ছোট গল্প: যত দূরে যাই

সাহিত্য

যত দূরে যাই
ফাহমিদা বারী

এক
জনাকীর্ণ রাস্তায় হনহন করে হাঁটছে রাশেদ। হাতে একটা কালো ব্যাগ। দিগবিদিক শূন্য হয়ে ছুটছে রাশেদ। বিকেল চারটার মধ্যেই ব্যাগটা পৌঁছে দেবার কথা। এখন বাজছে চারটা কুড়ি। গন্তব্যে যখন পৌঁছালো, ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা ছুঁই ছুঁই। রাশেদের একটু ভয় ভয় করছিল। ‘বড় ভাই’ সময়ের ব্যাপারে খুব সতর্ক। এই ব্যাপারে অবহেলা তিনি মোটেও বরদাস্ত করেন না। রাশেদ নিজেও সময় নিয়ে হেলাফেলা করেনা কখনো। সঠিক সময়েই কাজ শেষ করে সে। কিন্তু আজ এর ব্যত্যয় ঘটলো। বাসা থেকে বেরুতেই দেরীটা হয়ে গেল। সব এই নীলাটার জন্য।

বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছাপড়া মত একটা ঘর। স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার ভেতরে। ঘরে ঢুকলেই তীব্র বোঁটকা একটা গন্ধে ভেতরটা ঘুলিয়ে আসে। আজ অনেকদিন যাবত এই কাজে আছে রাশেদ। এই ঘরটিতেও এসেছে অনেকবার। তবু এই গন্ধ আর এই পরিবেশটার সাথে অভ্যস্ত হতে পারেনি সে। ভেতরে কোথায় যেন বাধো বাধো ঠেকে। ঘরটার ভেতরে কোন জানালা নেই, বেশ ঊপরে সিলিং এর কাছাকাছি বেড়া কেটে বানানো ছোট একটা ঘুলঘুলি। খুব সামান্যই আলো আসছে তা দিয়ে। ঘরে ছোট বড় চারটা চৌকি পাতা। পাশে একটা চেয়ারে স্তুপ করে রাখা কাপড়চোপড়। তার পাশেই মেঝেতে বসে কয়েকটা ছেলে তাস খেলছে। হাই ভলিউমে চলছে টিভি। চটকদার হিন্দি গানের সুরে উদ্দাম শরীরী নৃত্য। রাশেদকে ঢুকতে দেখে দুটো ছেলে এগিয়ে আসে। বড় ভাই এর খাস লোক সে। মোটামুটি ভালোই পরিচিতি আছে তার। খুব বেশী কথা বিনিময় হয়না। রাশেদ এগিয়ে দেয় ব্যাগটা। ব্যাগের ভেতরের জিনিসগুলো ভালোমত পরীক্ষা করে দেখে তারা। রাশেদ বেরিয়ে আসবে এমন সময় একজন বলে ওঠে, ‘ আপনার না চারটায় আসার কথা ছিল? বস আপনার জন্য ওয়েট করে একটু আগে চলে গেল। নেক্সট টাইম সময়মত আসবেন।‘

বাইরে বেরিয়ে আসে রাশেদ। খিঁচড়ে ওঠে মেজাজটা। আজ নীলাটাকে দেখে নেবে সে। রাজ্যের হাজার প্রশ্ন কিলবিল করছে মাথার ভেতরে। ওর জেরার চোটে জেরবার হয়ে গেছে রাশেদ। সতর্ক হয় ভেতর ভেতর। অনেক কষ্টে অর্জন করা আজকের এই অবস্থান তার। এটাকে হেলায় হারানো যাবে না।

চব্বিশ-পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক রাশেদ। বাবা-মা আর পাঁচ বছরের ছোট বোন নীলাকে নিয়ে মোটামুটি সুখী এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। বাবা একটা সরকারী কলেজে অধ্যাপনা করতেন। এই মফঃস্বল শহরটিরই আলো, হাওয়া,পানিতে সে তার দিনাতিপাত করেছে। স্বপ্ন দেখেছে উজ্জ্বল,স্বচ্ছল আগামীর। পড়াশুনায় মেধাবী না হলেও মোটামুটি ভালো ছাত্র ছিল সে। এস,এস,সি আর এইচ,এস,সি তে অল্পের জন্য জি,পি,এ ৫ মিস হয়েছে। ভার্সিটির কোচিং করার জন্য ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ঢাকা যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। ইচ্ছে ছিল কোন একটা মেসে গিয়ে ঊঠবে। জান প্রাণ দিয়ে ভার্সিটির কোচিং টা করতে হবে। কোনমতে টিকে যেতে পারলেই হল। মধ্যবিত্ত জীবনের ভীরু আকাঙ্ক্ষা। শিক্ষক বাবা সেই অল্প বয়সেই পড়াশুনার প্রতি ভালোবাসার বীজটা রোপন করতে পেরেছিলেন।
কিন্তু বিধাতার ইচ্ছে ছিল অন্যরকম। বিধিলিপি…যাকে কখনোই খন্ডানো যায় না।

