গৌরবময় ১৪৫ বছরে দেশসেরা রাজশাহী কলেজ

ক্যাম্পাসের খবর রাজশাহী

প্রমত্তা পদ্মা নদীর তীরে ৩৫ একর জমির উপর দাঁড়িয়ে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ‘রাজশাহী কলেজ’। শিক্ষা-দীক্ষায়, শিল্প-সাহিত্যে, মননে-সৃজনে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়ে অবাক করে দিয়েছে সবাইকে।

ইতোমধ্যেই কলেজটি পেরিয়েছে গৌরবময় ১৪৫টি বছর। দুইবার দেশ সেরা কলেজ নির্বাচিত হবার পাশাপাশি পেয়েছে দেশের মডেল কলেজের স্বীকৃতি। রাজশাহী শহরের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবস জড়িত এ কলেজটি ব্রিটিশ আমল থেকেই শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের মর্যাদা পেয়ে এসেছে। আর এরইমধ্যে শিক্ষা, শিল্প-সাহিত্যে, মননে-সৃজনে, বিজ্ঞানে-প্রযুক্তিতে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি অবাক করে দিয়েছে সবাইকে।

শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত রাজশাহী মহানগরী। কিন্তু শিক্ষা নগরী বলার পিছনে যে সকল প্রতিষ্ঠানের অবদান সেগুলোর মধ্যে প্রথমে যে নামটি আসেবে তা হল রাজশাহী কলেজে। আজকের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মও হয়েছে এ কলেজের হাত ধরে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এ কলেজের। প্রমত্তা পদ্মা নদীর তীরে ৩৫ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

পদ্মার তীরে অবস্থিত সবুজ শহর হিসেবে খ্যাত রাজশাহী শহর। তারই মধ্যে দাঁড়িয়ে আঠারো শতকের এক জলন্ত ইতিহাস। আজ থেকে ১৪৪ বছর আগে যার জন্ম হয়েছিল জমিদার রাজার হাতে। তারপর কত উজ্জ্বল নক্ষত্র এখানে এসেছেন, নিজেকে গড়েছেন, আবার কালের বিবর্তনে আলো বিলিয়ে চলে গেছেন। সেই আলোতে আজও পথ চলে নতুন প্রজন্ম। শুধু রাজশাহী অথবা উত্তরবঙ্গ নয়, এ কলেজের ইতিহাস ও সুনামের কথা ছড়িয়ে আছে দেশজুড়েই। তারই ধারাবাহিকতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সারা বাংলাদেশে কলেজ র‌্যাংকিংয়ে দুইবার প্রথম স্থান অধিকার করে এ কলেজটি। একাডেমিক পারফরম্যান্স, শিক্ষদের সংখ্যা, তাদের প্রশিক্ষন, একাডেমিক পরিবেশ, একাডেমিক সুযোগ-সুবিধা, লাইব্রেরি, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা সহ ৩১ টি মানদণ্ডের মাধ্যমে এই র‌্যাংকিং করা হয়।

কলেজের ইতিহাস:
বরেন্দ্র অঞ্চলের দুবলহাটীর রাজা হরলাল রায় বাহাদুরের আর্থিক সহায়তায় ১৮৭৩ সালে এটি স্থাপিত হয়। প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই তা পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ, বিহার, পূর্ণিয়া এবং আসামের একমাত্র উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। প্রথম ব্যাচে মাত্র ছয় জন ছাত্র নিয়ে এর যাত্রা শুরু হলেও ১৯৩০ সালে এর ছাত্র সংখ্যা এক হাজারে উন্নীত হয়, এবং ১৯৩৩ সালে ছাত্রী ভর্তির অনুমতি পাওয়া যায়। এছাড়া বাংলাদেশে সর্ব প্রথম স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে পাঠদান শুরু হয়ে এই কলেজেই।

