখার টাকা পরিবহনের জন্য পাওয়া যাবে দুটি তিনটনি ট্রাক পাওয়া।জানালেন এই কর্মকর্তা।

খবরঃ বাংলানিউজ