দুই
সব কিছুই চলছিল ঠিকঠাক। কোন্ কোচিং সেন্টারে ভর্তি হওয়া যায় খোঁজখবর নিচ্ছিল ওরা। হঠাৎ করেই যেন এক কালবৈশাখী ঝড় ওলটপালট করে দিল তিল তিল করে গড়ে তোলা ওদের এতদিনের স্বপ্নগুলোকে।

সেদিন দুপুরবেলা অন্য দিনের চেয়ে তাড়াতাড়িই রাশেদের বাবা বাসায় চলে আসলেন। ওর মা সবে রান্নাবান্না শেষ করে গোসলে ঢুকবেন, এমন সময় বাবা ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়লেন।
‘কী ব্যাপার, তুমি হঠাৎ এই সময়ে? শরীর খারাপ না তো?’
‘বুকে একটু ব্যথা করছে। এসিডিটি মনে হয়। কিছুক্ষণ রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।‘

কিন্তু বুকের ব্যথাটা কমলো না। বিকেলের মধ্যে প্রচন্ড ব্যথায় রাশেদের বাবা অস্থির হয়ে ঊঠলেন। একটা সিএনজি ভাড়া করে কাছের একটা নার্সিং হোমে নিয়ে আসা হলো তাকে। সিভিয়ার হার্টএটাক। প্রেসার একদম লো হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার খুব বেশী কিছু করতে পারেননি। রাত ন’টার একটু আগেই রাশেদের বাবা চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

প্রবল হতাশার আঁধারে ঢেকে গেল ওদের জীবন। কুড়ি বছরের জীবনটাতে দায়িত্ববোধ শব্দটার সাথে রাশেদের পরিচয় ছিল না। বাবার মৃত্যু সেই শব্দটার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। ছোট বোন নীলা তখনো স্কুলের গণ্ডী পার হয়নি, রাশেদের অংশ নেয়া হয়নি কোন ভর্তি পরীক্ষায়। পুঞ্জীভূত স্বপ্নগুলো দিয়ে একটু একটু করে সাজানো তাসের দালান ভেঙ্গে গেল এক নিমেষেই। শোকের প্রাবল্য কাটিয়ে ওঠার পরপরই বাস্তবতা নামক কঠোর সত্যটার মুখোমুখি হল তারা। মা ভেঙ্গে পড়লেন আগাগোড়া। বাবার সঞ্চয় বলতে ব্যাংকে জমানো সামান্য কিছু টাকা। একমাত্র স্বস্তি বলতে এটুকুই, বাসাটা তাদের নিজের। বাবা তার সারাজীবনের উপার্জিত অর্থ দিয়ে বাড়ির কাজে হাত দিয়েছিলেন।

আজ এই চরম দুর্দিনে তাদের মাথা গোঁজার এই ঠাঁইটির ভীষণ প্রয়োজন ছিল।
সংসার খরচ, নীলার পড়াশুনা,ওর নিজের একটা অবস্থান তৈরী…রাশেদ অন্ধকার দেখে চোখেমুখে। সংসারের শক্ত জোয়ালটা তার দূর্বল কাঁধে এসে পড়ে। কূলকিনারা পায় না সে। রাশেদের বন্ধুদের ঢাকায় যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসে। আগের দিন দেখা করতে আসে সবাই। রাশেদের অসহায় দৃষ্টির সামনে বেশীক্ষণ দাঁড়াতে পারে না ওরা, পালিয়ে আসে একরকম।
দিন চলে যায় তার আপন গতিতে। কয়েকটা টিউশনী জুটিয়ে উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে থাকে রাশেদ। কিন্তু ক’টা টাকাই বা আসে তাতে!

