ছোট গল্পঃ লজিং মাস্টার

সাহিত্য

লজিং মাস্টার
মারুফ হোসাইন

১.
দিঘির পানি পরিষ্কার হলেও কালো কালো মনে হয়। কিন্তু এই দিঘির পানি কালো কালো না, সবুজ সবুজ। বাড়ির শেষ ভাগে দিঘির শুরু। দিঘির নাম ছোট দিঘি হলেও আকারে মোটেও ছোট না। পাড়ে দুটো তাল গাছের জোড়া হয়ে আসনের মত হয়ে গেছে। অয়ন বিকেল বেলাটা এখানে বসেই কাটিয়ে দেয়। দিঘির ছোট ছোট ঢেউয়ের সাথে মিশে শীতল বাতাস অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি করে। পাড়ে বসেই তাকে অনেক অনেকদূর নিয়ে যায়। যেখানে মানুষ বাস্তবে যেতে পারে না। যেতে পারলেও তার পক্ষে যাওয়া সম্ভব না।
অয়ন এখানে লজিং মাস্টার হয়ে এসেছে। গ্রামে এখন লজিং মাস্টারের চল নেই। এক সময় খুব ছিল। লজিং মাস্টারদের জন্য বাড়ির একটু দূরে আলাদা ঘর করা থাকতো। কাচারি ঘর। বাড়ির ছেলে মেয়েরা এসে পড়ে যেত। অয়নের বড় মামার সাথে করিম মোল্লার সুসম্পর্ক থাকায় সে মাস্টারির দায়িত্বটা পেয়ে গেছে। বাড়ির উত্তর দিকের দিঘির পাশের ছোট ঘরটায় থাকবে, একদিন একঘরে খবে, বিনিময়ে তাদের ছেলে-মেয়েদের পড়াবে। পড়ার মধ্যে এখন শুভ আর রায়হান পড়ে। ওরা সকাল সন্ধ্যা এসে পড়ে যায়। আর রাসেল নামের ছেলেটা মাঝে মাঝে পড়তে আসে। লজিং মাস্টারদের সেবা করার দায়িত্ব পড়ে যায়, যার পরিবার গরিব থাকে।
রাসেল তার দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালন করে যাচ্ছে। অয়ন তার উপর সন্তুষ্ট। কিছুটা অবাকও। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তার কাজকর্ম দেখে। কিছু কিছু মানুষের মধ্যে জন্মগত আভিজাত্য থাকে। দেখলেই মনে হয় অভিজাত কেউ। রাসেলকে দেখলে সেরকম কেউ মনে হয়। কৈশোরের চঞ্চলতা ছাপিয়ে একধরণের গম্ভীরতা দেখা দিয়েছে। বছর খানিক আগে তার মা মারা যায়, তার কিছুদিন পরই বাবা পাগল হয়ে গেছে। তার ছোট চাচা পায়ে শিকল লাগিয়ে উঠনের এক পাশে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। তার পর থেকে সে নানা নানীর কাছে পড়ে আছে। অভাবে থাকা ছেলেদের কৈশোরের চঞ্চলতা মানায় না। অয়ন রাসেলের দিকে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে রাসেল নিজেই জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, কিছু বলবেন?’
‘নাস্তা করেছিস? মুখ এমন শুকনো লাগছে কেন?’
রাসেল নিচু গলায় বলল, ‘না স্যার।’
‘রাতে খেয়েছিস?’
‘না।’
‘কেন?’
‘মামা মামী ঝগড়া করছে।’
‘তোকে নিয়ে?’
রাসেল জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করে রাখলো। অয়ন আর কথা না বাড়িয়ে নাস্তার প্লেটে নাস্তা দুভাগ করে বলল, ‘তাড়াতাড়ি করে নে, আমরা দুজনেই এক।’
২.
অয়ন করিম মোল্লার সামনে বসে আছে। করিম মোল্লা তাকে জরুরী খবর দিয়ে আনিয়েছেন। করিম মোল্লা একবার দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবভঙ্গী ছাড়াই কথা শুরু করলেন।
মাস্টার, আছো কেমন?
‘জি ভাল।’
‘তোমার ছাত্রদের খবর কি?’
‘জি ভাল’।
‘শুনো মাস্টার, রায়হান কে আলাদা নজর দিবা। সবার চেয়ে তার রেজাল্ট ভাল হওয়া চাই’।
অয়ন মাথা নিচু করে বলল, ‘জি আচ্ছা।’
করিম মোল্লা এবার একটু গলা নামিয়ে বললেন, ‘সে না পারলে তুমি কি খাওয়াই দিবা? তাইলে তো সব ভাল মাস্টারের ছাত্র ভাল হয়ে যেত। ঠিক বলছি কিনা বল?’
‘জি।’
‘ঘরের মহিলাদের জন্য অপছন্দের অনেক কিছু করতে হয়। তাই তোমাকে ডাকালাম। তোমার ভক্তি শ্রদ্ধা ভাল। অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ। আমাকে অতি ভক্তি করবা না। পছন্দ না।’
‘জি আচ্ছা। আমি এখন যাই?’
‘যাও। সাবধানে থেকো। কান কথায় তোমার নামে অনেক কথা শোনা যাচ্ছে।’
অয়ন লক্ষ করছে, এই বাড়িতে আসার পর থেকেই করিম মোল্লা বিভিন্ন সময় তাকে ডেকে পাঠায়। মাঝে মধ্যে ভাল খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও থাকে। সব কথার মূল কথা থাকে রায়হানের রেজাল্ট যেন সবার চেয়ে ভাল হয়। তা যে করিম মোল্লা নিজের ইচ্ছায় করছেন না, তা উনার কথা শুনলেই বুঝা যায়। বাড়ির মহিলাদের ধারণা মাস্টারের সাথে ভাল খাতির থাকলেই বুঝি ছেলের রেজাল্ট ভাল হবে।
করিম মোল্লার ঘরে থাকতে অয়নের জেদ লাগেনি। এখন লাগছে। সে ক্রমাগত পানি খাচ্ছে। কিছু ফেলে ভাঙ্গতে পারলে জেদ কিছুটা কমার সম্ভবনা ছিল। এমনটা প্রচলিত আছে। অয়ন রায়হান কে পড়া জিজ্ঞেস করল। পড়া না পারায় তার রাগ আরো বেড়ে গেল। তা গিয়ে পড়ল রাসেলের গাড়ে। রাজপুত্রদের শাস্তি দেওয়ার বিধান নেই।
৩.
তালগাছের আসনটায় বসলে অয়নের মন খারাপ থাকলেও ভাল হয়ে যায়। আজ হচ্ছে না। অস্বস্তি লাগছে। বিনা দোষে ছেলেটাকে এভাবে পিটানো ঠিক হয় নি। গাছের ঢালে মাছরাঙ্গা পাখিটা ঠায় দৃষ্টিতে পানির দিকে তাকিয়ে আছে। মাছ দেখা গেলেই ঝাঁপ দিবে। যতক্ষণ দেখা যাবে না, ততক্ষণ অপেক্ষা করতে তার কোন সমস্য নেই। মানুষের অত ধৈর্য নেই। মুহূর্তেই সব পেতে চায়।
‘মাস্টার এভাবে তাকিয়ে কি দেখে?’
অয়ন একবার তাকিয়ে দেখে চোখ ফিরিয়ে নিল। শশী নামের এই মেয়েটা ভারি অদ্ভুত। এ বাড়িতে আসার পর থেকেই তার পিছু নিয়ে আছে। সে ভালোই জানে অয়নকে কোথাও না পাওয়া গেলেও বিকেল বেলাটায় দীঘির পাড়ে পাওয়া যাবে। মানুষ নিজেকে অদ্ভুত ভাবে সাজাতে পছন্দ করে। ভিন্ন রঙ্গে, ভিন্ন ঢঙ্গে। কারো সাথে কারো মিলে না। তবুও পাশের মানুষটা চায় তার সাথে মিলিয়ে নিতে। চুপ করে থাকতে দেখে নিজেই জিজ্ঞেস করলো।
‘মন খারাপ?’
অয়ন নিচু গলায় জবাব দিল, ‘না’।
শশী একটু দূরে খালি জায়গাটায় বসে মৃদু হেসে আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘আপনি সিগারেট খান?’
অয়ন ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
শশী হেসে বলল, ‘সিগারেট খেলে নাকি চিন্তা কমে যায়। আপনি প্রতিদিন বিকালে বসে যা চিন্তা করেন তা সিগারেট কমিয়ে দিলে ক্ষতি কি?’
অয়ন জবাব না দিয়ে মাছরাঙ্গা পাখিটার দিকে তাকিয়ে থাকলো।
শশী কিছুক্ষণ সে দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বলে উঠল, ‘ছেলেরা চাইলেও সহজে খারাপ হতে পারে না। মেয়েদের খারাপ হতে তেমন কিছু করতে হয় না।’
অয়ন চোখে প্রশ্ন নিয়ে ফিরে তাকাল। শশী হেসে বলল, ‘একটা ছেলে সিগারেট খেলে লোকে বলবে ছেলেরা একটু আদটু এসব করে। মেয়েরা করলে? আমাকে এখানে আপনার সাথে বসে থাকতে দেখলেই আমি খারাপ হয়ে যাব। আপনিও হবেন। কারণ আপনিও আমার মত পরের উপর অধীন। মানে পরাধীন। পরাধীনদের চাওয়া পাওয়া হবে মনিবদের চাওয়া পাওয়া।’
অয়ন ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আচ্ছা এই দিঘিটার নাম ছোট দিঘি কেন?’
‘জানিনা। তবে এই গ্রামে আর কোন বড় দিঘি নেই। এই দিঘিতে মানুষ গোসল করেনা। এখানে এক লোকের তিন ছেলে মারা গেছে। তিনি একটা ছেলের আশায় সাতটা মেয়ে জন্ম দিয়েছেন। পরপর তিনটা ছেলে এই দিঘিতে পড়ে মরার পর কেউ একজন স্বপ্নে দেখল এখানে গোসল করা যাবেনা। লোকটা কে জানেন?’
অয়ন বলল, ‘কে?’
‘আমার বাবা।’
বড় বড় মায়াবী চোখের মেয়েটাকে এই মুহূর্তে ঠিক কি বলা যায় আয়ন খুঁজে পেল না। মলিন গলায় বলল, ‘পড়ালেখা ছাড়লে কেন?’
শশী হেসে বলল ‘সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে বাবা মায়ের চিন্তা থাকে না। আমার প্রতি অনেকের আগ্রহ, চেয়ারম্যানের ছেলের আগ্রহ সব চেয়ে বেশি। আমার বাবা তাতে অনেক খুশী। বিদায় করতে পারলেই বাঁচে। আমার কারো প্রতি আগ্রহ হয় না। আপনার প্রতি হয়। অথচ আপনার আগ্রহ হওয়ার মত কোন গুণই নেই। আচ্ছা এমন কেন হয় বলতে পারেন?’
অয়ন জবাব না দিয়ে একটু নড়ে বসল।
শশী হেসে উঠল। হা হা করে হাসি। খুব কম মেয়েই হা হা করে হাসে। মেয়েরা মেপে মেপে হাসতে পছন্দ করে। তাদের সব কিছুই হবে মেপে মেপে।
অয়ন বলল, ‘শুনেছি চেয়ারম্যানের ছেলেটা ভাল না?’
‘সব মানুষেরই সমস্যা থাকে। পুরোপুরি ভাল মানুষ হয় মহাপুরুষরা। পৃথিবীতে কয় জন মহাপুরুষ হয় বলেন। রবিন হোড বইটা পরছেন?’
‘হুম।’
‘মনে আছে, রবিন হোড জমিদার থেকে ডাকাতি করে গরিবদের দান করত। গরিব দের কাছে মহৎ হলেও জমিদারদের কাছে কিন্তু ডাকাতই ছিল। আচ্ছা, লিটল ম্যানের কবর নাকি পাওয়া গেছে জানেন? চেয়ারম্যানের ছেলের সাথে বিয়ে হলে তাকে বলব ওখানে নিয়ে যেতে।’
অয়ন জবাব না দিয়ে উঠে দাঁড়াল। শশী স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কিছু বুঝার চেষ্টা করছে। অয়নকে অবাক করে দিয়ে বলল, ‘আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবেন?’
অয়ন একবার ফিরে তাকিয়ে জবাব না দিয়ে হাঁটা শুরু করল।
৪.
অয়ন অপেক্ষা করে বসে আছে। রাসেল পড়তে আসেনি। তার খুঁতখুঁত লাগছে। ডেকে আনবে কিনা বুঝে উঠতে পারছে না। তবে এটুক বুঝা যাচ্ছে রাসেলকে না দেখলে তার অস্বস্তি লাগা দূর হবে না। মায়া জিনিসটা অদ্ভুত। কখন কার উপর মায়া পড়ে যায় বলা মুশকিল। কাউকে দেখে মায়া লাগে, কাউকে বুঝে মায়া লাগে, কাউকে কষ্ট দিয়েও মায়া লাগে।
‘নিজে খেতে পারেনা, ঘরে এতিমখানা খুলে বসছে’। রাসেল ঘরের এককোণে বসে মামীর কথা গুলো শুনে যাচ্ছে। মামা মামী আবার ঝগড়া শুরু করে দিয়েছে। সে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবে, এই মামীই দুই বছর আগে বেড়াতে আসলে তাকে কোলে বসিয়ে খাইয়ে দিত! এখন চোখের সামনে পড়লেই সহ্য করতে পারে না। তার পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। অনেক দূরে কোথাও। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া বালকের যে পালিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই, সে বুঝ তার হয়ে গেছে। পৃথিবী তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন জনের কাছে জীবনের মানে বিভিন্ন। কারো কাছে আশ্রয় খুঁজে পাওয়া। কারো কাছে একটু মমতা। কারো কাছে দুমুঠো ভাত, একটু থাকার জায়গা। কারো কাছে বিলাসিতা। রাসেল জীবনের মানে খোঁজা ঠিক শিখে উঠতে পারেনি। কিন্তু সে কিছু খোঁজে। সেটা কি?
রাসেল মাথা নিচু করে অয়নের সামনে বসে আছে। শুভ তাকে ডেকে এনেছে। অয়ন রাসেলের হাত ধরে কাছে টেনে নিলো।
‘খেয়েছিস?’
‘না।’
‘তুই কি প্রতিদিন রাতেই না খেয়ে থাকিস?’
রাসেল চুপ করে মাথা নিচু করে থাকল। আয়ন তাকে আরেকটু কাছে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘গতকাল করিম মোল্লার কথা শুনে রাগ ধরে রাখতে পারিনি। বেশি লেগেছে?’
রাসেলের চোখ থেকে টুপটুপ পানি পড়ছে। আয়ন ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। আঘাত যার চোখের বরফ গলাতে পারেনি। একটুখানি হাতের স্পর্শ তা গলিয়ে ফেলেছে। বেদনা তাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে। না পাওয়া তাকে অনেক কিছু পাইয়ে দিয়েছে।
৫.
শশী বাজারে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। মায়ের উপর প্রচণ্ড রাগ লাগছে। এই মহিলাকে সিনেমার কাজে পাঠিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। এত কিভাবে সব দেখেও না দেখার অভিনয় করতে পারে। স্বামীর সব কথাতেই হ্যাঁ বলতে হবে। বাবা যদি বলে ‘আজ গরুটাকে জবাই করে দিব, অনেক দিন গরুর মাংস খাই না।’ মা বলবে, ‘হুম এই গরু কোন কাজের না।’ এমনও না যে বাবার সব কথাই তার পছন্দ মত হয়। বাবাকে খুশি করতেই সব কিছুতে হ্যাঁ বলেন। রাস্তায় চেয়ারম্যানের ছেলে ফরিদের সাথে দেখা। ফরিদ যথারীতি হেসে জিজ্ঞেস করল ‘কেমন আছো।’
শশী দূর থেকেই আড়চোখে দেখে মাথা নিচু করে হেঁটে আসছিল। ছেলেটাকে আজ অন্য দিনের চেয়ে সুন্দর লাগছে। মাথার মেয়েদের মত চুল না থাকলে আরেকটু ভাল লাগতো। শশীর যদি হুট করে বলে, ‘এই ছেলে, যাও মেয়েদের মত চুল ফেলে চেলেদের মত করে চুল কেটে আসো।’ ছেলেটার চেহারা কেমন হবে ভাবতেই তার হাসি পেয়ে গেল।
শশী হেসে বলল, ‘ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন ফরিদ ভাই।’
ফরিদ তৎক্ষণাৎ কিছু বলতে পারলো না। এত মিষ্টি করে মেয়েটা কিভাবে হাসে তা ভেবেই সে স্তব্দ হয়ে থাকল।
ফরিদকে চুপ করে থাকতে দেখে শশী বলল, ‘কি ব্যাপার, চুপ করে আছেন কেন? ভার্সিটিতে যান নাই? মিরাজ ভাইকে দেখলাম ক্লাস করে বাড়ি যাচ্ছে। কি একটা চাকরিও করে শুনলাম।’
ফরিদের লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছি বলতে ইচ্ছে করছে না। অন্তত এই মুহূর্তে মেয়েটাকে বলার জন্য আবার ভার্সিটিতে যেতে ইচ্ছে করছে। ফরিদ কি বলবে খুঁজে পাচ্ছে না।
‘তোমার কি দেরি হয়ে যাচ্ছে?’