এ কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতকোত্তর কলেজ হিসেবে ১৮৮১ সালে এম কোর্স এবং ১৮৮৩ সালে আইন কোর্স পরিচালনার অনুমতি লাভ করে। এবং ১৯০৯ সালে এম.এ এবং বি.এল কোর্সের অনুমোদন প্রত্যাহার করা হয়। ১৯৯৪ সাল থেকে পুনরায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে পুনরায় মাস্টার্স কোর্স চালু হয়। রাজশাহী কলেজ পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রথম অনুমোদিত কলেজ এবং পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন লাভ করে ১৯৫৩ সালে। এ কলেজের শুরুই হয়েছিল উচ্চ মাধ্যমিক দিয়ে। ১৯৯৬ সাল থেকে এইচ এ সি কোর্স বন্ধ করে দেওয়া হয়, এরপর মাঝে ১৬ বছর বিরতি দিয়ে ২০১০ সালে থেকে আবার উচ্চ মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হয়েছে।

রাজশাহী জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হরগোবিন্দ সেন এই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন। রাজশাহী এ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি দিঘাপতিয়ার রাজা প্রমদনাথ রায় বাহাদুর ১৮৭৭ সালে আর্থিক সহায়তা দিয়ে এখানে স্নাতক কোর্স চালুর ব্যবস্থা করেছিলেন।

অনেক ইতিহাস ঐতিহ্য জড়িত রয়েছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, উপমহাদেশের খ্যাতিমান চলচিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি স্যার যদুনাথ সরকার, বৈজ্ঞানিক প্রথায় ইতিহাস চর্চার পথিকৃত অন্যতম সাহিত্যিক অক্ষয় কুমার মৈত্র, সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান, জননেতা ও শিক্ষানুরাগী মাদার বখশ, বাংলাদেশের জাতীয় চার নেতার অন্যতম নেতা এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান, পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ আলী মিয়া, কবি রজনীকান্ত সেন, কাজী মোতাহার হোসেন, শ্রী রাধিকা মোহন মৈত্র, ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, মুক্তিবাহিনীর উপ-সর্বাধিনায়ক এ. কে. খন্দকার এর মত অসংখ্য কৃতী শিক্ষার্থী এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা লাভ করেছেন। অবিভক্ত ভারতবর্ষে রাজশাহীর পরিচয় ছিল মূলত রাজশাহী কলেজের নামে।

শুধু তাই নয় ভাষা শহীদদের উৎসর্গ করে দেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয় রাজশাহী কলেজেই। এ কলেজের ইতিহাসের সাথে জড়িত রয়েছে ‘৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ‘৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধসহ ‘৯০ এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলন।

বর্তমান অবস্থা:
বর্তমানে রাজশাহী কলেজ একবিংশ শতাব্দির প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল করে নিয়েছে নিজেকে। কলেজের নিরাপত্তা বিধান করতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে সব শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ১১০ টি শ্রেণিকক্ষকে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষে রুপান্তর করা হয়েছে। তার জন্য ল্যাবসহ শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে ৪৫০ টি ল্যাপটপ। প্রত্যেক বিভাগে রয়েছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ। শিক্ষার্থীদের স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চালু করা হয়েছে সান্ধ্যকালীন লাইব্রেরী সেবা। কলেজের যাবতীয় তথ্য প্রদর্শনের জন্য প্রশাসন ভবনে লাগানো হয়েছে এলইডি সাইনবোর্ড।

কলেজকে আধুনিকীকরণ ও শিক্ষাক্ষেত্রে আধুনিক এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য বর্তমান অধ্যক্ষ মহাঃ হবিবুর রহমান বিভাগীয় ‘ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড-২০১৬’ লাভ করেছেন। এছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ‘শহীদ সোহরাওয়ার্দী সন্মাননায়’ ভূষিত হয়েছেন তিনি। বিভাগীয় ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলায় রাজশাহী বিভাগে শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে রাজশাহী কলেজ। ৭ম জাতীয় পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ২০১৭ এর রাজশাহী বিভাগের প্রতিযোগিতায় উচ্চমাধ্যমিক ক্যাটাগরীতে সাফল্য দেখিয়ে ২২ টির মধ্যে ১৬ টি স্থানই দখল করে রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা। এছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ২০১৩ ও ২০১৪ সালে রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডে প্রথম স্থান এবং ২০১৪ সালে সরকারি কলেজের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থান লাভ করে রাজশাহী কলেজ। কলেজ পর্যায়ে বৃহত্তম মানব পতাকা প্রদর্শনের কৃতিত্বও লাভ করেছে এই কলেজ।

