ছোট গল্পঃ শেষ পাতা

সাহিত্য

শেষ পাতা
– এস.কে নূরমোহাম্মদ

১.
মাতব্বর সাহেবের বাড়ির উঠোনে বিরাট সমাবেশ! প্রচুর লোকসমাগম। আশেপাশের ঘরের ডোয়ায় গৃহিণীরা ঘোমটা কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার চোখেই অগাধ কৌতুহল। আর একজোড়া নর-নারী।

“ইচ্ছামতো পিটানো উচিত, বেশরম মাইয়া পোলা!”

“পাথর মারা উচিত!”

“দোররা মারতে হবে ১০১ খানা”

গুঞ্জন ক্রমেই বাড়ছে। খানিক বাদেই মাতব্বর সাহেব গদি দখল করে বসলেন। সবাই চুপ। গ্রামের মাথাকে সম্মান করে গ্রামবাসী।

‘ঘটনা সবার সম্মুখে আরো একবার প্রকাশ করা হোক।”

পানের সাথে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললেন গফফার সাহেব।

“হাজেরানে মজলিস, আমরা সকলেই জানি। তবুও আরো একবার নিজ চোক্ষে দেখা ঘটনাটা সবার সম্মুখে বলতেছি আমি। আমাদের গ্রামের মোজাম্মেল মাস্টারের অবিবাহিত যুবতী কন্যা অহনা আর ভন্ড মকবুল গত পরশু রাতে পরস্পরের সাথে রাত্রিযাপন করেছে।আমি নিজ চোখে মকবুলের ঘর থেকে ওই মেয়েকে বাহির হইতে দেখেছি।”

আবারো শুরু হলো গুঞ্জন। শাস্তির ধরন নিয়ে সবাই চিন্তিত। মাতব্বর সাহেব হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে বলতে লাগলেন “প্রিয় গ্রামবাসী! আমাদের ছোট্ট এই সুন্দর গ্রামে এরূপ পাপকাজ মানে গজব। আল্লাহপাক আমাদের উপর নারাজ হয়ে আছেন। শীঘ্রই এদেরকে কঠিন শাস্তিনা দেয়া হলে আমরা সবাই গজবে পতিত হবো। বোঝা গেল সবার?”
সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো “জ্বে”

ছেলেটার কপাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম মাটিতে পড়ছে। আধবোঁজা চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আছে। কোন কথাই ওর কানে স্পষ্ট হয়ে আসছেনা। কার যেন ছোট্ট একটা ডাক যেন দূর থেকে ভেসে আসছে! না তাকিয়েও বুঝতে পারছে সে, “মেয়েটার দুচোখ জুড়ে প্রবল উৎকণ্ঠা। যার পুরোটাই শুধু ওর জন্য।”

 

২.

ঘটনার প্রথমাংশ আড়াই বছর পেছনে।
আশেপাশের কোন এক গ্রাম থেকে শিউলিডাঙা গ্রামে চব্বিশ-ছাব্বিশের এক যুবকের আবির্ভাব। পরনে লুঙ্গি আর ফুলহাতা শার্ট। কাঁধে ছোট্ট একটা ব্যাগ ঝুলানো নিপাট ভদ্র চেহারার এই যুবক বাছ বিচার ছাড়াই সবার উপকার করতে লাগলো।

বাড়ির বুড়ো হাবড়াকে ঘরের বৌ বাজার করতে দিয়েছে? আগন্তুক যুবক বাড়ি অবধি বয়ে নিয়ে গেল ব্যাগ ভরা বাজার। গরুর গোবরে পথে পা দেয়া দায়! ঘেন্নাপিত্তি ভুলে সব তুলে রেখে দিলো রাস্তার পাশে। বৃষ্টির পানি জমে বাজার একাকার? কোত্থেকে কোদাল শাবল এনে সে পানি নামিয়েদিলো এক নালায়।

সাধারণ সব কাজ যেগুলো মানুষ ইচ্ছা করলেই পারে কিন্তু করেনা সেসব কাজে আগন্তুক যুবক হাজির। মানুষের বিপদাপদ থেকে শুরু করে ছোটখাটো সব কাজে আনন্দদায়ক নাম একটাই “মকবুল”। কোত্থেকে তার আবির্ভাব জানতে চাইলে কখনোই সদুত্তর মেলেনি। তা নিয়ে jআমজনতার খুব একটা মাথাব্যথাও হয়নি। বিনে পয়সায় এমন উপকারী লোকের পিছনে অত ঘাটাঘাটি লাগে নাকি!