শশী হেসে বলল, ‘হচ্ছে, তবে আপনার কথা শেষ হলে যাব। আপনাকে সরে দাঁড়াতে হবে। আপনার শরীর থেকে সিগারেটের গন্ধ আসছে। সিগারেটের গন্ধ আমার সহ্য হয় না।’
ফরিদ একটু সরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘যাও, পরে কথা হবে।’
শশীর এখন আর মন খারাপ লাগছে না। এমন ক্ষমতাবান একজন মানুষ তার সামনে আসলে টিকটিকির মত টিকটিক করা শুরু করে এটা তার ভাল লাগে। শশী মুখ চেপে হেসে চলে গেল।
ফরিদের কিছুক্ষণ আগে ভাল থাকা মনটা হুট করে খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটা এভাবে হেসে হেসে তাকে কষ্ট দিয়ে কথা বলে। সে বুঝতে পারে শশী ইচ্ছে করে এমন করে। সে বাম পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট হাতে নিল। মন খারাপ থাকলে একটার পর একটা সিগারেট ধরাতে থাকে। আজ অদ্ভুত করণে সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা করছে না।
৬.
চেয়ারম্যান রহমান মোল্লা দরজা লাগিয়ে চুপ করে বসে আছেন। আজ তার মন খুব বেশি খারাপ। ‘আলেমের ঘরে জালেম হয়’ কথাটা সত্যি না। রহমান অর্থ দয়ালু। তার মনে দয়া আছে। তার বাবার মনেও ছিল। সে সুত্রে তার ছেলের মনেও থাকার কথা। ছোট থাকতে নিজে ডেকে মানুষকে সাহায্য করতো। সে ছেলের নিজের বাবার জন্য দয়া থাকবে না, তা অসম্ভব। তিনি ছেলেকে শিক্ষা দিতে চান। এভাবে চলতে দেওয়া যায়না। যদি সত্যিই ছেলের মনে তার জন্য দয়া না থাকে তাহলে তিনি ফাঁসিতে ঝুলে পড়বেন। রহমান মোল্লা হাত দিয়ে পাশে গোল করে রাখা দড়িটি ছুঁয়ে দেখলেন। তার চোখে বারবার পানি চলে আসছে। বন্ধ ঘরে কেউ দেখতে পারছে না। তিনি পানি না মুছে ছেলের ছোট বেলার একটা ছবির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। আল্লাহ্‌ তাকে অনেক দিন পর একটা ছেলে দিয়েছে। খুশিতে তিনি একশ রাকাত নফল নামাজ পড়বেন নিয়ত করেছেন। পরবর্তীতে কত রাকাত পড়েছেন ভুলে গেছেন। তাই প্রতিদিন ছেলের জন্য চার রাকাত নফল নামাজ পড়েন। সে ছেলের জন্য প্রতিদিন মানুষ নালিশ করে যায়। এবার এর একটা বিহিত করেই ছাড়বেন।
রাসেলের মামা-মামীর ঝগড়া এখনো বন্ধ হয়নি। ফরিদ সঙ্গে তাদের দারোয়ানকে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রাসেলের মামা বশীর নাম করা কাঠমিস্ত্রি। তিনি দরজা খুলেই চেয়ারম্যানের ছেলেকে দেখে ঘাবড়ে গেলেন। চেয়ারম্যানর ছেলে নিজে এসেছে নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। ফরিদ কাঁদো কাঁদো গলায় ঘটনা খুলে বলল।
দরজার তালা ভাঙ্গা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। চেয়ারম্যান সাহেব নিজে থেকে সেগুন কাঠের দরজার কাজ করিয়েছেন। রহমান মোল্লা এর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি সিলিং ফেনের সাথে ফাঁসির দড়ি ঝুলিয়ে দিলেন। তিনি এক দৃষ্টিতে গোল হয়ে ঝুলে থাকা দড়িটার দিকে তাকিয়ে আছেন। মনে হচ্ছে তিনি সত্যিই ফাঁস নিচ্ছেন। তার বারবার তার বাবার কথা মনে পড়ছে। তিনি দাঁড়িয়ে থেকেই নিয়ত করলেন আজ থেকে আট রাকাত নফল নামাজ পড়বেন। চার রাকাত ছেলের জন্য, চার রাকাত বাবার জন্য।
ফরিদ বাবার কোলে মাথা রেখে মেঝেতে বসে আছে। তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। তার মনে হচ্ছে আরেকটু দেরি হলেই তার বাবা ফাঁসিতে ঝুলে পড়ত। বাবা-ছেলে দুজনের চোখ থেকেই টুপটুপ করে পানি পড়ছে। এমন আনন্দের দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য সবার হয় না। রহমান মোল্লার স্ত্রী আমেনা বেগম দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বাপ-ছেলের কান্না দেখে নিজেও আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে নিচ্ছেন।
৭.