প্রবল এই দুঃসময়ে হঠাৎই একদিন দেখা হয়ে যায় সুমনের সাথে। একই পাড়ায় ওদের বাসা,স্কুলে একসময় রাশেদের সহপাঠী ছিল সুমন। পড়াশুনা করতো না। পাড়ার বখাটেদের সাথে মিশে উচ্ছন্নে গিয়েছিল একেবারে। রাশেদের সাথে যোগাযোগ ছিল না অনেকদিন। থাকার কথাও নয়। দূর থেকে দেখা হত মাঝে মধ্যে। কে জানতো ভাগ্য এভাবে আবার ওদের পথটাকে মিলিয়ে দেবে!

সুমন যেন এক পলকেই বুঝে ফেলে রাশেদের অবস্থাটা। অন্য এক জগতের সন্ধান দেয় ওকে সুমন। রাশেদের মনোবল আর আত্মবিশ্বাস তখন শুন্যের কোঠায়। তবু অনেক গভীরে প্রোত্থিত নৈতিকতা নামক বস্তুটার তখনো সমাধি ঘটেনি। কিন্তু সুমনের কথার মারপ্যাঁচ আর যুক্তির তোড়ে বেশীক্ষণ টিকে থাকতে পারেনা ওর নুয়ে পড়া ব্যক্তিত্ব।

সুমনই ওকে পরিচয় করিয়ে দেয় বড়ভাই এর সাথে।ওদের মফস্বল শহরের প্রভাবশালী এক ঘেরাটোপের বাসিন্দা। কোন এক রাজনৈতিক দলের সক্রিয় অঙ্গসংগঠনের সাথে জড়িত। ওদের ছোট শহরটিতে ব্যাপক প্রভাব প্রতিপত্তি তার। নানাবিধ ব্যবসা আর রাজনৈতিক, সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ।
রাশেদের বুদ্ধিমত্তা আর আচার-আচরণের কারণে খুব অল্পসময়েই সে বড় ভাইয়ের ডান হাতে পরিণত হয়। প্রথম দিকে ছোটখাট নানা কাজ দিয়ে বড়ভাই রাশেদের পারঙ্গমতা যাচাই করে নেন। দিনে দিনে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে তার। বড় বড় কাজ আসতে থাকে, বড় পার্টিকে ম্যানেজ করতে বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়। একই সাথে বাড়তে থাকে রাশেদের পারিশ্রমিক এর পরিমাণ।
পরিবর্তন আসে রাশেদের জীবনধারায়। দামী শার্ট,প্যান্ট। স্টাইলিশ জুতো,সানগ্লাস। প্রতি মাসে বেশ মোটা অংকের টাকা দিতে থাকে মাকে। রাশেদের সহজ সরল মা এই হঠাৎ উত্থানের কারণ বুঝতে পারে না। রাশেদ মাকে জানায় যে সে ঠিকাদারী করছে। ভালো কিছু কন্ট্যাক্ট পেয়েছে। এখন থেকে সংসারের খরচের ব্যাপারে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। নীলার পড়াশুনায় ছেদ পড়ল না। মেধাবী ছাত্রী নীলা এইচ,এস,সি পাশ করে সাফল্যের সাথে। কিন্তু ভাইয়ের এই হঠাৎ পেয়ে যাওয়া অর্থযোগে ঠিকই রহস্যের গন্ধ পায় নীলা। প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে সে রাশেদকে,
‘কিসের ঠিকাদারী করছিস? লাইসেন্স কোথায় পেলি? এত তাড়াতাড়ি এত কন্ট্যাক্ট পেলি কিভাবে?’ প্রশ্নের পর প্রশ্ন। রাশেদ অসহায় বোধ করে। জবাব দিতে পারে না ঠিকমত। আস্তে আস্তে ধরা পড়ে যেতে থাকে নীলার কাছে।

নীলাকে এখানেই একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে দিয়েছে রাশেদ। ঢাকায় পাঠাতে চেয়েছিল, নীলা রাজি হয়নি। মাকে ছেড়ে যেতে সে রাজী নয়। রাশেদ জো্র করেনি। নীলার শত অনুরোধ সত্ত্বেও নিজে কোন কলেজে অনার্স করতেও রাজী হয়নি। নাঃ, পড়াশুনা আর হবে না রাশেদের। যে জীবন সে বেছে নিয়েছে সেখানে পড়াশুনা শব্দটা কেমন যেন বেমানান ঠেকে।

