জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য, হে শুদ্ধতম কবি – জীবনানন্দ দাশ

জাতীয় সাহিত্য

ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস আর এ মাসেই জন্ম নিয়েছিলেন রুপসী বাংলার কবি, নিখাদ বিশুদ্ধতম এক কবিতাসম্রাট, সভ্যতার সুন্দর প্রহরী জীবনানন্দ দাশ (১৭/২/১৮৯৯- ২২/১০/১৯৫৪)। 

একেবারেই প্রচারবিমুখ এবং নির্জনতাপ্রিয় জীবনানন্দ দাশ ছিলেন ‘কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হওয়া কবি ‘। সম্পাদক, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক পিতা এবং সাহিত্যানুরাগী মায়ের সন্তান জীবনানন্দের লেখালেখির শুরুটা স্কুলজীবন থেকেই। বরিশালে জন্ম নেয়া কবি স্থানীয় ব্রজমোহন বিদ্যালয়, ব্রজমোহন কলেজ এবং তারপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং সর্বসশেষ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেন ইংরেজিতে। তাঁর পুরোটা জীবন কেটেছে প্রচন্ড অর্থাভাবে। সেইসব অভাব ছাপিয়ে জাত প্রতিভা জীবনানন্দ তিমির হননের আলোমশাল নিয়ে যাত্রা করলেন রুপসী বাংলার ঘাসের ওপর দিয়ে। সাথে নিলেন পঞ্চপাণ্ডব খেতাবধারী বাকি চারজনকে। এঁরা হলেন বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-৭৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-৬০), বিষ্ণু দে (১৯০৮-৭৪) ও অমীয় চক্রবর্তী (১৯০১-৮৬)।

জীবনানন্দের কাগজে ছাপা প্রথম কবিতা ‘বর্ষ আবাহন’ (১৯১৯) দিয়েই তিনি শুরু করেছিলেন কবিতায় আধুনিকতার আবাহন। ১৯২৫ সালে লেখা ” দেশবন্ধুর প্রয়াণে ” আর ‘নীলিমা’ দিয়েই তিনি জাত চিনিয়েছিলেন নিজের। কবি কালিদাস রায় মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন ‘এ বোধহয় কোন বিখ্যাত কবির ছদ্মনামে লেখা কবিতা ‘ আর রবীন্দ্রনাথ তো বুদ্ধদেবকে একটি চিঠিই লেখেন জীবনানন্দের সুন্দর ‘চিত্রময়তার ‘ কথা উল্লেখ করে। তাঁর বনলতা সেন কবিতাটি বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতার একটি।

১৯২৭ সালে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক ‘ প্রকাশিত হয়। ‌দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধুসর পাণ্ডুলিপি’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে । তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বনলতা সেন’ (১৯৪২) চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘মহাপৃথিবী'(১৯৪৪) পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘সাতটি তারার তিমির’ (১৯৪৮) এবং জীবনানন্দের শ্রেষ্ঠ কবিতা(১৯৫৪) এর প্রত্যেকটিই তুমুল জনপ্রিয়। ‌মৃত্যুর পরে প্রকাশিত – ‘বেলা অবেলা কালবেলা ‘ (১৯৬১), রুপসী বাংলা (১৯৫৭) ও অনন্য সাহিত্যকর্ম। ‌

সাহিত্যের অধ্যাপক জীবনানন্দের অসংখ্য ছোটগল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়। এই আকাশস্পর্শী মহান কবি জীবদ্দশায় প্রকৃত সম্মান পাননি। এর জন্য তাঁর প্রচারবিমুখতা ও দায়ী। তিনি ছিলেন বিবরবাসী। সাহিত্য অকাদেমী পুরষ্কার পেয়েছেন মরণোত্তর। জীবদ্দশায় পেয়েছেন রবীন্দ্র স্মৃতি পুরষ্কার।

জীবনানন্দের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে পরবর্তীকালে অনেক লেখালেখি হয়েছে। যাঁরা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে পুর্নেন্দু পত্রী, আব্দুল মান্নান সৈয়দ আর অম্বুজ বসুর নাম উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক জীবনানন্দকে নিয়ে লিখেছেন ‘এতদিন কোথায় ছিলেন ‘ নামক উপন্যাস। জনপ্রিয় লেখক ক্লিনটন বি. শেলী “অ্যা পোয়েট এপার্ট” নামক বইয়ে লিখেছেন জীবনানন্দকে কিন্তু জীবনানন্দকে নিয়ে পরিপূর্ণ ভাবে লেখা কিংবা বলা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। কারণ, তিঁনি একটা ইতিহাস, একটা যুগ, একটা পৃথিবী, একটা আকাশ কিংবা একটা সমুদ্র।

কালজয়ী এ কবির ১১৮ তম আবির্ভাব দিবসে বিনীত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই তার কবিতার আশ্রয়েই – . “শঙ্খশুভ্র মেঘপুঞ্জে , শুক্লাকাশে, নক্ষত্রের রাতে; ভেঙে যায় কীটপ্রায় ধরণীর বিশীর্ণ নির্মোক, তোমার চকিত স্পর্শে, হে অতন্দ্র দূর কল্পলোক!”

লেখক : কৌশিক অর্ণব
শিক্ষার্থী – আর্মি আইবিএ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনালস।

2 thoughts on “জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য, হে শুদ্ধতম কবি – জীবনানন্দ দাশ

Comments are closed.