চেয়ারম্যান রহমান মোল্লা তার তিন কামরার অফিস রুমে চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে আছেন। শশী নামের মেয়েটার যাবতীয় খোঁজখবর নেওয়ার জন্য দুই জনকে নিয়োগ দিয়েছেন। তবু এদের উপর বিশ্বাস করা যায় না। তিনি নিজেও অন্য ভাবে খোঁজের ব্যবস্থা করেছেন। দুইয়ে দুইয়ে চার মিললেই হয়ে গেল। যতদূর খবর পেয়েছেন মেয়ে তার ছেলেকে তীরের মত সোজা করে রাখতে পারবে। স্বামী ভীরু মেয়ে সংসারের জন্য মঙ্গল। কিন্তু তার ছেলের জন্য এমন মেয়েই দরকার। মেয়ের বাবার কিছু সমস্যা আছে। এটা একটা সমস্যা। বাবা মায়ের প্রভাব ছেলে মেয়ের উপর পড়ে। তার বাবার প্রভাব তার উপর পড়েছে। একশতে একশ পাওয়া মুশকিল। কিছু কিছু ছেড়ে দিতে হয়। এটা ছেড়ে দেওয়া যায়। চেয়ারম্যান রহমান মোল্লা স্বস্তি বোধ করছেন। বেশির ভাগ মানুষই ছেড়ে দিতে পারেনা। নিজের ষোলআনা মিলাতে চায়। তিনি ছেড়ে দিতে পারছেন এটা স্বস্তির পাওয়ার মতই কথা।
শশীর বাবা হাসিহাসি মুখে চেয়ারম্যানের অফিস থেকে বের হলেন। মেয়েকে নিয়ে অয়ন মাস্টারের সাথে বিভিন্ন কথা রটে গেছে। মানুষ ক কে কলা বানাতে পছন্দ করে। এসময় এমন একটা প্রস্তাব নিঃসন্দেহে খুশির খবর। মেয়েকে মানানো গেলেই আর কোন ঝামেলা নেই। মেয়েকে তিনি যমের মত ভয় পান। এটা দুশ্চিন্তার কথা। তিনি হাঁটতে হাঁটতেই বুদ্ধি করে ফেললেন। আগে তার স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলতে হবে। মায়ের কথা মেয়ে ফেলতে পারবেনা। নিজের বুদ্ধিতে নিজেই মুগ্ধ হলেন।
৮.
শশী দিঘির পাড়ে বসে আছে। তার মন খারাপ লাগছে। ছেলেটা কি আসলেই নির্লিপ্ত? নাকি নির্লিপ্ত হওয়ার অভিনয় করে। নিজেই ভেবে অবাক হচ্ছে ফরিদ নামের মানুষটা তাকে এত পছন্দ করে অথচ তার সমগ্র ইন্দ্রিয় অনুভূতিহীন একজন মানুষকে অনুভব করে। অয়ন পায়ের দিকে তাকিয়ে ধীর পায়ে দীঘির দিকে হেঁটে আসছে। গতকাল শশী অনেকক্ষণ বসে ছিল অয়ন আসেনি। অয়ন বিকেলে এখানে এসে বসবেনা তা ভাবা যায় না। সে জন্য শশীর তার উপর রাগ হওয়ার কথা তবু রাগ হচ্ছেনা। শশী একদৃষ্টিতে অয়নের হেঁটে আসার দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষটাকে দেখলেই তার কেমন মায়া লাগে। সৃষ্টিকর্তা ছেলেটাকে অনেকখানি মায়া দিয়ে পাঠিয়েছে।
অয়ন তার তাল গাছের আসনটায় বসল। শশী কখনো জায়গাটায় বসে না। সে বসে তার পাশের গাছের গুঁড়িটায়।
শশী মুখে রাগ ভাব নিয়ে বলল, ‘কাল আসেন নি কেন?’
