ছোট গল্পঃ বিষন্নতার সূর্য

সাহিত্য

বিষন্নতার সূর্য
– রাফসান সাদী


.
বিছানার উপর শোয়া থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠে বসল শূণ্য।গা বিছানা ঘামে ভিজে চপচপ করছে।কতক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে নিজেকে স্থির করে নিল ও।বুঝতে পারল দুঃস্বপ্ন দেখছিল।বাম হাতের তালু দিয়ে ঘর্মাক্ত মুখটা মুছে বিছানার সাথে লাগোয়া টেবিলটার উপর থেকে বোতলটা টেনে নিল,তারপর সেটার তলায় জমে থাকা পানিটুকু শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকা গলায় চালান করে দিল।
পাশের সিঙ্গেল বেডটার উপর ঘুমুচ্ছে “বড়লোক মামার ভাগ্নে” আমীন।যথেষ্ট ভদ্র আর শান্তশিষ্ট।ও এই নামেই বেশ প্রসিদ্ধ।কারন ওর মামা বিশাল বড়লোক।বেশ কয়েকটা গার্মেন্টসের মালিক।সাথে সমাজকল্যাণমূলক কাজ হিসেবে দুটো বৃদ্ধাশ্রম আর একটা এনজিওর সঙ্গেও জড়িত আছেন।
আমীনের সাথে পরিচয়টা হয়েছিল একটু অন্যরকমভাবে।মোহাম্মদপুর থেকে বনশ্রী আসার জন্য বাসের জানালার পাশের সিটে বসেছিল শূণ্য,কানে হেডফোন ছিল।হঠাৎ পাশ থেকে কাঁধে টোকা পড়ায় সেদিকে ফিরে কান থেকে হেডফোনটা সরালো।পাশের সিটে বসা ছেলেটা বলল:আচ্ছা মৌচাক যেতে কতক্ষণ লাগতে পারে?
– ইয়ে মানে,আসলে…….”শূণ্য প্রশ্নটা শুনে উত্তরের খোজে মাথা চুলকাতে লাগল।
– ৯টার আগে তো পৌছুতে পারব?নাকি?” প্রশ্নের উত্তরটা সহজ করে দিতে চাইল যেন ছেলেটা।
– ওম… হ্যাঁ,তা পারবেন।”হাতের ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা বাজতে দেখে জবাব দিল শূণ্য।
বাসে থাকা বাকি সময়টুকু ছেলেটার সাথে কথা বলে কাটিয়ে দিল ও।নামার আগে ফোন নাম্বার আদান-প্রদান করে ছেলেটা বলল:
– আপনার নামটাই তো জানা হল না।আমি আমীন।
– আমি শূণ্য।
এর কয়েকদিন পর শূণ্যের রুমমেট চলে গেল।শূণ্য তখন ভালো ভেজালে পড়েছিল।এমনিতেই মায়ের ঔষধের খরচ জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছিল,তার উপর ঘর ভাড়ার পুরোটা দিতে হবে ভেবে ভেতর ভেতর চিন্তায় ঘামছিল।
তখনই আমীনের ফোন!কথাবার্তা শেষে আমীন বলল:
– আমার ঢাকা থাকার জন্য একটা জায়গা দরকার।আপনার সাথে দেখা হওয়ার দিন থেকে মামার বাসায় থাকছি।নিজের ভেতরটায় কেমন যেন খুতখুত করছে।কোন ঠিকানা থাকলে জানাতে পারেন।
আমীনের কথায় ঘাম দিয়ে জ্বর সারল যেন ওর।তখনই বাসার ঠিকানা দিয়ে দিল ও।পরদিনই শিফট হয়ে গেল ওর রুমে।সেই থেকেই ওরা এক রুমে আছে।
.
মাথার পাশে থাকা চশমাটা চোখে দিয়ে বিছানা থেকে নেমে ছোট ছোট পা ফেলে রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দায় চলে আসল শূণ্য।জোছনার চাদরে মুড়ে আছে মধ্যরাতের শান্ত শহর,সাথে মৃদু বায়ূ যেন রাতের মৌন সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আচ্ছা,এই সময়টাতে নুমার হাতে হাত রেখে সমুদ্রের পাড় ধরে হাটতে পারলে কেমন হত?
পরক্ষনেই নিজের ভেতরে কিছু নড়াচড়া অনুভব করে মায়ের কথা মনে পড়ে গেল ওর।মা বলতেন,রাতের বাতাসের এক অদ্ভূত ক্ষমতা আছে।রাতের বাতাস ঘুমন্ত মানুষগুলোর ঘুম না ভাঙ্গাতে পারলেও জেগে থাকা মানুষদের মনের কোণে জড়সড় হয়ে ঘুমিয়ে থাকা কষ্টগুলােকে জাগিয়ে দেয়।
মা বলতেন কারন মা আর কখনো বলতে পারবেন না,উনি গতসপ্তাহে না বলার,না ফেরার দেশে চলে গেছেন।
ছোটবেলায় মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গলেই শূণ্য দেখতে পেত:মা জায়নামাজে বসে বসে কাঁদছে,বাবার জন্য।বাবাকে দেখেছে বলে কখনো মনে করতে পারে নি ও।ওকে একেবারে ছোট্টটি রেখেই মারা গিয়েছিলেন বাবা।
বাবাকে অনেক ভালোবাসতেন মা।তাই তিনি আর দ্বিতীয় বিয়েতে সায় দেন নি।এ নিয়ে মামা-খালারা কম পানি ঘোলা করেন নি।কিন্তু মা নিজ সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।তাই বিষয়টা নিয়ে সম্পর্কের অবনতি বৈ কিছু হয় নি।
বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল শূণ্যের।কষ্টগুলো আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠছে।মনের আঙ্গিনায় ছুটোছুটি শুরু করবে যে কোন সময়……….
.

.
হেল্পারের হাকডাকে তন্দ্রা টুটে গেল শূণ্যের।জানালা দিয়ে তাকিয়ে গন্তব্য নিকটে বুঝে হাতের ঘড়িতে টাইম দেখল ও।সামান্য দেরী হয়ে গিয়েছে।চশমাটা নাকের উপরের দিকে ঠেলে দিয়ে উঠে দাড়ালো ও।ছয় ফুট লম্বা দেহটা নিয়ে সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার লোকাল বাসের রডটা হাতড়ে হাতড়ে মাথা নুইয়ে মাঝ পর্যন্ত আসতেই পকেটের ভেতর থেকে কাপুনি দিতে থাকল ফোনটা।কোচিং থেকে ফোন এসেছে মনে হয়।
কথা শেষে ফোনটা রাখতে পকেটে হাত দিতেই ড্রাইভার হার্ড ব্রেক কষল।
আচমকা ব্রেক করার কারনে পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিয়েছিল ও।কিন্তু “মরার উপর খরার ঘা”এর মত পেছন থেকে ধাক্কা লাগায় চশমাটা ছিটকে পড়ে গেল বেশ খানিকটা দূরে,বাসের ভেতরই।
চশমা তুলে চোখের সামনে ধরল ও।এক চোখের গ্লাসে কিসের যেন ম্যাপ তৈরী হয়ে গিয়েছে ফেটে।
রাগে পেছন ফিরল শূণ্য।একটা শ্যামলামত তরুণী মেয়ে দাড়িয়ে আছে মুখ কুচকে,যেন এক্ষুনি কেঁদে ফেলবে!চোখগুলো স্বচ্ছ,মায়ায় পূর্ণ।
– ওকে ওকে,কোন সমস্যা নেই।” বিব্রতকর পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে দ্রুত বলল শূণ্য।
পাশে চেপে গিয়ে মেয়েটাকে নিজের আগেই নামার জায়গা করে দিল।মেয়েটা একবার পেছনে ফিরল,তারপর হাসতে চেয়ে ঠোট দুটো বাকালো।কিন্তু ঠোট দুটোতে অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল।
.
কোচিংয়ের ক্লাস শেষ করে যখন শূণ্য বের হল,ততক্ষণে সূর্য নিজের বিদায়বেলার চিহ্ন আকাশে ছড়িয়ে দিয়েছে।সূর্যের লালিমা গায়ে মেখে মেঘগুলো সদলবলে নিজেদের গন্তব্যপানে ছুটে চলেছে।
অন্যসময় হলে দৃশ্যটা মনভরে উপভোগ করা যেত,কিন্তু চশমাটার কারনে বিরক্তি চেপে বসলো মনে।ক্লাসও ঠিকমত নিতে পারে নি,আধা অন্ধের মত কোনরকম সময়টুকু পার করে বেরিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলো।
“স্যার…….”পিছন থেকে চিৎকার ভেসে আসল।পেছন ফিরে এক ছাত্রকে দৌড়ে আসতে দেখল শূণ্য।শান্ত নাম ছেলেটার।
ছেলেটা কাছে এসে হাপাতে হাপাতে একটা ইনভাইটেশন কার্ড ওর হাতে ধরিয়ে দিল।কার্ডটা হাতে নিয়ে ছেলেটার দিকে তাকালো ও।পেছনে ভারি মেকাপ করা এক মহিলা আর অষ্টাদশী এক সুন্দরী তরুণী এসে দাড়িয়েছে।
“স্যার কাল ওর জন্মদিন।আপনাকে কিন্তু সন্ধায় আমাদের বাসায় আসতে হবে।”
মহিলার মুখে স্যার শব্দ শুনে লজ্জায় কুকড়ে গেল ও।
সাথে থাকা মেয়েটা উদ্ধার করল যেন:গেট দিয়ে বের হয়ে সামনের দিকে দশ-বারো কদম হাটলেই ডানপাশে একটা গলি পাবেন।সেখানে গিয়ে যে কাউকেই “সাবের সাহেবের বাসা কোনটা” জিজ্ঞেস করলেই পেয়ে যাবেন।আসবেন তো?
– হ্যাঁ,মানে চেষ্টা করবো।”শূণ্য আমতা আমতা ভাবটা কাটিয়ে উঠে জবাব দিল।
.
বাসায় পৌছে দ্রুত ঘামে কাপড় পাল্টে ফেলল শূণ্য।আমীন গভীর মনোযোগের সাথে মনিটরে তাকিয়ে আছে।ওর দৃষ্টির অনুসরণ করে সেদিকে তাকালো শূণ্য।একটা গ্রুপ ফটো দেখা যাচ্ছে,আমীন সহ বেশ কয়েকটা ছেলে মেয়ে আরেকজন পৌঢ় দাড়িয়ে আছে।পেছনে দিগন্ত ছোয়া শান্ত সমুদ্র।
“কক্সবাজার।তাই না?”
– হুম।গিয়েছিলেন কখনো?”আমীন ঘাড় ফিরিয়ে শূণ্যর দিকে তাকালো।
– নাহ!একবার প্ল্যানিং করেছিলাম,কিন্তু জমানো টাকা মায়ের ঔষধের জন্য খরচ হয়ে গিয়েছে।”
কথাগুলোর আগে শূণ্যের ফস করে ফেলা নিঃশ্বাস শুনতে পেয়ে মাথা চুলকালো আমীন।তারপর বলল:
– একটা প্রপোজাল আছে,শুনবেন?
– কেমন?
– মামার এনজিওর পক্ষ থেকে একজন টিচার পাঠাবে সেন্টমার্টিন দ্বীপের একটা ছোট স্কুলের জন্য।যাবেন?বেতন ভালো।
– নাহ।এখানে মা আছে,উনাকে রেখে যাওয়া সম্ভব না।আর উনিও সেখানে যাবেন না।তাছাড়া আগে হাত ধরার জন্য কাউকে পেয়ে নেই,তারপর সেখানে যাবো।”
কথাগুলো বলে ফোন হাতে বারান্দায় চলে আসল শূণ্য।মার সাথে কথা হয় নি গতকালও,আজ না বললে কিছু হল কি না ছেলের এই চিন্তায় অস্থির হয়ে যাবে।
.
মায়ের অবস্থা বেশি ভালো না,কোমরের ব্যাথাটা আরো বেড়েছে।ডাক্তার দেখাতে হবে।
যা ইনকাম,তা দিয়ে মায়ের আর নিজের খরচ চালানো শেষে আর কিছুই থাকে না।আবার অনেক সময় কোন মাসের মাঝখানেই সব শেষ হয়ে যায়,তখন ধার-দেনা করে পরের কয়েক মাসে কষ্ট করে শোধ করতে হয়।তাও যে চলতে পারছে এভাবে,সেটাও বা ওর জন্য কম কিসে?
.
বিশাল হলরুমের এক কোণে চুপচাপ বসে আছে শূণ্য।চারদিকে বাচ্চাদের হৈচৈ আর আর অপিরিচিত মানুষের ভীড়ে কেমন অস্বস্তি লাগছে ওর।খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ করে চলে যেতে চেয়েছিল ও,কিন্তু সাবের সাহেব দেখা করবেন বলে একটু বসতে বলেছেন।তাই এতক্ষন যাবৎ বসে থাকা।
চলে যাবে কি না ভাবছিল শূণ্য,তখনই সাবের সাহেব আসলেন।
কতক্ষণ কথার পর বুঝতে পারলো,জন্মদিনের ইনভাইট একটা মাধ্যম মাত্র।আসল কথা উনার ইন্টার পড়ুয়া দুই মেয়েকে পড়াতে হবে।ওর পড়ানোর ধরণ নাকি কোন মেয়ের ভালো লেগেছে।
শূণ্য চিন্তা করে জানাবে বলে উঠে দাড়ালো।
.
রাতে শুয়ে ত্রিপক্ষীয় ভাবনায় আক্রান্ত হল শূণ্য।এক.মায়ের অসুস্থতা।দুই.বাসে দেখা তরুণী।এবং তিন.শান্তর বোনদের টিউশনি।
মায়ের অসুস্থতা আর ভবিষ্যৎ সেভিংসের জন্য টিউশনিটা নিবে বলে ঠিক করে ফেলল ও।কিন্তু বাসে দেখা মেয়েটার ব্যাপারে চিন্তার কোন কুল-কিনারা বের করতে পারল ও।মনে মনে মেয়েটার নাম দিয়ে দিল মায়াবতী।চোখ বন্ধ করলেই মেয়েটার স্বচ্ছ মায়াবী চোখদুটি দেখতে পাচ্ছিল।কিন্তু হারিয়ে যাওয়া জিনিস কল্পনায় বেশি আসলেও বাস্তবে খুব কম ফেরত পাওয়া যায়।তাছাড়া নামের মত শূণ্যের প্রাপ্তির পরিমাণও প্রায় শূণ্যের কোঠায়।তাই বেশীদূর যাওয়া হল না আশার হাতছানির প্রতি,গাঢ় অন্ধকার টেনে নিল ওকে নিজের নিঃশেষ অস্তিত্বে।
.

.
সামনের ডানদিকে বসা তরুণী মেয়েটা তার মায়াবী চোখ দিয়ে চোরা দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে শূণ্যের দিকে।মুখে লজ্জার আভা।
শূণ্য চশমাটা নাকের উপরের দিকে ঠেলে দিয়ে আনন্দ-বিস্ময় মাখা দৃষ্টিতে দেখছে মেয়েটাকে,বাসে দেখা পাওয়া স্বচ্ছ চোখজোড়ার অধিকারীনিকে,ওর মায়াবতীকে।পাশে বসে আছে কোচিংয়ে দেখা হওয়া সুন্দরী মেয়েটা।এ দুজনের মাঝে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় আছে মেয়েটা,বুঝতে পারছে সাথের দুজনের ভেতর কিছু চলছে,কিন্তু ঠাহর করতে পারছে না আসলে চলছেটা কি?
– তোমরা দুজন আপন বোন?”মুরব্বী হিসেবে শূণ্য স্টার্ট করল।
– নাহ,স্যার।আমরা চাইল্ডহুড ফ্রেন্ড।ছোট থেকেই আমরা এক সাথে থাকি,তাই ফ্রেন্ডশীপ এখন সিস্টারশীপ হয়ে গিয়েছে।বাবা কখনো আমাদের আলাদা করে দেখেন নি।সামনে দুই বাসা পরই ওদের বাসা”
সুন্দরী মেয়েটা গড়গড় করে মুখস্থ বুলি আওড়ালো যেন।
– ও,,তা তোমরা ক ভাই-বোন?”সুন্দরী মেয়েটার দিকে ফিরল শূণ্য।
– স্যার আমি আর আমার ছোট ভাই শান্ত,আমরা দুজনই।আমি নাবা।”
– আর তোমরা?”চশমাটা নাকের উপর দিকে ঠেলে দিয়ে মায়াবতীর দিকে তাকালো ও।
– স্যার ওরা দু বোন,ও ছোট।আর ওর নাম নুমা।”নাবা হুটহাট জবাব দিয়ে দিল।r
পরিচয় পর্ব শেষ করে সেদিনের মত চলে আসল শূণ্য।
.
টিউশনিটা পেয়ে মন্দ হয় নি শূণ্যর।বাড়তি কিছু ইনকামও হচ্ছে,সন্ধার পরের সময়টুকুও কাজে লাগছে।
ছাত্রী হিসেবে দুজনেই মোটামুটি ভালো।নাবা একটু বেশী চঞ্চল,সমস্যা এটাও না।সমস্যা হল শূণ্য যখন বই থেকে কিছু পড়াতপড়াতে শুরু করে,মেয়েটা তখন কেমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।এই দৃষ্টির খুব একটা সুবিধার না,বুঝতে পারে শূণ্য।নিজের পার্সোনালিটি রক্ষার ব্যাপারে নিজেকে সতর্ক করে সাবের সাহেবের বাসার কনিংবেল চাপলো ও।
.
“কাল আমি বাড়িতে যাচ্ছি।দু’একদিন আসা হবে না,পড়াগুলো কমপ্লিট করে নিও নিজেরাই।”
পড়ানো শেষে কথাগুলো বলে চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিল শূণ্য।
“স্যার এক মিনিট!একটু বসেন,আমি আসছি”
বলে তড়িত গতিতে দরজা দিয়ে ছুটল নাবা।
কিছু না বুঝতে পেরে নুমার দিকে তাকালো শূণ্য।ও মুচকি মুচকি হাসছে।
অল্প কিছুক্ষণ পর একটা ট্রে হাতে রুমে প্রবেশ করল নাবা।ট্রেটা টেবিলের উপর রেখে সেটা থেকে সেমাইয়ের একটা পিরিচ বাড়িয়ে ধরল শূণ্যর দিকে।
সেমাইয়ের পিরিচ থেকে এক চামচ মুখে দিয়েই মুখ সামান্য বিকৃত হয়ে গেল ওর।চিনির জায়গায় লবণ দিয়ে তৈরী করা হয়েছে সেমাই।
নাবা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।পেছনে হাসতে হাসতে কুটিকুটি হয়ে যাচ্ছে নুমা।
শূণ্য কোনরকমে মুখের সেমাইটুকু গিলে উঠে দাড়ালো।নাবা জিজ্ঞেস করল:স্যার কেমন হয়েছে?
– খুব,খুউব …….. আমার জীবনে আমি এমন সেমাই জীবনে খাই নি।”মুখে জোর করে হাসি টেনে আনল শূণ্য।তারপর প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে আসল।
.
“স্যার দাড়ান দাড়ান!”
মেজাজটা খিচড়ে গেল শূণ্যের।রাগে পায়ের উপর চাপ বাড়লো ওর।
“স্যার কি রাগ করলেন?” পাশে এসে হাপাতে লাগল নুমা।
জবাব না দিয়ে হাটার গতি বাড়ালো ও।
“কাজটা আমার ছিল স্যার!সরি”
কথাটা বলে শূণ্যের পথরোধ করে দাড়ালো ও।
শূণ্য থেমে গেল।এ জন্যই তখন হাসছিল ও।
– এমন করলে কেন?”অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে একরাশ জিজ্ঞাস করলো শূণ্য।
– তার আগে আপনার জন্য একটা জিনিস আছে।সেটা নেয়ার জন্য আপনার চোখ বন্ধ করতে হবে।
– কি জিনিস?
– আগে আমার দিকে তাকান।”
শূণ্য নুমার দিকে তাকালো।
– এবার চোখ বন্ধ করুন।প্লিজ”
শূণ্য চোখ বন্ধ করল।নুমা ওর চোখ থেকে চশমাটা খুলে আবার পড়িয়ে দিল।
– এবার চোখ খুলুন।
শূণ্য চোখ খুলে সব অস্পষ্ট দেখতে পেল।চশমাটা হাতে নিয়ে দেখল:নতুন ফ্রেম।গ্লাসে পাওয়ার না থাকায় অস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল।
নুমা হেসে পুরাতন চশমাটা ওর দিকে বাড়িয়ে ধরল।চশমাটা হাতে নিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো শূণ্য।
“সেদিন আপনার চশমাটা ক্ষতিগ্রস্ত করলাম,তারপর চিন্তা করছিলাম ক্ষতিপূরণ দেয়া দরকার।কিন্তু আদৌ আপনার সাক্ষাত পাবো কি না জানতাম না।
যেদিন প্রথম পড়াতে আসলেন,তার পরদিন চশমাটা আপনাকে দেয়ার জন্য কিনে ফেললাম।কিন্তু কি করে দিব তাই বুঝতে পারছিলাম না।আজ যখন নাবা সেমাই রান্না করার সময় হেল্প চাইল,প্ল্যান করে লবণের জায়গায় চিনি দিলাম,যেন আপনাকে রাগিয়ে তারপর দিতে পারি।আপনার রাগটাও চলে যাবে,আমার কাজটাও হয়ে যাবে”
শূণ্য কথাগুলো শুনে অনুভব করল ওর ভেতরে রাগ কিংবা জেদের বিন্দুও অবশিষ্ট নেই।
“স্যার আমি তাহলে আসি”
মাথা নেড়ে নুমাকে সায় জানিয়ে নিজের পথ ধরলো ও।
.