এক বিকেলে বাসায় ফেরার পথে রাশেদ দেখে নীলা কোচিং করে ফিরছে। পাড়ার উঠতি মাস্তান গোছের কিছু ছেলে বসে আছে মোড়ের কাছে। নীলাকে দেখে ছেলেগুলো চটুল হাসি ঠাট্টায় মেতে ঊঠে। রাশেদকে দেখতে পায় নি ছেলেগুলো । রাশেদ চিনতে পারে না ছেলেগুলোকে। নূতন দেখছে পাড়ায়। হয়তো এই পাড়ার না।

অনেকসময় আশেপাশের পাড়া থেকেও অনেক ছেলে আড্ডা মারতে অন্য পাড়ায় আসে। রাশেদ সামনে এগিয়ে যায়। ছেলেগুলোর কোন ভাবান্তর হয় না ওকে দেখে। রাশেদ নীলাকে বলে,’এই, তুই বাড়ি যা।‘ তারপর ছেলেগুলোর দিকে ফিরে বলে,’ কোন পাড়ার তোমরা?’

ছেলেগুলো কিছু বলতে যাবে, এমন সময় পাশের দোকানে বসে থাকা দুটি ছেলে এসে ওদের কানে কানে কিছু বলে। ছেলেগুলো আর একটা কথাও না বলে সেখান থেকে সটকে পড়ে।

নীলা একটু দূরে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখে। সে বেশ বুঝতে পারে, ওর অনেক চেনা ভাইটা আর আগের মত নেই। বদলে গেছে। কতটা বদলছে এটাই বুঝতে চেষ্টা করে নীলা।

তিন
পরদিন সকালে রাশেদ বেরিয়ে যাওয়ার পর নীলা তার ঘরে এসে ঢোকে। ভাই এর ঘর গোছগাছ করতে ও প্রতিদিনই এই ঘরে ঢোকে। কিন্তু আজ এসেছে অন্য উদ্দেশ্যে। বিছানা, বালিশ, তোশক, আলমারি সব তন্নতন্ন করে খোঁজে নীলা। কী খুঁজছে সে জানে না। মনের একটা অংশ বলছে, কিছু একটা পাবে সে, আরেকটা অংশ চাইছে যেন কিছু না পায়। সেই ছোটবেলা থেকে প্রায় পিঠাপিঠির মত বেড়ে ওঠা দুই ভাই-বোনের। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সব একসাথে ভাগাভাগি করে নেওয়া। তারপর, বাবার মৃত্যু…ভাইয়ের কাঁধে ভর করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখা। ভাইয়ের পরিবর্তিত চালচলন, অকস্যাৎ অনেক অর্থপ্রাপ্তি…না চাইলেও অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করে নীলার মনে। নীলা জানে, এটুকু বোঝার দিব্যি বয়স হয়েছে তার যে এই অর্থপ্রাপ্তি খুব সরলপথে ঘটতে পারে না।

ভারী তোশকটা একটু উঁচু করতেই ভেতরে কিছু প্যাকেট চোখে পড়ে নীলার। ছোট ছোট প্লাস্টিকের প্যাকেটগুলো নেড়ে চেড়ে গন্ধ শুঁকে দেখে। বুঝতে অসুবিধা হয়না। ড্রাগস। এই তাহলে ভাইয়ার ঠিকাদারী ব্যবসা।

প্যাকেটগুলো যথাস্থানে রেখে ঝিম মেরে বসে থাকে নীলা। চিন্তাগুলো অগোছালো হয়ে আসে। কী করবে বুঝতে পারে না সে। মধ্যবিত্ত সুকুমার আদর্শের পরিচর্চায় বড় হয়ে ওঠা ওদের। জীবনের কঠোর প্রতিকূলতার কামড় কতটা কদর্য হতে পারে বোঝা সম্ভব হয়ে ওঠেনি ওদের পক্ষে। তবু অবুঝ প্রশ্নটা ক্রমাগত বিদ্ধ করতে থাকে নীলাকে। আর কি কোনই রাস্তা খোলা ছিল না ভাইয়ার?!
হয়তো ছিল, হয়তো নয়। আর কি বা যায় আসে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়ে?

