ক্লাসই রাজশাহী কলেজের প্রাণ

ক্যাম্পাসের খবর রাজশাহী রাজশাহী কলেজ

আনন্দ শোভাযাত্রা বের হবে কলেজ থেকে। কলেজজুড়ে খুশির বন্যা। এরই মধ্যে আবার ক্লাস। ক্লাস থেকে বের হয়ে দৌড়ে শোভাযাত্রায় যোগ দিতে ছুটে যাচ্ছেন হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নির্জল হালদার। কথা বলার ফুরসত নেই তাঁর।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিংয়ে রাজশাহী কলেজ সারা দেশের মধ্যে সেরা হয়েছে। এই খবরে আনন্দের জোয়ারে ভাসছে কলেজ। এবারই প্রথম র‍্যাঙ্কিং প্রকাশ করল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। তাতেই প্রথম রাজশাহী কলেজ।

১৪ মে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ র‍্যাঙ্কিংয়ের এই ফল ঘোষণা করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৬৮৫টি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের কলেজের ২০১৫ সালের তথ্য এবং পরীক্ষার ফলসহ ৩১টি সূচকের ভিত্তিতে এই র‍্যাঙ্কিং করা হয়।

১৮৭৩ সালে একজন মুসলিম ছাত্রসহ মোট ছয়জন ছাত্র নিয়ে কলেজটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে কলেজের এইচএসসিসহ ২৪টি বিভাগে স্নাতক (সম্মান),øস্নাতকোত্তর ও ডিগ্রি পাস কোর্সে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। আছেন ২৬৫ জন শিক্ষক।

রাজশাহী কলেজ সেরা হওয়ার পেছনে কী সেই রহস্য? ‘ক্লাস, ক্লাস আর ক্লাস’, বললেন কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী পার্থ ঘোষ। তিনি বলেন, ‘আমি ভর্তি হওয়ার পর থেকেই ক্লাসের গুরুত্ব দেখে আসছি। কলেজ কর্তৃপক্ষ সব সময়ই ক্লাসে উপস্থিতির জন্য শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করছে। সচেতনতা বাড়াতে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ক্লাসে ৬০ শতাংশ উপস্থিত থাকতে ব্যানার লাগানো হয়েছে। নির্ধারিত সংখ্যক ক্লাসে উপস্থিত না থাকলে শিক্ষার্থীসহ তাঁর অভিভাবককে ডেকে ক্লাসে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়।’

এরই ধারাবাহিকতায় ৭০টি শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর লাগানো হয়েছে। শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে ২৪৩টি ল্যাপটপ কম্পিউটার ও একটি করে পেনড্রাইভ। তা ছাড়া বিশেষায়িত শ্রেণিকক্ষ (বিজ্ঞান ল্যাব, কম্পিউটার ল্যাব) রয়েছে ২৩টি। শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে বিভাগভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক নিতাই কুমার সাহা বললেন, ‘আগে ক্লাসে লেকচার দিলে কোনো বিষয় শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি বুঝতে পারত না। এখন প্রজেক্টরের মাধ্যমে তারা সেটা সহজেই বুঝতে পারে। সে কারণে পরীক্ষাতেও ভালো ফলাফল করছে।’

সর্বশেষ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত ফলাফলে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ১২৫ ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ৪৯ জন প্রথম বিভাগ পেয়েছেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকে ৯২ ও স্নাতকোত্তরে ৪৭ জন, ইতিহাস বিভাগে স্নাতকে ৯১ ও স্নাতকোত্তরে ৯৩ জন প্রথম শ্রেণি পেয়ে পাস করেছেন। একইভাবে অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীরাও প্রথম শ্রেণিসহ ভালো ফলাফল করেছেন।

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজশাহী কলেজ নিজেকে ডিজিটাল করে নিয়েছে। কলেজ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা এখন বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা পান। ক্লাসের ফাঁকে তাঁরা পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করেন। প্রশাসন ভবনের দোতলায় লাগানো হয়েছে এলইডি সাইন বোর্ড, যার মাধ্যমে কলেজের যাবতীয় তথ্য সেখানে পাওয়া যাচ্ছে।

শুধু একাডেমিক পড়াশোনা নয়, কলেজকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে বিভিন্ন জায়গায় বসানো হয়েছে ডাস্টবিন। গাছে গাছে লাগানো হয়েছে নামফলক। ধূমপানমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে কলেজ ক্যাম্পাসকে।

কলেজে নিয়মিত আড়ম্বরের সঙ্গে বিভিন্ন দিবস ও উৎসবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমেও এগিয়ে রয়েছে রাজশাহী কলেজ। এখানে অনেকগুলো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। মুমূর্ষু রোগীকে রক্ত দিয়ে সাহায্য করছে রক্তদাতাদের সংগঠন বাঁধন। আর কলেজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শৃঙ্খলার দায়িত্ব নিরলসভাবে পালন করে যাচ্ছে রোভার স্কাউট ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি)।

‘সুস্থ দেহ সুস্থ মন’ এই সত্য সামনে রেখে রাজশাহী কলেজে একটি ব্যায়ামাগার রয়েছে। ২ লাখ ৫৫ হাজার ৫৭৮টি বই রয়েছে কলেজের গ্রন্থাগারে।

কলেজের অধ্যক্ষ হবিবুর রহমান বলেন, তাঁরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানোর আন্দোলন শুরু করেছেন। এতে সফলও হয়েছেন তাঁরা। এই কারণে স্নাতকের (সম্মান) পাশাপাশি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করছে। কলেজের পরিবেশটাও শিক্ষাবান্ধব।

খবরঃ প্রথম আলো