.
এভাবে নুমার প্রেমে পড়ে যাবে ভাবতেও পারে নি শূণ্য।সেমাইয়ের ঘটনাটা মনে পড়ায় হেসে ফেলল আনমনে।অদ্ভূত ক্যারেক্টর!দেখতে যেমন শান্তশিষ্ট,ভেতর ভেতর তার চেয়েও দূরন্ত।
“সকাল সকাল রওনা হতে হবে” নিজেকে চিন্তামুক্ত করার জন্য বুঝ দিল ও।
.
বাড়িতে পৌছে খেয়েদেয়ে সন্ধায় মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল শূণ্য।ফেরার পথে মাকে ছোট বাচ্চাদের মত বোঝাতে শুরু করল:
– ডাক্তার যেভাবে বলেছে,সেভাবে নিয়মিত ঔষধগুলো খাবা।কোন ধরণের এদিক-সেদিক যেন না হয়।ভারি কিছু উঠানোর দরকার নেই।উবু হবা না একেবারেই।মনে থাকবে তো?”
মা শুধু মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলেন।
.
” আব্বা তুমি আজকেই চলে যাইবা?”
ব্যাগ গুছানো বাদ দিয়ে মায়ের দিকে ফিরল ও।মায়ের চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করছে।
“কাল ভার্সিটির ক্লাস আছে।এরপর বিকেলে কোচিং,সন্ধা আর রাতে দুইটা প্রাইভেট।তারপরও তুমি বললে থেকে যাই”
মা মাথা নীচু করে শুধু “ও” উচ্চারণ করলেন।উনি যে চোখের পানি লুকাতে চাইছেন তা বুঝতে আর ওর বাকি রইল না।নিজের একমাত্র নাড়িছেঁড়া ধনকে এতদিন পরপর মাত্র দু’একদিন দেখে কোন মায়েরই বা চোখ তৃপ্ত হয়?
শুণ্য ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে মায়ের সামনে দাড়ায়।নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রেখে কানেকানে বলে: আর মাত্র কয়েকটা দিন।তারপর তোমাকে আমার সাথে নিয়ে যাবো।তোমার জন্য একটা মিষ্টি বউ আনবো,আমি বাইরে থাকবো আর তোমরা সারাদিন মনভরে কথা বলবে।রাতে ফিরলে নিজ হাতে আমাকে খাইয়ে দিবা”
– হইছে,আর বলতে হবে না”
মায়ের বিষন্ন ভাবটা কেটে উঠে ছেলের কথায়।মুখ ভরে উঠে নির্মল হাসিতে।
শেষ দেখাটা যে এত অল্প সময়ের জন্য হবে,কল্পনায়ও ভাবতে পারে নি শূণ্য।পরদিন রাতেই মায়ের মৃত্যু সংবাদ আসে ফোনে।
.
ভোরের আলোয় চিন্তাচ্ছেদ হল শূণ্যের। একমাত্র আশ্রয় হারিয়ে ফেলা মানুষটা জানে,আরেকটা আশ্রয় খুজে নেয়া কতটুকু কঠিন।
“আজ নুমাকে সব বলে দিতে হবে”
নিজেকে নিজে জানান দেয় যেন।মনের কোণে হারিয়ে ফেলা আশ্রয়ের দুঃখ ভোলানোর একটা আলোর ছটা দেখতে পেল ও।
.