কিন্তু একজন মানুষের ঘাটাঘাটির বিষয়বস্তু হয়ে গেল সেই আগন্তুক যুবক। গ্রামের সম্মানিত মুরুব্বী মোজাম্মেল মাষ্টারের মেয়ে অহনার কৌতুহল ছাড়িয়ে গেল সবকিছুকে। একপ্রকার জেদ চেপে গেল ওর। যে , এই লোকের আদ্যোপান্ত জানতেই হবে। সেই জেদ থেকেই শুরু হলো নতুন এক গল্প।

****
অহনা তখন সবেমাত্র কলেজে পা দিলো। চড়ুই পাখির ছটফটে মন নিয়ে দিনরাত কল্পনায় ভাসে মেয়ে। কিন্তু বাস্তবতা খুব রঙিন যে নয়! হঠাৎ বাবার মৃত্যুতে মনমরা হয়ে ঘরের ভেতর দিনযাপন করতে লাগলো সেই চঞ্চলা পাখি।আঞ্জুম আরা বেগম দুই মেয়েকে নিয়ে বেসামাল। মাথা গোঁজার ঠাঁই বাড়ি আরএক টুকরো জমি ছাড়া কিছু নেই বললেই চলে।না থাকার কারণটাও বেশ যৌক্তিক! মাষ্টার সাহেব ছিলেন নিশ্চিন্ত মনের মানুষ।

আল্লাই চালাবে মনোভাব তার মনে খুব গেঁড়ে ছিলো। তাই সহায় সম্পত্তি বৃদ্ধির দিকে খুব একটা নজর ছিলো না তার।

স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুর পর মাষ্টার সাহেবের খন্ড জমিতে হাত পড়লো মুল্লুকওয়ালাদের। আত্নীয় স্বজন বলতে স্বামীর বড় দুই ভাই। একজন মারা গেছেন আর একজন শহুরে। নিজের দিকে তিন বোন। ঢাল হয়ে দাঁড়ানো পুরুষ মানুষের অভাব। আনজুম আরা বেগম কূলকিনারা পেলেন না।

এমন অবস্থায় মকবুল নামের সেই যুবক অহনাদের বাড়িতে আসলো। তার প্রস্তাব ছন্নছাড়া হলেও আনজুম আরা রাজী হলেন।
“বাবা আমি বড় মেয়ের সাথে কথা বইলা দেখি?”
“তা তো বলবেনই চাচী। আফা তো আর মানা করবেনা জানি!” বলেই বিদায় নিয়ে চলে গেল মকবুল।

ঘুমানোর আগে মেয়ের মতামত চাইলেন আঞ্জুম আরা।
“মকবুল ছেলেটারে চিনস না? ওই যে ঘুরেফেরে মাইনষের কাজ করে দেয় যেই ভিনদেশী ছেলেটা!”
“কও কি হইছে?” অহনার মন ভালো নেই।
“ছেলেটা আমাগো জমিটুক আবাদ করতে চাইতাছে। তুই কি কস মা?”

“ক্যান? দখল করার নতুন বুদ্ধি নাকি?”
“না না! মাস ছয়েক তো হইলো পোলাটা গ্রামে। সবার উপকার ছাড়া কিছুই করেনা। দুইবেলা ভাত পাইলেই ওর চলে। এরম ভালো,কাজের, দেখাশোনার লোক থাকলে জমির দিক থেকে নজর যাবে মাইনষের!” যুক্তি দেখালেন অহনার মা।
“যা ভালো বোঝো করো” ছোটবোনকে জড়িয়ে চোখ বুজলো অহনা।

 

৩.

সপ্তাহখানেক কেটে গেল।
মন খারাপের সময়টাতেও মকবুলকে ভালোকরে লক্ষ্য করেছিলো অহনা। বাবার দাফন কাফনে সবার আগে আগে ছিলো এই লোক। সবকিছুতেই তার পরিপাটী আর দক্ষতার ছাপ! নানারকম সন্দেহ নিয়ে একদিন বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ডাকদিয়েই ফেললো ও।

“মকবুল ভাই!”

হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসলো মকবুল।

“কোন সমস্যা আফা?”
“আপনি থাকেন কই”
“এইখানে সেইখানে। বাজারে থাকি। দোকান পাহারা দিই। ইত্যাদি ইত্যাদি জাগায় থাকি”
মকবুলের উদ্ভট উত্তর শুনে মুখ টিপে হাসলো অহনা।
“খাওয়া হয় কই?”
“যে কখন খাওয়ায় খাই। না পাইলে নাই।”
“আজকে রাত্রে আমাদের বাড়িতে খাবেন। আম্মা বলছে।”
সাতপাঁচ ভেবেই মিথ্যা বলে দিলো অহনা। মাকে বোঝালেই হবে। “আচ্ছা” বলেই বাজারের পথে হাঁটা ধরলো মকবুল।

 

****
খাওয়ার সময় জমিজমা নিয়ে কথা হলো। অহনা চুপচাপ। বাবা নেই ভাবতেই ওর ভালো লাগেনা। ছোটবোনটা কি বোঝে কে জানে! কিন্তু চোখের দিকে তাকালেই মনে হয় কেঁদে দেবে!

“চাচী আমি তাইলে শীঘ্রই কাজ শুরু করি কি বলেন?” হাত মুছতে মুছতে বললো মকবুল।
“তোমার যা সুবিধা বাপ” আঞ্জুম আরার দীর্ঘঃশ্বাস।
“আচ্ছা আমি তাইলে আসি আজকে?”

অহনার দিকে একবার তাকিয়েই চলে গেল মকবুল। মেয়েটা ভাবলো, এই সাদাসিধা লোক জমিজমার কি বোঝে! আজব কারবার!

 

****

জামাল চাচার চায়ের দোকানে শুয়ে আছে মকবুল। লোক তার বউয়ের কাছে থাকার প্রবল আকর্ষণ বোধ করেছে। বুড়ো বয়সে কি ভালোবাসারে বাপ! ও ভাবে আর হাসে। একটা সময় নিজের কথা ভাবতে ভাবতে গম্ভীর হয়ে যায় মকবুল। কে, কি, কোথায়! প্রশ্নের উত্তর গুলো খুব এলোমেলো। সাজানোটাও বেশ কঠিন। তবে জীবনকে ভিন্নমাত্রা দেয়াটা বেশ সহজই লাগছে! মোম জ্বালিয়ে ছোট্ট কাপড়ের ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে মকবুল। বালিশের নিচে ওটা রেখে হাসতে হাসতেই ঘুমিয়ে যায় অদ্ভুত সেই আগন্তুক। ভোরের আলো ফোটার আগেই যে তার জাগতে হবে!

 

****

“আপনি কলেজে যাননা অনেকদিন। কেন?”
ঘর থেকে বেরোতেই অহনাকে জিজ্ঞেস করলো মকবুল।
“আপনার কি তাতে?” কিছুটা রাগ হলো অহনার।
“চাচীকে জিজ্ঞাস করছিলাম। যথার্থ কারণ নেই জানালেন। ”
“আমি কলেজে যাই না মরি! তাতে আপনার সমস্যা কি? আব্বা মরার পর সবাই আমার সাথে মজা করতে আসে। আপনিও আসছেন! তাও আবার ভিনদেশী হয়ে! এক্ষুনি যান। এই বাড়ি আর আসবেন না।- কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ঢুকে গেল অহনা।

রাতেও সব ঠিকঠাক ছিলো। তাই সকাল সকাল এমন প্রতিক্রিয়া আশা করেনি মকবুল। ওর মনটাও খারাপ হয়ে গেল।।

ওইদিনের পর থেকে টানা ১১ দিন আগন্তুক উধাও। সপ্তাহের মাথায় কলেজে যাওয়া শুরু করলো অহনা। যাওয়া আসার পথে মন খারাপ করে মকবুলকে খুঁজতে লাগলো মেয়েটা। বেশ কিছুদিন পর তার দেখা পাওয়া গেল। এক দোকানের পাশে আমগাছ লাগচ্ছে সে। মানুষজন থাকায় না ডেকে ও ভাবলো, বাড়ির সামনে দিয়ে গেলেই খবর হবে চান্দুর!রাগে কটমট করতে করতে বাড়ি ফিরলো অহনা। এই রাগ কার জন্য কিসের জন্য! কৃষ্ণকুমারী তা ভেবেই দেখলোনা!

 

****

 

“এই যে ভালো মানুষ!” অহনার ডাকে দাঁড়িয়ে গেল মকবুল।

“এদ্দিন ছিলেন কই? আশেপাশের কোন তল্লাটেও তো দেখলাম না!” বললো অহনা।
“আপনারে বলতে হবে?” পাল্টা প্রশ্ন করলো মকবুল।
চোখ ফেঁটে পড়ার উপক্রম হলো অহনার। দৌড়ে ঘরে ঢুকলো মেয়েটা।
“কি হইলো বাপ! এতদিন পর কইত্থেকে আসলা? আমরা তো ভাবলাম তুমি চইলা গেছো!” ঘর থেকে বের হলেন আঞ্জুম আরা বেগম।
“কিছু না চাচী! জরুরী কাজে শহরের দিক গেছিলাম। সবকিছু রেডি। কাইল থেকেই কাজ হবে ইনশাআল্লা! দোয়া রাইখেন।” বললো মকবুল।
“দোয়া রাখি বাপ। তুমি তো ছেলের মতোই।”
তাড়াহুড়ো করে বাজারমুখো হলো মকবুল। কালকের দিনটা ব্যস্ততাময়।

