চাঁপাইনবাবগঞ্জে হারিয়ে যাচ্ছে ভেড়ার লোমের কম্বল

চাঁপাইনবাবগঞ্জ রাজশাহী বিভাগ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নয়াগোলা এলাকা। ১৯৫০ সালের দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার কিছু লোক আসে। তারা ভেড়া পালন করে। আর ভেড়ার লোম দিয়ে কম্বল তৈরির কাজ শুরু করে। ভেড়ার লোমের গরম কম্বল সেই আমল থেকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। একসময় শিল্পটি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তা এখন বিলুপ্তির পথে। আধুনিকতার জোয়ারের তোড়ে তলিয়ে যাচ্ছে শিল্পটি। পেশার সঙ্গে জড়িতরাও জীবিকার তাড়নায় চলে যাচ্ছে অন্য পেশায়।

তাদের অনেকেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাপ-দাদার আমলের পেশাটি ধরে রাখার। সরকারি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অভাব, বাজারজাতকরনের সমস্যা, খরচের তুলনায় দাম কম হওয়ার কারণে শিল্পটি হারিয়ে যেতে বসেছে।
নয়াগোলা মমিন পাড়া এলাকার সালামত আলী ও ওবাইদুল হক। দীর্ঘ চার যুগের বেশি সময় ধরে তারা ভেড়ার লোমের কম্বল তৈরি করে আসছে। তবে, জীবিকার তাগিদে এ পেশায় তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

সালামত আলী জানান, তিনি দীর্ঘ দিন থেকে এ শিল্প বাঁচানোর জন্য কাজ করছেন। কিন্তু ভেড়ার রুম দিয়ে কম্বল তৈরির কাজটা করতে বেশ কষ্ট পেতে হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন জায়গায় যারা ভেড়া পালন করেন তাদের কাছ থেকে বছরে দুই তিনবার গিয়ে লোম সংগ্রহ করে আনতে হয়। এসব লোম এনে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করতে হয়। তারপর সেগুলো মেশিনে মৃষণ করতে হয়। তারপর চরকার মাধ্যমে সুতা কাটার পর কম্বল তৈরি করতে হয়।

তিনি আরো জানান, কম্বল তৈরি করতে প্রায় ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। কিন্তু এ অনুযায়ি দাম পাওয়া যায়নি। বাজারে প্রতিটি কম্বলের দাম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। কখনো এরচেয়েও কম দামে বিক্রি করতে হয়।

কারিগর ওবাইদুল হক ভেড়ার লোমের কম্বলের স্বর্ণযুগের কথা স্মৃতিচারন করে বলেন, পাকিস্তান আমলে সারা দেশ হতে বিভিন্ন সম্পদায়ের লোক এসে আমাদের কাছে এ কম্বল অর্ডার দিত। তখন আমরা বাড়ির সবাই মিলে এ কাজ করে শেষ করতে পারতাম না। নিয়মিত অর্ডার ছাড়াও আমাদের কাছে বিভিন্ন মানুষ কিনে নিয়ে সাইকেলযোগে গ্রমে গ্রামে বিক্রি করত।

তিনি আরো জানান, একবার ১৯৭৩ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তার লোক দিয়ে প্রায় ৫০০ কম্বল আমাদের কাছে অর্ডার দিয়ে নিয়েছিলেন। কম্বলগুলো শেখ মুজিবর রহমান বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতাল, সরকারি শিশু পরিবারসহ বেশ কিছু দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের উপহার দিয়েছিলেন। এখন আমাদের খোঁজ আর কেউ নেয় না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. মাযহারুল ইসলাম তরু জানান, ১৯৫০ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার কিছু লোক এসে তারা ভেড়ার চাষ করে ভেড়ার রুম দিয়ে কম্বল তৈরির কাজ শুরু করে। বর্তমানে এটি আমাদের নয়াগোলা মমিন পাড়ায় কয়েকজন মানুষ এটি তৈরি করে আসছে।
একবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাড়াও নোয়াখলী, ফেনী ও ঢাকার কয়েক জায়গায় এটি তৈরি করার চেষ্টা করা হলেও বাজারজাত করনের সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় ওইসব এলাকায় শিল্পটি টিকতে পারেনি।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এবং কম্বলটি আরো বেশি উন্নতমানের করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে শিল্পটির উন্নয়ন করা সম্ভব। ভেড়ার লোমের তৈরি কম্বল চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি শিল্প। এটাকে রক্ষা করতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

খবরঃ দৈনিক সানশাইন

1 thought on “চাঁপাইনবাবগঞ্জে হারিয়ে যাচ্ছে ভেড়ার লোমের কম্বল

Comments are closed.