জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে রাজশাহীর আম

রাজশাহী

জলবায়ু পরিবর্তন হালের আলোচিত ইস্যু। এর প্রভাব পড়েছে রাজশাহীর ঐতিহ্য আমে। দিন দিন কমছে ফলের রাজার গুণগত মান। বাড়ছে রোগ-বালাইয়ের প্রকোপ। গবেষকরা বলছে, জলবায়ুর বৈরিতা নিয়েই যুগযুগ ধরে অঞ্চলজুড়ে ফলছে সুস্বাদু আম। আর বরাবরই সংকট উৎরে দিচ্ছে উন্নত জাত ও আধুনিক চাষের কলাকৌশল।

বেধে দেয়া সময়সীমা অনুযায়ী, এ বছর রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারে পাকা আম উঠেছে গত ২০ মে থেকে। ওই দিন থেকে নামানো শুরু দেশী গুটি ও গোপালভোগ জাতের আম। এরই মধ্যে গুটি জাতের ও গোপালভোগ পেকেছে। গাছে গাছে এখনো ঝুলছে আম।

কৃষি কর্মকর্তা ও ফল গবেষকরা বলছেন, ফল পাকায় বিলম্বিত হচ্ছে পাল্টে যাওয়া আবহাওয়ায়। সাধারণ ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে তাপমাত্রা থাকলে আমপাকা তরান্বিত হয়। মাঝেমধ্যেই বৃষ্টি নামায় কমে আসছে তাপমাত্রা। আর তাতেই প্রবলম্বিত হচ্ছে আমের ‘ফলক্রম’।

এরমধ্যেই জুনের প্রথম দিন থেকেই বাজারে এসেছে হিমসাগর, খিরসাপাত ও লক্ষ্মণভোগ আম। আর ল্যাংড়া জাতের আমও এসেছে। এছাড়া ১৬ জুন নামবে আম্রপালি ও ফজলি। বিরাজ করবে বর্ষা জুলাইয়েও। মৌসুমের সব শেষ আম আশ্বিনা নামবে ১ জুলাই থেকে। তবে বৈরী আবহাওয়া কারণে বিলম্বিত হতে পারে এসব জাতের আম পাকাও।

আম পাকা পুরোপুরো তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী ফল গবেষনা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জিএম মোরশেদুল বারি ডলার। তিনি বলেন, আমচাষের জন্য সাধারণ ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন। তবে আম পাকার সময় তাপমাত্রা থাকতে হবে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে। তা না হলে আম পাকা বিলম্বিত হবে। এখন সেটিই ঘটছে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল।

এই গবেষক আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাত বন্টন ভেঙে গেছে। আবার অতিবৃষ্টি এবং টানা বৃষ্টিপাত হচ্ছে। প্রলম্বিত হচ্ছে বর্ষাকাল। এটি আম চাষের জন্য অনুপযোগী।

তিনি বলেন, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতার হেরফেরে রোগের সংবেদনশীলতা বেড়েছে। টানা বৃষ্টিপাত ও ভ্যাপসা গরমে এখন আমে ব্যাপক আক্রমন হচ্ছে মাছিপোকার। আগে এটি সীমিত পরিসরে ছিলো। এটি চলে গেছে এখন রাসায়নিক নিয়ন্ত্রনেরও বাইরে। ফলে ভরসা এখন ফেরোমন ট্র্যাপ এবং ফ্রুটব্যাগ।

অতীতে আমে তেমন মিলিবাগ আক্রমন ছিলোনা জানিয়ে এই গবেষক বলেন, বর্তমানে মিলিবাগের ‘হোস্ট রেঞ্জ’ বাড়ছে। এটি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে পুরো অঞ্চলেই। বায়োপেষ্টিসাইড এবং ব্যান্ডিং আটকাতে পারে মিলিবাগ। এছাড়া ‘রেড ব্যান্ড ক্যাটারপিলার’ ও ‘ম্যাঙ্গ স্টোন উইভিল’ আক্রমনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে ব্যাপক।
এবারই প্রথম দেখা দিয়েছে তারকাকার ব্যাক্টেরিয়াল স্পট। এবছর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে নতুন এ ব্যাক্টেরিয়াল স্পট দেখা গেছে। প্রকট হচ্ছে অন্যান্য নিয়মিত রোগ-বালাই। এসবের মোকাবেলায় চলছে নিরন্তর গবেষণা।