অয়ন উত্তর না দিয়ে বলল, ‘তুমি কি প্রতিদিন আমি আসি কিনা দেখে যাও?’
‘আমি আসলে কি আপনার সমস্যা হয়?’
অয়ন জবাব দিল না। চুপ করে দিঘির দিকে তাকিয়ে থাকল।
শশী নিচু গলায় বলল, ‘আপনার সমস্যা হলে আর আসবো না।’
অয়ন এবারো জবাব দিল না।
শশীর এখন কষ্ট লাগছে। তার কষ্ট লাগলেই চোখে পানি চলে আসে। চোখের পানি অয়নকে দেখতে দেওয়া যায় না। চুপ করে দিঘির দিকে তাকিয়ে থাকল। নিজেকে গুছিয়ে নিতে সময় দেওয়া দরকার। কিছুক্ষণ পর হেসে বলল, ‘গতকাল ফরিদ ভাইয়ের সাথে দেখা হল। তাকে বললাম চুল কেটে ফেলতে। চুল কাটলে আপনাকে সুন্দর লাগবে।’
আয়ন একবার শশীর দিকে তাকিয়ে আবার দিঘির দিকে তাকিয়ে থাকল।
‘আপনি কি কোন কারণে আমার উপর রেগে আছেন?’
‘নাতো।’
‘সব সময় এমন মন খারপ করে থাকেন কেন? আপনার কি মন খারাপের রোগ আছে? আমার পরিচিত একজন মন খারাপের ডাক্তার আছে। আপনি বললে নিয়ে যেতে পারি।’
শশীর বলার ভঙ্গি দেখে আয়ন হেসে দিল।
শশী উৎসাহিত হয়ে ছোট বাচ্চার মত মাথা নিচু করে বলল, ‘দেখি দেখি, আপনার হাসি দেখি। অমাবস্যার চাঁদ।’
অয়ন মিটিমিটি হাসছে। তার মনে হচ্ছে, সত্যিই কিছুকিছু মানুষের একটু খানি স্পর্শ জীবনের অনেকখানি পূর্ণতা পাইয়ে দিতে পারে।
৯.
করিম মোল্লা গম্ভীর মুখে বসে আছেন। সামনে বসে থাকা দুজন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার হাবভাব বুঝার চেষ্টা করেছে। গ্রাম অঞ্চলে কিছু মানুষ থাকে যাদের প্রধান কাজ, কার বাড়িয়ে কি হয়েছে তার খোঁজ রাখা। সালিসে তারা বিচারকের চামচা হয়ে কাজ করলেও হাবভাব এমন থাকে যেন তারাই বিচারক। করিম মোল্লা মুখ খুললেন। ‘আমার বাড়িতে বসে ইটিস পিটিস করবে। তা চলবে না। তবে প্রমাণ ছাড়া তো আমি একজনকে শাস্তি দিয়ে পারিনা।’
সামনে বসা একজন হেসে বলল, ‘প্রমাণ? আপনি চাইলে আপনাকে হাতেনাতে ধরাই দিতে পারি। শুধু চান কিনা তাই বলেন।’
করিম মোল্লা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘হুম দাও। প্রমাণ দিতে পারলে হারামজাদাকে লেংটা করে একশ একবার কানে ধরে উঠবস করিয়ে পাছায় লাত্থি মেরে বিদায় করে দিব।’
লোক দুজন উৎসাহিত হয়ে কান পর্যন্ত হেসে সালাম দিয়ে বিদায় নিলো।
করিম মোল্লা স্থির হয়ে বসে থাকলেন। ছেলেটার উপর অল্প কিছুদিনেই মায়া জমে গেছে। ঝামেলায় জড়ানোর আগেই কি করা যায় তাই ভাবছেন।
ফজরের আজান হতে আর কিছুক্ষণ বাকি। শেষ রাতের আধার কাটতে শুরু করেছে। অস্পষ্ট আলোতে অয়ন নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল। তার পাশে গুটি গুটি পায়ে আরেকজন হেঁটে যাচ্ছে। পরদিন কোথাও আয়ন মাস্টার আর রাসেলকে খুঁজে পাওয়া গেল না।