 

****

টুকটাক করে সেই জমির কোণায় লম্বাটে একটা ঘর দাঁড় করিয়ে ফেললো মকবুল। তা দেখে লোকের মুখে নানান ঢঙের কথা!
‘কপাল ফিরছে পোলাটার!’
‘ধনসম্পদ হস্তগত। এইবার বাকি রাইজকণ্যা!’ ইত্যাদি ইত্যাদি কানাঘুষায় মুখরিত বাজার।
তা নিয়ে মকবুলের মাথাব্যথা নেই। ও শোনে আর হাসে। হেসে উড়িয়ে দেয়। সবাই ভাবে পাগল মানুষ। থাকার জায়গা পাইছে থাকুক। মাষ্টার সাহেবের কৃষ্ণকুমারী মেয়েকে সঙ্গী করে নিতেও বললো দুয়েকজন। তাদের মূলকথা, পাগলের জন্য এই এতিম কালো মেয়ের চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে!

আসলে অহনা কালো নয়, শ্যামলা। ভালোকরে তাকালেই শুধুমাত্র এই মেয়ের সৌন্দর্য বোঝা যায়। তাকাতে হবে ওর চোখের দিকে। মকবুল অন্ধকারে একবার তাকিয়েছিল। তারপর থেকেই কিছুাটা ভয় ভয় লাগছে ওর। সবকিছু উলটপালট হয়ে যাওয়ার ভয়।

 

৪.

“চাচী একটা কথা ছিলো।”
“বলো বাপ” আঞ্জুম আরা দারুন খুশি। এই বাউন্ডুলে ছেলে তার জমিতে প্রাণ নিয়ে এসেছে। ঘরবাড়ি সবকিছুই এখন অন্যরকম লাগে। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ। কৃষিকাজ বেশ ভালো বোঝে এই ছোঁড়া।

“বলছিলাম অহনার ফাস্ট ইয়ার তো শেষ। আস্তে ধীরে কিছু করতে বলেন?”
“ও আবার কি করবে মকবুল?” অবাক হলো আঞ্জুম আরা বেগম।

“গণিতে সে ছোটকাল থেকেই ভালো। শত হোক মাষ্টার কাকার মেয়েই তো! বলেন তারে দুয়েকটা পোলাপান পড়াইতে। পোলাপান কত কষ্ট কইরা স্যারগো বাড়িতে যায়! কাছেকাছে সবাই ওর কাছে পড়লো, কিছু টাকা পাইলে পাইলো না পাইলে নাই। শিখাইতে তো আর দোষ নাই। কাকাও তো বিনে পয়সায় ছেলেপেলে পড়াইতো!” মকবুল থামলো।

“এতকিছু জানো কেমনে বাপ?” আঞ্জুম আরা অবাক হয়।
“বছর ঘুইরা গেল চাচী এই গ্রামে। আর বাজারে থাকলে মাসের ভিতরেই মহল্লা মুখস্ত হবে আপনার” হেহে করে হাসতে লাগলো ছেলেটা।

আড়াল থেকে সবকিছুই শুনলো অহনা। ইদানীং এই লোকের বিচ্ছিরি হাসিটাও বেশ লাগে। আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখে নেয় মেয়েটা। কালো একটা সাধারণ মেয়ে, আকর্ষণীয় কিছুই নেই। বরাবরের মতো এই বিশ্লেষণেই অটুট থাকলো অহনা। কারণ সে নিজেও নিজেকে অতটা গভীর ভাবে দেখেনি, যতটা দেখেছে অন্যকেউ।

 

****
বেশ সাদামাটাই যাচ্ছিলো দিনকাল। ভালোলাগাটা বাড়তে বাড়তে আকাশ ছুঁলো অহনার। মকবু্ল আগের মতোই আছে কিনা বোঝা দায়। কাজবাজ সব ঠিকঠাক রাখে সে। পরিবর্তন বলতে মাষ্টার সাহেবের পুরোনো সাইকেলটা চালিয়ে বাজারে যায়। অহনা জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে চোখে চোখে বিদায় দেয়। মকবুল পিছন ফিরে থাকলেও মনে মনে বিদায় নেয়। চোখে মনের লুকোচুরি ভালোলাগায় ব্যঘাত আসলো কিছুকাল পরেই।

 

৫.