চার
পরদিন রাতে সুমনের কাছে জরুরী খবর পায় রাশেদ। বড়ভাই তলব করেছে । এখুনি যেতে বলেছে।
ছুটে যায় রাশেদ। বড়ভাই সচরাচর নিজে ডেকে পাঠান না। খুব বেশি দরকারেও অন্য কারো মারফত জানিয়ে দেন। আজ হঠাৎ কী এমন প্রয়োজন পড়ল?
বড়ভাই এর ঘরের পরিবেশই বলে দিচ্ছে ব্যাপার গুরুতর। রাশেদ ভয়ে ভয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
‘তোমার বোন কিভাবে তোমার গতিবিধির খবর পেল?’

স্তম্ভিত হয়ে যায় রাশেদ। এখানে আসতে আসতে অনেক সম্ভাবনার কথা উঁকি দিচ্ছিল ওর মনে। কিন্তু এই প্রশ্নের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না রাশেদ।

‘তোমার বোন তো থানায় গিয়েছিল। একটূ আগে ওসি সাহেব এসেছিলেন থানা থেকে।‘ বড়ভাই বলতে থাকলেন থেমে থেমে,’ দেখো রাশেদ, তোমাকে বিশেষ সুনজরে দেখি আমি। তোমার পরিবার এর কিছু হোক তা তো আমি চাই না। কিন্তু আমার ব্যবসাও তো লাটে উঠাতে পারবো না।‘

রাশেদ অপেক্ষা করে কোন অমোঘ নির্দেশের জন্য।
‘কাল ভোরের আগেই তুমি এই শহর ছাড়বা। পুলিশের ব্যাপার আমি সামলাবো। ঢাকায় চলে যাও। লোকজনকে আগে থেকেই আমি খবর দিয়ে রাখবো। বাসে তোমার সাথে আমার একজন লোক যাবে। কোন সমস্যা নাই তোমার। কিন্তু এইখানে তোমার থাকাটা আমার জন্য নিরাপদ নয়।‘
রাশেদ কোনমতে বলে,’ আমার মা-বোন, তাদের কি হবে?’
‘তারা এখানেই থাকুক, সমস্যা কী? তবে তোমার বোনকে একটু সতর্ক করে যেও।‘

বাসায় ফিরে যায় রাশেদ। রাতে খাওয়ার টেবিলে অনেকদিন পর মা আর নীলার সাথে অনেক গল্প হয়। সেই আগের মত। নীলা একটু চুপচাপ, সোজা চোখে তাকাতে পারছে না রাশেদের দিকে। রাশেদ সহজ করতে চায় নীলাকে। ভেতরে অনেক না বলা কষ্ট জমে ছিল রাশেদের, ইচ্ছে করে এক ঝটকায় সব কষ্টগুলোকে মুক্তি দিতে। মা খুব খুশী হয় কতদিন পর ছেলেটা স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছে, নীলা অবাক হয়।
ভোরের আলো ফোটার আগেই রাশেদ বেরিয়ে পড়ে বাসা থেকে।
ওর টেবিলে পড়ে থাকে একটা চিঠি……নীলাকে লেখা।

পাঁচ
নীলা,
অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম, তোকে সব খুলে বলবো। সংকোচে বলতে পারছিলাম না। ভালোই হল তুই নিজেই সব জেনে গেছিস। বড় ভাই হয়ে এই কথাগুলো তোকে বলতে খুব খারাপ লাগতো আমার।

আমাদের চার কামরার এই বাসাটাকে একখণ্ড স্বর্গ মনে হত আমার। বাবা-মা, আমি,তুই…আমাদের ছোট ছোট স্বপ্নগুলো। সেই স্বপ্নগুলোকে অনেক দূরের মনে হতো না কখনো। হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারবো এতটাই কাছাকাছি ছিল। অথচ দেখ, কত দূরে চলে গেল সবকিছু। আর কোনদিনই ধরা যাবে না রে! হয়তো স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার মত মনের জোরটুকুও ছিল না আমার।

কিন্তু তুই হেরে যাস না আমার মত। আগুনটাকে পুষে রাখিস, নিভতে দিস না কখনও।
মাকে দেখিস। ভালো থাকিস,সবসময়।
তোর পরাজিত ভাই

ছয়
পরদিন সকালে বেশক’টি বাস রাশেদদের ছোট শহরটি থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেল। কিন্তু কোনও বাসেই ‘রাশেদ’ নামের কোন যাত্রী ঊঠলো না।