“স্যার আপনার বেতনটা”
একটা খাম ওর সামনে রেখে বসে নাবা।নুমা আগে থেকেই বসে আছে।
“আমি আর পড়াবো না তোমাদের।এই কয়দিনে আমার সাথে অনেক কিছু ঘটে গেছে,তাই আসতে পারি নি।ঠিকমত পড়াশোনা করে নিজেদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলো”
কথাগুলো শেষ হতেই অদূরে কোথাও বাজ পড়লো যেন।
“কিন্তু কেন স্যার?সমস্যা কি?”না বা প্রায় কাঁদো কাঁদো স্বরে জিজ্ঞাস করলো।
“সব কেন এর জবাব হয় না,সব সমস্যা সবাইকে বলা যায় না।তুমি যথেষ্ট বড়,বুঝতে পারার কথা তোমার।নুমা,তুমি একটু নীচে এসো”
খামটা হাতে নিয়ে উঠে দাড়ালো শূণ্য।নাবা নীচ দিকে তাকিয়ে আছে।পরিস্থিতি ভারি হচ্ছে দেখে পা বাড়ালো ও।
বাইরে এসে টের পেল বৃষ্টি হচ্ছে।নুমা ছাতা হাতে ওর পেছনে দাড়ালো।
.
“দেখুন স্যার!আপনি ভালো মানুষ,আমি আপনার ফিলিংসকে সম্মান করি।এমন না যে আমিও কোন ফিলিংস করি না,বাট নাবা আপনাকে অনেক ভালোবাসে।নইলে যে মেয়ে চিনি আর লবণের দানার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না,সে কেন আপনার জন্য সেমাই রান্না করতে যাবে,বলতে পারেন?ও আমার বোন।আর বোন হিসেবে আমি কখনো আপনার হাত ধরে ওকে কষ্ট দিতে পারবো না”
শূণ্য নুমার দিকে তাকালো,কথাগুলো মুখের না মনের তা যাচাই করার জন্য।
নুমার চোখের পাড় ভেঙে নোনা পানি গাল বেয়ে পড়ছে।
শূণ্য নিজেকে ছাতার নীচ থেকে বৃষ্টির ফোটায় বের করে আনলো।উত্তর পেয়ে গেছে ও।
.

.
রুমে ঢুকে ভেজা শরীর নিয়ে থপ করে বিছানার উপর বসে পড়ল ও।আমীন মনিটর থেকে চোখ ফেরালো: ভাই সব ঠিক আছে তো,নাকি?
– তোমার মামার প্রপোজালটা এখনো আছে?
– কি হয়েছে ভাই?
আমীন পাশে এসে বসল।শূণ্য ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল:থাকলে আমি প্রস্তুত আছি।একটু খোজ নিয়ে জানাও।
.
বিছানার উপর শোয়া থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠে বসল শূণ্য।গা বিছানা ঘামে ভিজে চপচপ করছে।কতক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে নিজেকে স্থির করে নেয়ার কোন প্রয়োজনবোধ করল না আর,কারন ভালো করেই জানে প্রতিরাতের মত আজও দুঃস্বপ্ন দেখছিল ও।
জানালা দিয়ে দেখল ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।গেঞ্জিটা গায়ে গলিয়ে দিয়ে বেড়িয়ে পড়ল।
.
সমুদ্রের পাড়ে ঠান্ডা বালির উপর বসে আছে শূণ্য।ছোটছোট ঢেউগুলো মৃদুভাবে আছড়ে পড়ছে সেদিকে বাড়িয়ে রাখা পা দুটোর উপর।
আমীনের মামার প্রপোজালটা বাকি থাকায় সেন্টমার্টিনে চলে এসেছে ও,বাংলাদেশের সর্বশেষ প্রান্তের সবুজ বিন্দুতে।রোজ এভাবে ভোরে ঘুম ভাঙার পর এই জায়গাতেই বসে থেকে নিজেকে ভূলে থাকতে চায় ও।
সমুদ্রের বুক চিড়ে মাথা বের করছে দিনের সূর্য।সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ও।পৃথিবীর সূর্যটা তো প্রতিদিন উদয়ের সাথে অস্তমিতও হয়,কিন্তু ওর মনের আকাশে উদিত হওয়া বিষন্নতার সূর্যটা কি অস্তমিত হবে আদৌ?হলে কবে? তা ও নিজেও বলতে পারে না।