তেলবীজ শষ্য ও আইপিএম বিশেষজ্ঞ জিএম মোরশেদুল বারি ডলার আমের শরীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ নিয়েও গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি ফলাফল বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিহীণতা ও তীব্র খরা। এতে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে আমের ‘মেটাবলিজম’। এতে আমের গুনগত মান দিন দিন কমে যাচ্ছে। বাধাগ্রস্থ হচ্ছে ফলক্রম।
জেলার তানোরের পাঁচন্দর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর এলাকার বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম। পৈত্রিক ১১ বিঘার জমিতে আম বাগান গড়ে তুলেছেন তিনি। তিনি বলেন, তার বাগানজুড়ে থোকায় থোকায় আম ঝুলছে। কিন্তু অধিকাংশ আমগাছেই মাছিপোকার আক্রমন। এতে নষ্ট হচ্ছে আম। কৃষি দপ্তরের পরামর্শে রাসায়নিক প্রয়োগেও কাজ হচ্ছেনা। আগামী বছর ফেরোমন ট্র্যাপ ও ফ্রুটব্যাগে আমচাষের পরিকল্পনা রয়েছে তার।

দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে বিষমুক্ত আম উৎপাদনে কাজ করছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম গবেষণা কেন্দ্রের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, সাধারণত ৪০ দিনের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে আমের গুটি ঝরে যায়। এরপরই ফ্রুটব্যাগিং করতে হয় আম। ৫০ থেকে ৬০ দিন আম ফ্রুটব্যাগে থাকে। এটি আমকে নানান বালাই থেকে সুরক্ষা দেয়। এ প্রযুক্তিতে আম চাষ করে লাভবান হচ্ছেন এ অঞ্চলের চাষিরা।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলীম উদ্দিন বলেন, কেবল আম-ই নয়, সব ফসলেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আছে। এ সংকট থেকে উত্তোরণ বেশ কঠিন। কিন্তু উচ্চপ্রযুক্তি এটি সহজ করে দিয়েছে। প্রতি বছরই টেকসই ও উচ্চফলনশীল জাত অবমুক্ত করা হচ্ছে। চাষি পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে এসব আমের জাত।
তিনি আরো বলেন, গত এক দশকে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক আম চাষের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনায় যাচ্ছেন চাষিরা। এর সুফলও মিলছে হাতেহাতেই। আমকে বৈরী আবহাওয়ার ফসল উল্লেখ করে এনিয়ে আতঙ্কিত হবার কারণ নেই বলেও জানান এই ফল গবেষক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, কয়েক বছর ধরেই দেশে আমের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে আমের উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১০ লাখ ১৮ হাজার টন। পরের অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ লাখ ৬১ হাজার ৬৮৫ টনে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদন হয় সাড়ে ১২ লাখ টন। তবে চলতি অর্থবছর তা ছাড়িয়ে যাবে ১৪ লাখ টন। এর মধ্যে রাজশাহীতেই তিন লাখ টনের উপর উৎপাদন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে আম উৎপাদন হচ্ছে প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হচ্ছে বৃহত্তর রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। গত ৭ বছরে এ অঞ্চলে আমের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। গত বছর এ অঞ্চলের ১৭ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। সেখানে উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৮১ হাজার ১০৭ টন। এর আগে ২০১৬ সালে রাজশাহীতে ১৬ হাজার ৫৮৩ হেক্টর জমিতে আমচাষ হয়। এর আগে ২০১৫ সালে ১৬ হাজার ৫৮৩ হেক্টর এবং ২০১৩ সালে ১৪ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রাজশাহীর আম যাচ্ছে বিশ্ববাজারে।

খবর কৃতজ্ঞতাঃ বাংলানিউজ২৪