কলেজ প্রশাসন ভবনের সামনে রাজশাহী বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহ্যময়ী স্থান সমূহের ছবি সহ গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন সংস্কৃতির দৃশ্য টাইল্সের উপর অঙ্কন করা হয়েছে।

শুধু একাডেমিক পড়াশোনা নয়, কলেজ কে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে বিভিন্ন জায়গায় বসানো হয়েছে ডাস্টবিন। ঘোষণা করা হয়েছে ধুমপানমুক্ত ক্যাম্পাস হিসেবে। গাছে গাছে নামফলক লাগানোর পাশাপাশি কলেজের বিভিন্ন জায়গায় ফুলের বাগান স্থাপন করা হয়েছে। রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি, রোভার স্কাউটস, মিরর ইংলিশ ডিবেটিং ক্লাব, বিএনসিসি, বাঁধন সহ পঁচিশটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সহ-শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে রাজশাহী কলেজে।

গরীব, মেধাবী ও কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য রয়েছে বৃত্তি ও পুরস্কার। ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের চিকিৎসার জন্য রয়েছে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। শরীর চর্চার জন্য একটি জিমনেসিয়াম, খেলাধুলার জন্য একটি মাঠ, একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন, একটি পুকুর এবং নামাযের জন্য রয়েছে একটি মসজিদ। শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও পরীক্ষার ফি সহ অন্যান্য লেনদেনের জন্য রয়েছে রূপালী ব্যাংকের একটি শাখা।

কলেজে রয়েছে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। অনেক পুরানো বই, গেজেট, বিশ্বকোষ, পুঁথি, পান্ডুলিপি এবং পত্র-পত্রিকা দ্বারা গ্রন্থাগারটি সমৃদ্ধ। বর্তমানে গ্রন্থাগারে পুস্তকের সংখ্যা প্রায় ৮৩ হাজার এর অধিক। বর্তমানে কলেজের এইচএসসি সহ ২৪ টি বিভাগে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও ডিগ্রি পাস কোর্সে পড়ানো হয়। এখানে অধ্যয়ন করছেন প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থী। আর কর্মরত আছেন ২৪১ জন শিক্ষক।

সকালবেলা কলেজ চত্তরে পা রাখলেই দেখা যায় আগামীর কর্ণধারদের জন্য নির্মল সবুজ ক্যাম্পাস যেন তার শিশির ভেজা আচল বিছিয়ে রেখেছে। সকাল বেলা সবাই ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বেলা গড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে আড্ডা। দুপুর না গড়াতেই পুরো কলেজ যেন তারুণ্যের মিলন মেলায় পরিণত হয়। পড়ালেখার পাঠ চুকে তখন বন্ধুদের সাথে আড্ডাই যেন কলেজে আসার মূল আনন্দ হয়ে উঠে।

রাজশাহী কলেজ শহীদ মিনার চত্বর, রবীন্দ্র-নজরুল চত্বর, শহীদ দুলাল ক্যান্টিন, বোটানিক্যাল গার্ডেন, সমাজবিজ্ঞান চত্বর এসব চত্বরই প্রাণ দেয় ক্যাম্পাসকে। দুপুরের পর তাদের আনন্দমেলায় বিরতি নামলেও বিকাল গড়াতেই আবারও মুখর হয়ে উঠে কলেজ চত্বর। কলেজের বিশাল মাঠ হয়ে যায় খেলাধুলা আর সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র। শিক্ষার পাশাপাশি সংবাদিকতা, সংস্কৃতি চর্চা, আড্ডা, বিনোদন সবকিছুই চলে এখানে। সামনে এগিয়ে যাক ঐতিহ্যময়ী এই প্রতিষ্ঠান, আর এখান থেকে তৈরি হোক জাতির নতুন কর্ণধার।

ডেইলি সানশাইন থেকে তথ্য সংগৃহীত এবং পরিমার্জিত

বি:দ্র: রাজশাহী এক্সপ্রেস এর প্রতিষ্ঠাতা মীর রাসেল, রাজশাহী কলেজের ২০১১-১২ সালের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি রাজশাজী কলেজের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন