ছোট গল্পঃ কাগজের নৌকো

সাহিত্য

কাগজের নৌকো
সাব্বির জাদিদ
.

পৃথিবীটা গোলাকার বলেই বোধহয় একটা মানুষের সাথে ঘুরেফিরে বারবার দেখা হয়ে যায়। নইলে সাত বছর পর ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় আজ কেন শিরিনের সাথে দেখা হবে। শিরিন তো এখন সংসারের সুখি গৃহিণী। বাচ্চা কাচ্চা স্বামীসহ কুষ্টিয়া থাকে। আর আমি ছোট্ট একটা চাকরি নিয়ে ঢাকা শহরে দাঁড়াবার চেষ্টা করছি। পায়ের নিচের মাটি এখনো শক্ত হয়নি। স্টেডিয়াম পাড়ায় এক টুকরো বাসায় পড়ে থাকি। ঠিকে একটা ঝি আছে। দুবেলা রান্না করে দিয়ে যায়। সেসব ছাইপাশ খেয়ে বেঁচে আছি।
বাসা থেকে অফিস পায়ে হাঁটা পথ। দুপুরের খাবারটা তাই বাসায় এসে খেয়ে যাই। আজ দুপুরে ভাতঘুম রেখে অফিসে যেতে ইচ্ছা করছিল না। কিন্তু না গিয়ে উপায় কি? চাকরি মানেই দাসত্ব। কিছু টাকার বিনিময়ে সময় এবং শ্রম সমর্পণ।
স্টেডিয়াম পেছনে ফেলে হার্ট ফাউন্ডেশনের ফুটপাতে উঠেই দেখি শিরিন। প্রথম নজরে চিনতে পারিনি। কচি লাউয়ের ডগার মত ছিপছিপে গড়নটা আর নেই। বেশ মুটিয়ে গেছে। তবে মুখের আদলটা বদলায়নি একটুও। আমি পাশ কেটে চলেই যেতাম হয়ত। তার আগে ও বাঁ হাতের আঙুল দিয়ে কপালের চুল সরাল। চুল সরানোর এই ভঙ্গিমার বিবরণ দিতে গিয়ে কবি সাহিত্যিকগণ বারবার অজ্ঞান হয়েছেন। আমি কোন সাহিত্যিক নই, কবি তো ন-ই। আমি হলাম উচ্চারণ অযোগ্য স্বল্প বেতনের ছোট চাকুরে। তবু শিরিনের ওই ভঙ্গিমা দেখে আমার বুকেন মাটি কেঁপে উঠল। এমন অদ্ভুত আকর্ষণীয় ঢঙে চুল সরায় যে মেয়ে, সে শিরিন না হয়ে পারেই না।
এতক্ষণে লক্ষ করলাম ওর পরনে কলমি লতার ছাপ দেয়া লাল শাড়ি। কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ। স্বামীর সাথে দাঁড়িয়ে আছে ফুটপাতে। হয়ত গাড়ির অপেক্ষায়। হঠাৎ মরে যাওয়া ঈর্ষাটা আমার বুকের বাঁ পাশে খচখচ করে উঠল।
শিরনকে খুব পছন্দ ছিল আমার মায়ের। মা অবশ্য মুখ ফুটে কিছুই বলতেন না। আসলে কিছু বলার সময়ও তখন আসেনি। গ্রামের হাইস্কুলে আমি নাইনে । শিরিন সেভেনে। মেয়েটাকে যেন ভূতে পেয়েছিল। এক মুহূর্ত বাড়িতে দাঁড়াত না। ইস্কুল থেকে ফিরে দু’গাল খেতো কি খেতো না, ছুটে আসত আমাদের বাড়ি। রান্নাঘরে মায়ের পাশে বসে শাক বাছত। তরকারি কুটত। কখনো পেয়াজ কাটতে গিয়ে নাক আর চোখের জল এক করে ফেলত। মা পরম আদরে আঁচল টেনে ওর নাক আর চোখের জল মুছে দিতেন। কখনো চোখের জলে ওর কাজল ধুয়ে যেত। ও তখন সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলত। মা পড়তেন বিপাকে। কান্না থামাবেন কিভাবে। মা তখন পুরনো তৈজসপত্রের স্তূপ ঘাঁটতেন। আমার ছোটবেলার কাজলদান বার করে ওর চোখ সাজিয়ো দিতেন। মুহূর্তে ওর কান্না থেমে যেত।
কখনো বেণি দুলিয়ে ছুটে আসত আমার পড়ার ঘরে। টেবিলে সাজানো বইখাতা সব এলোমেলো করে দিত। আমি ওর খাড়া কান চেপে ধরতাম—বল আর কোনদিন আমার ঘরে ঢুকবি? শিরিন শালিকের মত কিচিরমিচির করে উঠত—ও চাচি তোমার ছেলে আমাকে মারে।
শিরিনের চিৎকার শুনে রান্না ফেলে ছুটে আসতেন মা। শিরিনের কান ছেড়ে দিয়ে আমি ততক্ষণে সুবোধ বালক। শিরিন মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে পাকা করমচার মত লাল কান ডলত আর বলত—ইশ আরেকটু হলে কানটা আমার ছিঁড়েই যেত। চাচি তোমার ছেলেকে সাবধান কর।
মা আমাকে বকতেন—তুই কি ভাল হবিনে কোনদিন! এতটুকুন মেয়ের গায়ে কেউ হাত তোলে!
মায়ের ধমকের সামনে নাজেহাল আমি অপাঙ্গে চোখ তুলে দেখতাম, মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে ভেংচি কাটছে শিরিন। আহা! কি মধুর সেই দৃশ্য!
মেট্রিকের রেজাল্টের পর ভাল কলেজে ভর্তি হওয়ার আশায় চলে এলাম ঢাকা। গ্রামের ইস্কুলে শিরিন তখন নাইনে। আশা ছিল বিদায় বেলায় শিরিন পাশে থাকবে। পানপাতা মুখে বিষণ্ণতা ফুটিয়ে তুলে বলবে—আবার কবে আসবে? যদিওবা নীলখামে গোপন চিঠি লিখবার মত লুকানো ছাপানো কোন সম্পর্ক ছিল না আমাদের। তবু তো আমরা এক সাথে বড় হয়েছি। মায়ের হাতের মাখানো খাবার খেয়েছি। গোল্লাছুট খেলেছি। ঝগড়া বাঁধিয়েছি। সব ভুলে আবার একাকার হয়ে মিশেছি। এসবের কি কোনই মূল্য নেই? অন্তত যখন আমি দীর্ঘদিনের জন্য পড়তে যাচ্ছি ঢাকায়। এ সময় কি ও বলতে পারত না—সাবধানে যেও!
কি এক অভিমান জমেছিল বুকে। বাড়ি ফিরলাম চার মাস পর। এত দীর্ঘ সময় বাড়ি ছেড়ে বাইরে থাকা এটাই প্রথম। বাগান মোড়ে যখন ভ্যান থেকে নামলাম দুুপুর হেলান দিয়েছে বিকেলের গায়। বুকের নদীতে উথাল পাথাল ঢেউ। কেমন আছে মা? কেমন আছে শিরিন?
শিরিনদের বাড়ি পার হয়ে আমাদের বাড়ি। ওদের বাড়ি পার হওয়ার সময় একবার আড়চোখে তাকালাম। সবকিছুই ঠিক আছে। শুধু গেটের মুখে গন্ধরাজেগুলো শুকিয়ে গেছে। আমার বুকের ভেতরটা কেমন কেমন করে ওঠে।
উঠোনে পা রাখতেই ছুটে এলেন মা—কিরে খবর না দিয়ে চলে এলি যে বাবা! ভাল আছিস তো? শরীরের এই হাল কেন? অসুখ করেছে নাকি?
ব্যাগ রেখে মাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, আমি ঠিক আছি মা। রোগা দেখাচ্ছে সে তোমার চোখের দোষ। পৃথিবীর সব মায়ের চোখ সন্তানদের রোগা দেখে।
বাড়িতে আসার পর থেকেই খেয়াল করছি মা হঠাৎ হঠাৎ কেমন আনমনা হয়ে যাচ্ছেন। এতদিন পর বাড়ি এলাম, কোথায় আমাকে নিয়ে আনন্দ করবেন তা না চুলোর পিঠে ঝিম ধরে বসে আছেন।
হাত মুখ ধুয়ে খাবার পাটিতে বসার পরই কথাটা পাড়লেন মা—শিরিনের বিয়ে হয়ে গেছে।
—বিয়ে! পৃথিবীটা যেন মড়াত করে আমার মাথার উপর ভেঙে পড়ল। খাবারের দলাটা গলার কাছে আটকে গেল। সন্দেহপূর্ণ চোখে তাকালাম মায়ের মুখের দিকে। মায়ের মুখটা খুব ভারি। চোখ ছলছল করছে। খাবার প্লেটে অনর্থক আঙুল নাড়তে নাড়তে বললাম, কবে বিয়ে হয়েছে?
—গত মাসে
—কোথায়?
—কুষ্টিয়া। অনেক বড় ঘর। ছেলে ব্যবসায়ী।
—ভাল তো। শিরিন সুখে থাকবে।
মা আর থাকলেন না সামনে। পাশের ঘরে চলে গেলেন। সম্ভবত কান্না লুকোতে।
আমার ছুটি ফুরোবার আগেই নাইওরে এলো শিরিন। ওর মুখোমুখি দাঁড়াবার কোন রুচিই আমার ছিল না। ইচ্ছে করছিল দূরে কোথাও পালিয়ে যাই। কিন্তু যাব কোথায়?
পরদিন স্বামীসহ আমাদের বাড়ি বেড়াতে এলো শিরিন। কলপাড়ে লেবুগাছের তলে দাঁড়িয়ে নবদম্পতিকে দেখে দীর্ঘশ্বাস গোপন করলাম। খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। তবু সৌজন্যের খাতিরে ওর বরের দিকে হাত বাড়াতে হল। প্রথম দেখা হওয়ার সময় নিয়ম করে অতি কমন কিছু সংলাপ আওড়াতে হয়। আমি তাও পারলাম না। বিপদ থেকে উদ্ধার করল শিরিন নিজেই। পরিচয় করিয়ে দেবার ঢঙে বলল, এ হল সাদাত ভাই। আমারা একসাথে বড় হয়ছি। অবশ্য আমার দুবছরের সিনিয়র। এখন ঢাকায় পড়ছে। আর সাদাত ভাই তুমি নিশ্চয় চাচির মুখে সব শুনেছো। আমাদের জন্য দোয়া করবে।
সবই ঠিক ছিল। শেষের কথাটা কেন বলতে গেল শিরিন? দোয়া করবে মানে কি! ওর সংসারের সুখের জন্য দোয়া? আমার বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যেতে লাগল। তাড়াতাড়ি দায় এড়াতে বললাম, ঘরে মা আছে দেখা করে যাও।
শিরিনের সাথে ওটাই আমার শেষ কথা এবং শেষ দেখা। তারপর ইচ্ছে করেই আর কোনদিন ওর মুখোমুখি হইনি। পরাজিত সৈনিকের মত পালিয়ে বেড়িয়েছি। তবে আড়াল থেকে ঠিকই জেনেছি তিন বছরের মাথায় ওর একটা মেয়ে হয়েছে। মেয়ের নাম শাবিবা জান্নাত। তারপর দিন ফুরিয়েছে দিনের নিয়মে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনাটা শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারিনি। বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর ঢুকতে হয়েছে চাকরির খাঁচায়। এতদিতে একপেশে ভালবাসার গায়ে ধুলোর স্তূপ জমেছে।
আমার মনে হয় ভাগ্য আমাকে নিয়ে শুধু শুধু রসিকতা করে। সব ভুলে ভালে আমার দিনগুলি তো দিব্যি কেটে যাচ্ছিল। তাহলে সাত বছর পর আজ আমার অফিসের পথ আগলে শিরিন কেন অমন ঢঙে চুল সরাবে আর আমার বুকের মাটি কেঁপে উঠবে! আমি সুখ চাই না। আমি একটু স্বস্তি চাই।
এই মুহূর্তে আমার কী করা উচিত? সাত বছর কম সময় নয়। কালের চক্রান্তে জীবনের কত রকম পালাবদল ঘটে চলে। চেনা মানুষও অচেনা হয়ে যায়। এই মুহূর্তে আমি যদি ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াই, ওরা কি আমাকে চিনবে? নাকি পথের মানুষ ভেবে মুখ ফিরিয়ে নেবে? না না আমি দেখা করব না। আমার অভিমান বড় তীব্র।
পাঁচ কদমও এগোইনি, নারী কণ্ঠের চিৎকারে থামতে হল। পেছনে ফিরলাম। বাংলা ফিল্মের খুব সস্তা একটি দৃশ্য চিত্রায়ন হচ্ছে। ছিনতাইকারী শিরিনের ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে উল্টোপথে দৌড়াচ্ছে। শিরিন ব্যাগ ব্যাগ বলে চিৎকার করছে। রাস্তার মানুষগুলো নিষ্ক্রয়। সজিবও নীরব দর্শক। আমার ভেতর দায়িত্ববোধ জেগে উঠল। মফস্বলের একজোড়া নিরীহ মানুষ ঢাকায় এসে বেকায়দায় পড়ে গেছে। এই সময় অভিমান করে চলে যাওয়া যায় না। ব্যাগটা আর পাওয়া যাবে না। তবু ওদের পাশে দাঁড়িয়ে দু’দণ্ড কথা তো বলা যাবে।
এতকাল পর ঢাকার ধুলোওড়া ফুটপাতে আমাকে দেখে বিস্ময় ফুটে উঠল শিরিনের কণ্ঠে।—আরে সাদাত ভাই তুমি! কেমন আছ? এখানে কোথায়? এক সাথে তিনটা প্রশ্ন করে স্বামীর দিকে ফিরল শিরিন—একে চিনছ! সেই সাদাত ভাই। রাবেয়া চাচির ছেলে। ওই যে শানবাঁধানো পুকুরওয়ালা বাড়ি।
—চিনব না কেন। তুমি অনেক বলেছ ওঁর কথা। সজিব আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।—কেমন আছেন?
—ভাল। আপনি?
সজিবের হয়ে উত্তরটা দিল শিরিন—ওর কথা আর বল না। রোগ ভেতরে ভেতরে পুষবে। বউকে পর্যন্ত জানাবে না। তবু এ যাত্রায় অল্পতে রক্ষা হয়েছে।
আমি সজিবের কাঁধ ছুঁয়ে বললাম, আপনি বেশ শুকিয়ে গেছেন। কী হয়েছে?
—তেমন কিছু না। একটু হার্টের প্রবলেম।
আবার ফুঁসে উঠল শিরিন। যেন জলোচ্ছ্বাস।—একটু প্রবলেম, না? আর ক’টা দিন গেলেই বুঝতে!
শিরিন একটুও বদলায়নি। বয়স ওর উচ্ছল আচরণে কিছুটা সংযম এনেছে বটে। কিন্তু হাত নাড়ানো, ঠোঁট বাঁকানো, চুল ঝাকানোর সেই অপুরূপ লীলায়িত ছন্দ আজো আছে। একটু থেমে আমি বললাম, তোমার ব্যাগ ছিনতাই হল কিভাবে?
—ও তুমিও দেখেছ! এই শহরে তুমি কিভাবে থাকো?
—এ আর তেমন কি? আর কিছুদিন থাকলে বুঝতে নগরজীবনের যন্ত্র্রণা।
—হুম
—তোমার মেয়ে কেমন আছে? কি যেন নাম?
নামাটা আমি জানি। তাও জিগ্যেস করলাম। একটু উদাসীনতা দেখানোর চেষ্টা।
—মেয়ের নাম শাবিবা। দাদির কাছে রেখে এসেছি। সামনের বার ইস্কুলে দেব।
সজিব বারবার ঘড়ি দেখছে। আমাদের কথা বলা মনে হয় পছন্দ হচ্ছে না। আমি অস্বস্তি কাটাতে বললাম, আপনার ব্যবসা কেমন চলছে?
সজিব বলল, টুকটাক ভালই। তারপর শিরিনের দিকে ফিরে বলল, আর দেরি করা ঠিক হবে না। পাঁচটায় ট্রেন। কমলাপুর যেতে সময় লাগবে।
শিরিন বলল, ওমা তাইতো! আমি ভুলেই গেছিলাম। সাদাত ভাই, তুমি একটা সিএনজি ঠিক করে দাও না! আর তুমিও স্টেশন পর্যন্ত আমাদের সাথে চল।
খেয়াল করে দেখলাম শিরিনের চোখে মিনতির ছায়া। বললাম, তোমরা কি আজই ফিরতে চাও?
—থেকে আর কী হবে? শাবিবার আব্বুর ডাক্তার দেখানোর দরকার ছিল। সেটা হয়েছে। এখন ফিরে যেতে হবে চেনা সংসারে।
—আজকের দিনটা থেকে যাও আমার বাসায়।
—অগ্রিম টিকেট করা আছে। শুধু শুধু টাকাগুলো নষ্ট হবে।
—বাব্বাহ! সাংঘাতিক হিসেবি বউ। তোমার শ্বশুর শাশুড়ি ভাগ্যবান
—বাজে কথা রাখো। একটা সিএনজি দেখ আর তুমিও চল।
সিএনজি ঠিক করলাম। শিরিনের চাপে আমাকেও উঠতে হল। সিএনজির এক চিলতে সিটে স্বামীর পাশে বসে শিরিন কত অবলীলায় বলল, সাদাত ভাই তুমি বিয়ে করছ না কেন?
শিরিনের এই ‘অতর্কিত’ প্রশ্নে আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। হাসতে হাসতে বললাম, আমার মত আমড়া কাঠের ঢেঁকির সাথে কেই মেয়ে দেবে ভেবেছ! মেয়ের বাজার আজকাল খুবই গরম।
—হেঁয়ালি রাখো। জীবন পুতুল খেলা নয়। কবেকার কোন তুচ্ছ ঘটনার জের সারাজীবন বয়ে বেড়ানোর কোন মানে হয় না।
—তুচ্ছ ঘটনা! সেটা আবার কি?
—তুচ্ছ নয় তো কি? চাচির কাছে সব শুনেছি। তুমি কোন্ এক মেয়েকে পছন্দ করতে। তাকে না পাওয়ার শোকে বিয়ে করছ না। বল, এটা মিথ্যে কথা!
কী বলে এই অবুঝ গৃহবধূ। জীবনের পরিণত বয়সে এসে এই উপহাসটুকু না করলে কি চলত না! এখন যদি আমি দুম করে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেই তাহলে কেমন হবে? স্বামীর সামনে কি ও আদৌ স্বাভাবিক থাকতে পারবে? কিন্তু আমি কিছুই বলি না। সিএনজির দরজার ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি ছড়িয়ে দেই বাইরে। শহরের কর্মব্যস্ত মানুষ দেখতে ভাল লাগে। রকমারি পন্যের দোকানগুলো কত দ্রুত পেছনে চলে যাচ্ছে। জীবন থেকে যদি অমন পালানো যেত!
ট্রেন প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল। ট্রেনে তুলে দেবার আগে সজিবের হাতে হাত রাখলাম। ভাল থাকার কামনা ব্যক্ত করলা। সজিব ওদের কুষ্টিয়ার ঠিকানায় বারবার যেতে বলল। সৌজন্য দেখাতে মুখে যাওয়ার কথা স্বীকার করতেই হল। যদিও জানি— এই জনমে কোনদিন যাওয়া হবে না।
ট্রেন ছাড়ার আগে হঠাৎ এক কাণ্ড করে বসল শিরিন। যার জন্য আমি তো ন-ই , শিরিনও বোধহয় প্রস্তুত ছিল না। আচমকা ও ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে নেমে আমার হাত চেপে ধরল। মুখে বলল, আমি কোনদিন তোমাকে বোঝার চেষ্টা করিনি। আমাকে তুমি ক্ষমা কর দিও।
শিরিনের এই একটি মাত্র কথায় আমার এতদিনের রাগ অভিমান বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে মুছে গেল। আমি ওর কোমল হাতের ফাঁকে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে ওর টলমল চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ আমি ওর কানের কাছে মুখ নামিয়ে বললাম, আমি তোমাকে ভালবাসি শিরিন, অনেক ভালবাসি।
আমার কথা শেষ হওয়া মাত্র শিরিন আর্তনাদ করে কি যেন বলতে গেল। কিন্তু ট্রেনের তীব্র হুইসেলের সামনে ওর শব্দ দাঁড়াতে পারল না। হঠাৎ খেয়াল করলাম দাঁড়িয়ে থাকা যান্ত্রিক দানবটা নড়াচড়া শুরু করেছে। সজিব দরজায় ঝুলে রাগ রাগ চোখে শিরিনকে ডাকছে। আমার তখন মনে পড়ে গেল শিরিনের একজন জীবনসঙ্গী আছে। এবং এই আন্তঃনগর এক্সপ্রেসে সে তার আপন ঘরে যাবে। আমি এবার দায়িত্বশীল পুরুষ হয়ে গেলাম। নড়তে থাকা ট্রেনের সরু দরজায় শিরিনের ভারি দেহটা ঠেলে দিয়ে দায়িত্ব সম্পন্ন করলাম। তার পরপরই জ্যান্ত সরীসৃপটা শিরিনকে পেটে নিয়ে উধাও হয়ে গেল। আর নির্বান্ধব ঢাকা শহরে আবার আমি একলা হয়ে পড়লাম।