জমি থেকে বছর শেষে আসলো ভালো লাভ। আঞ্জুম আরাকে না জানিয়েই একটা সেলাই মেশিন নিয়ে আসলো মকবুল।

“আপনি টুকটাক চালাইলেন। অহনাও বসলো মাঝেমধ্যে। কি বলেন চাচী?” বাক্সতে কি আছে বুঝতে পারলো অহনার মা। প্রতিবেশীদের ঢালা কথায় কান তার বন্ধ। মকবুলকে ধীরেসুস্থে বলতে শুরু করলেন তিনি।

“দেখো মকবুল, মেয়ে আমার কালো হইলেও গায়ে গতরে বড় হইছে। তোমার এইখানে থাকাটা সবাই ভালো চোখে দেখতেছেনা। সম্বন্ধ ভালো পাইছি। লাভের টাকা আর কিছু ধারদেনা করলে এইবারই হয়ে যাবে।”

“ধারদেনা কেন চাচী? টাকা নাহয় আমিই কিছু দিলাম। কিন্তু মাসকয়েক পরে তো ওর পরীক্ষা। ওইটা তো শেষ হোক নাকি?”আঞ্জুম আরা খিস্তি আউড়ে বলে গেলেন, “মেয়ে লোকের অত পড়া দিয়ে কাজ কি? ভালো পাত্র পাওয়া গেছে। বিয়ে হবে।”

 

 

****

 

নিষ্প্রাণ বিকাল। মকবুল ওর ঘরে রাখা সার নিয়ে কি যেন করছে। পায়ের আওয়াজেই টের পাওয়া গেল অহনার উপস্থিতি।

“আম্মারে পরীক্ষার কথা বলতে গেছেন কেন?” দাঁতে দাঁত চেপে শান্ত হতে চাইছে অহনা।
“কি বলেন? পরীক্ষা দিবেন না? শহরে গিয়া গণিত নিয়ে পড়বেননা আপনি?”
না না করে চিৎকার দিয়ে উঠলো অহনা।

“আমার মতো কালা মেয়েদের পড়াশোনা কিসের? সম্মন্ধ পাইলেই বিয়া করতে হবে, সারাজীবন যৌতুক দিয়া ঘর টিকাইতে হবে। মাইয়াদের ভাগ্যই তো এইটা। পড়ালেখা কিসের?”

কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল মেয়েটা। কান্নার আড়ালে বলে গেল ওর মনের কথা। নিরুপায় মকবুল পুরোনো সেই বইটা হাতে নিয়ে উল্টাতে লাগলো। বইয়ের শেষ দিকের দুটো পাতায় আঠা লাগানো। মকবুল আরো একবার উপলব্ধি করলো, ও পাগল হয়ে গেছে।

 

****

 

বিয়ের সম্মন্ধ পাকা। পাশের গ্রামেরই ছেলে। দোকানপাট আছে। মোটামুটি টাকাওয়ালা। ঘটকালী করেছে সবুর মিয়া। এই এক লোক যে মকবুলকে দেখতে পারেনা। সুযোগ খোঁজে ওকে শুধু বাঁশ দেয়ার। এই বিয়ে হলে সে বেশ অংকের টাকা পাবে। কিন্তু লোকমুখে শোনা যায় মকবুল নাকি ভেজাল করতে পারে। তাই সে নতুন ফন্দি আঁটলো।

“ভাতিজা একটা বিপদে পড়ছি। ” কাতর কন্ঠে সবুর মিয়া।
“কি বিপদ চাচা?” মকবুলেরও খুব একটা সুবিধা লাগেনা এই লোক।
“পোলা অসুস্থ। বাড়িত থাকা লাগবো আইজকা। আবার দোকানে

নতুন মাল উঠাইছি। কি করবো বাপ কও?”

“আপনিই বলেন কি করা লাগবে?” মকবুল বিরক্ত হলো।

“আইজকের রাইতটা একটু থাইকো বাপ?”

সবুর মিয়ার অনুনয় বিনয়ে রাজী হলো মকবুল। ভাবলো একরাতই তো! সাত সকালে সবুর মিয়ার চিৎকার। তার দোকানের ক্যাশ ভাঙা। টাকা উধাও। জানা গেল মকবুল ছিলো গতরাতে। পাকড়াও করে তাকে বেদম প্রহার করা হলো। সবুর মিয়া দাবী করলো মাতব্বরের কাছে নিয়া ওকে গ্রাম থেকে বাইর করা হোক। কিন্তু প্রবীণ কয়েকজন মুরুব্বীর কথায় ছেড়ে দেয়া হলো মকবুলকে। সবুর মিয়ার মন শান্তি হলো না।

‘এই ছোঁড়াকে গ্রামছাড়া না করতে পারলে পরে ঝামেলা হইতে পারে এইটা নিয়া।’ ভাবলো সে। এবার গা বাঁচাতে টাকার মায়া ছাঁড়লো দোকানদার।

 

 

****

 

মার খেয়ে গা কাঁপিয়ে জ্বর আসলো মকবুলের। বিকাল গড়িয়ে রাত। বেহুশের মতোঘরে পরে থাকলো মকবুল। অহনা সব শোনার পর রাত হতেই আর থাকতে পারলো না। পা টিপে টিপে মকবুলের ঘরে আসলো মেয়েটা। গায়ে হাত দিতেই আঁতকে উঠলো অহনা। তাড়াতাড়ি মাথায় পানি দিয়ে গা মোছানোর সময় হুশ ফিরলো মকবুলের।

অহনাকে দেখে চট করে উঠে বসলো ও।

“তুমি এইখানে কেন? বাড়ি যাও”

মকবুলের কথায় কান দিল না অহনা।

“আপনি কে বলেন তো”
“আমি কেউ না। ঘরে যাও” চারিদিকে তাকালো মকবুল। ল্যাম্প ছাড়া সবই অন্ধকার।
“পরিচয় না দিয়ে গ্রাম থেকে গেলে জানবেন আমি গলায় দঁড়ি দিছি” আর দাঁড়ালো না অহনা।

পরদিনই রটে গেল সারাগ্রামে,

“মকবুল অহনা প্রতিরাতে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়” দোকানদার সবুর মিয়া সহ আরো দুইজন নিজচোখে তা দেখেছে। পাহারার কষ্ট আর বুদ্ধিটা বৃথা যায়নি সবুর মিয়ার। অহনা মকবুলের ঘরে না গেলেও কিছুদিন বাদে সে এই খবরই প্রচার করে দিতো।

পরদিনই আয়োজন হলো বিচার সালিশের। আঞ্জুম আরা বেগম মেয়ের এহেন কাজে বারংবার মুর্ছা যায়। প্রতিবেশীরা কাজ পেয়েছে পানি ঢালার।

 

৬.

“তবে শাস্তি দেয়ার আগে এদের বিয়া দেয়া দরকার। কি বলেন সবাই?” মাতব্বর সাহেব জ্ঞানী মানুষ । তার কথায় দ্বিমত নেই কোন। তবে সবুর কিছুটা মনুঃক্ষুণ্ণ। গ্রামে এই ছেলে থাকলেই তো বিপদ। সর্বসম্মতিক্রমে ইমাম হুজুর বিবাহ পড়ালেন। দেনমোহর নিয়ে শংকার অবসান ঘটালো মকবুল নিজেই। একলক্ষ টাকা বলায় সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেও মাতব্বর সাহেব মকবুলের কথাই রাখতে বললেন।

বিয়ের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর আসলো শাস্তির ঘোষনা। “এদেরকে ১০১টা দোররা মেরে একঘরে করে রাখা হবে। যেহেতু তারা স্বামী স্ত্রী, তাই তিনমাস পর তারা গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও সংসার করতে পারবে। এই তিনমাস তাদের সাথে কোন লেনদেন হবেনা। যদি করেন, গজব পরবে গজব!” সবাই ভয় পেলো। মাতব্বর সাহেবের কথাই ফতোয়া। গ্রামের একমাত্র হাজী বলে কথা!

 

****

সুস্থ হতেই সপ্তাহ লাগলো দুজনের। এক মধ্যবয়সী মহিলা প্রয়োজনীয় সবকিছু দিয়ে যায় রাতে। অহনা ঐ চাচীকে মা আর বোনের দিকে খেয়াল রাখতে বলে। মহিলা আশ্বস্ত করে ওকে। সেও মকবুলের দিকে খেয়াল রাখতে বলে। অহনা এই চাচীর হঠাৎ দরদ দেখে বুঝতে পারে, ভেতরে সত্যিই একটা গন্ডগোল আছে।

“আপনি এক সপ্তাহ আমার সাথে কথা বলেন না।”
“কি বলবো?”

“আপনি এক সপ্তাহ আমার সাথে থাকেন না”

ফুঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা।

হো হো করে অহনার সেই প্রিয় বিচ্ছিরি হাসিটা হেসে উঠলো মকবুল।

“বিয়ে হলোই সাতদিন। তাও আবার জোর করে দেয়া বিয়ে। যেখানে গনধোলাই আর জুতার আঘাতে জামাই বউ অসুস্থ, সেখানে তারা রোমান্সটা করে কিভাবে?”

“এখন তো তারা সুস্থ। কিন্তু আপনি বললেন জোরে করে বিয়ে। তারমানে আমাকে…”

অহনার চেহারাটা মলিন হয়ে গেল।

“না না সেরকম কিছুনা। আমারও ভালো লাগতো…” মকবুল বুঝাতে চাইলো।

“আমি সুন্দর না তাইতো?” উঠে দাঁড়ালো অহনা।

হাত টেনে ওকে জড়িয়ে নিলো মকবুল।

“আমি ভালোবাসতাম। কিন্তু প্ল্যানের ভেতর এসব ছিলো না। এভাবে চাইনি আমি।”

ওর কথা কানেই গেল না অহনার। ভালোলাগার মানুষের বাহুডোরে অচেতন মতো লাগলো নিজেকে।

 

****

 

“আমি কাওসার। আব্বা আম্মা মারা যায় ১৬ তে। চাচার কাছে বড় হই। ভাইবোন না থাকায় বাবার সম্পত্তি আমারই হয়। চাচা মানুষ ভালো হওয়ায় বোঝার আগ পর্যন্ত সব দেখে শুনেই রাখে। ইন্টার পাশ করার আগে আমি একটা গল্পের বই পড়ি।বইয়ের নায়কের মতো হতে ইচ্ছা করে আমার। নায়ক থাকে একজন মুচির ছেলে।কিন্তু প্রচুর প্রতিভাবান। গরিবি জীবন তার ভালো না লাগায় সে ঘর পালালো।

বনে বাদারে ঘুরতে ঘুরতে একটা সময় এক গ্রামে পৌঁছায়। গ্রামটা ছিলো খুব জংগলের ভেতর। নায়ক সেই ছোট্ট সেকেলে গ্রামকে নানান রকম ভাবে সাজিয়ে তুললো।তার মেধা বুদ্ধি সবকিছুই ছিলো সেই মানুষদের কাছে অলৌকিক। কারণ তারা ছিলো সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন।

আমিও একটা গ্রামই চেয়েছিলাম। বন্ধুর পরিচিত হওয়ায় তোমাদেরটাকেই বেছে নিলাম। ভাবলাম মেধা, প্রতিভা না থাকুক, মানুষের উপকার করে তো তাদের মনে জায়গা করেনেয়া যায়! ঠিকঠাকই ছিলো সব। তোমার আব্বা মারা যাওয়া আর তোমাকে ভালো করে দেখাতেই যত ভেজাল হলো!”

রাগে কপাল কুঁচকালো অহনা। মকবুল আমতা আমতা করতে লাগলো।

“মানে ঠিক ভেজাল না। ভালোই! এক্সাইটমেন্ট হইলো খুব! একটু বেশি আর কি!”

“নায়ক হওয়ার শখ মিটছে আপনার?” ভেংচি কাটলো অহনা।

“মিটছে তো বটেই! গল্পের মতো হয় নাকি জীবন!” চুপসে গেল মকবুল।

“গল্পের বাকীটুক বললেন না?” অহনা ফিকফিক হাসলো। মকবুল সোৎসাহে শুরুআবার শুরু করলো।

“তো মুচির ছেলে একসময় গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হলো। সেখানকার রাজা খুব প্রবীণ হওয়ায় সে সিদ্ধান্ত নিলো সেই ছেলেকে তার জায়গায় বসিয়ে যাবেন…”

“তারপরের পাতা দুইটা আঠা দিয়ে লাগানো। আর রাজার মেয়ের রূপের কথা বলছেন না যে?” অহনার কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল মকবুল।

“তুত্তুত্তুমি জানলা কিভাবে?”

“কারণ আমি লেখাপড়া জানি। দেড়মাস পর আমার পরীক্ষা” মকবুলের চুল টানতে লাগলো অহনা।

“ও আচ্ছা। তো চলো পরীক্ষার প্রস্তুতি নিই?” আগন্তুকের মুখে রহস্যজনক হাসি।

“আপনার মতো পাগলের সাথে কই যাবো আমি?” অহনা ভ্রূ নাচালো।

মকবুল সেই বিচ্ছিরি হাসিটা আবার দিতে লাগলো। মেয়েটার আবারো ভালো লাগলো।

 

****

 

“এতটাকা কই পাইলেন আপনি?”
গোপনে সাহায্য করা চাচীকে হাজার তিনেক টাকা দিতে দেখে জিজ্ঞেস করলো অহনা।

“এই মহিলার মেয়ের বিয়ের খরচ পুরাটাই দিছে মকবুল”

“বলেন কি? চাচী নাকি জমি বিক্রি করছে?”

“সেইটার ক্রেতাই তো আমি!” মিচমিচ করে হাসছে মকবুল।

অহনার বিস্ময় একটু একটু করে বাড়ছেই।

“ওঠো। শক্ত করে ধরো।” বললো মকবুল। অহনা মনে মনে বেশ উত্তেজিত।

রাতের আঁধারে সাজাপ্রাপ্ত এক যুগল পালিয়ে যাচ্ছে সাইকেলে করে। দৃশ্যটা সুন্দর। তবে জোনাকীরা ছাড়া সবাই বঞ্চিত হলো।

 

****

 

মকবুলের কোমরে কি যেন একটা কেঁপে উঠলো। “মোবাইলও আছে! চার্জ দিছেন কই?” অহনা কৌতুহলী।

“বন্ধ থাকে। কাজে লাগলে খুলি। আর ব্যাটারীও আছে অনেক। ফোন ধরো।”

আস্তে করে হ্যালো বললো অহনা। ওপাশ থেকে ভাবী বলে চেঁচিয়ে উঠলো এক ছেলে। ভয়ে ফোন কেঁটে দিলো অহনা।

টানা একঘন্টা সাইকেল চালিয়ে বাসস্ট্যান্ডে ওরা দুজন। হাত নাড়তে নাড়তে এক লোক এগিয়ে আসলো।

“বন্ধু” পরিচয় করিয়ে দিলো মকবুল।

“ভাবী কি সাইকেল জার্নিতে ক্লান্ত?” রসিকতা করলো মকবুলের বন্ধু।

“টিকিট কাটছস?” জিজ্ঞেস করলো মকবুল।

“হ। চল। আর মিনিট পনের বাকী”

বন্ধুর পিছে পিছে হাঁটলো নবদম্পতি।

“এই একটা মানুষই সবসময় সাথে ছিলো আমার” আস্তে করে অহনার কানে কানে বললো মকবুল। অহনার খুব রাগ হলো। ও ভাবতে লাগলো, “আমি তাইলে কই ছিলাম! পাগলাকে জিজ্ঞেস করতে হবে!”

 

****

সকাল হতেই গ্রাম মাথায় তুললো সব মানুষ! মকবুল-অহনা পালাইছে!!! কি সাংঘাতিক!!! মাতব্ববর সাহেবের শাস্তির অসম্মান। গজব আসতে দেরী নাই! ওদিকে আঞ্জুম আরা ক্রমেই অসুস্থ হচ্ছেন। সেই চাচী ঋণ শোধ কিংবা দায়িত্ববোধ থেকেই ছোট মেয়ে আর মাকে সেবা করে যাচ্ছেন। আর তো দুয়েকদিন। মকবুল আবারো আসবে।

 

৭.

“আম্মা আর বোনটার জন্য চিন্তা লাগতেছে” মকবুলের কাঁধে মাথা রাখলো অহনা। “চিন্তার কারণ নাই। দ্রুতই তাদের নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবো।”

“তা আমরা যাচ্ছি কোথায় মহামানব?” মাথা তুলে চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলো অহনা।

“গল্পের শেষটুক রচনা করতে।” অন্ধকারেও মকবুলের বিচ্ছিরি হাসিটা অনুভব করে ভালো লাগলো মেয়েটার।

“কি ছিলো শেষ দুই পাতায়??” কানেমুখে জিজ্ঞেস করলো অহনা?

“ভালোবাসি”

“ভালোবাসি?”

“হুম ভালোবাসি”

“ভালোবাসি”

চলতেই থাকলো নবদম্পতির ফিসফিসানি। যান্ত্রিক আওয়াজ এবারও বঞ্চিত করলো সবাইকে। কিছু সুন্দর আড়ালেই থেকে যায়। তবুও তারা সুন্দর, প্রাণবন্ত। সবসময়।

 

****

 

বছর দশেক বাদে জমি চষতে গিয়ে এক কিশোর বাক্স পেলো একটা। ভালো কাঠের বাক্স। তবু ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে। তবে ভেতরের পলিথিনে মোড়ানো জিনিসটা পুরোপুরি অক্ষত। জিনিসটা একটা বই। বইয়ের মলাটে নামটা মলিন হয়ে আছে। ছেলেটা বিরবির করে পড়তে লাগলো, “ম-ক-বু-ল” !!!