জয়িতা সীমার জীবন জয়ের গল্প

রাজশাহী

rjh

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনো সমস্যা নয়, সাহস ও ইচ্ছা শক্তি প্রবল থাকলেই যেকোনো কাজ যে কারো পক্ষেই করা সম্ভব।’ কথাটি আরো একবার প্রমাণিত হয়েছে ফিরোজা আক্তার সীমার ক্ষেত্রে। জন্ম থেকে দুই হাত কুনই পর্যন্ত না থাকা মেয়েটি নিজের চেষ্টা চালিয়েছেন লেখাপড়া, লেখাপড়ার গণ্ডি পেরিয়ে পেয়েছেন সরকারি চাকরি।

শুধু তাই না, শিক্ষায় অবদান রাখায় রাজশাহীর তানোর উপজেলার হরিদেবপুর গ্রামের ফিরোজা খাতুন সীমা পেয়েছেন রাজশাহী বিভাগের শ্রেষ্ঠ জয়িতার সম্মাননা।

সীমার বাবা খলিলুর রহমান, মা মৃত মমতাজ বেগম। ১৯৮২ সালের ২২ নভেম্বর রাজশাহী জেলার, তানোর উপজেলার, হরিদেবপুর গ্রামে তার জন্ম।

পরিবারে চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সীমা তৃতীয়। জন্ম থেকেই তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী। দুই হাতের কুনই পর্যন্ত ছিল না সীমার। জন্মের পর বাবা মা তাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। পরিবারের কাছ থেকে গল্প শুনে ফিরোজা আক্তার সীমা জানান তার বেড়ে উঠার গল্প।

সীমা জানান, তিনি যখন জন্মগ্রহণ করে তখন তাকে নিয়ে অনেক চিন্তায় পড়ে যান তারা পরিবার। আশেপাশের গ্রাম থেকে অনেকেই আমাকে দেখতে এসেছে। তার জন্ম নিয়ে তার মাকে অনেক কথাই শুনতে হয়েছে। সবাই বলেছে এ রকম শিশু বাঁচিয়ে রাখলে ভবিষ্যতে অনেক কষ্ট হবে।

সীমা আরও জানান, জন্মের পর নাকি আমার নানার বাড়িতে আমার দাদার বাড়ি থেকে মায়ের কাছে সংবাদ পাঠায় যে, এ শিশুকে মুখে লবণ দিয়ে মেরে ফেলতে, না হলে আমার মাকে ও বাড়িতে নিয়ে যাবে না। তখন আমার নানী বাধা দিয়েছিল। তবে ওই মুহূর্তে আমার মায়ের পাশে ছিল আমার দাদা। সে আমাকে দেখতে গিয়ে বলেছে, যে যতো কিছুই বলুক না কেন? তাকে এ পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে কারণ তার মাধ্যমে হয়তো আল্লাহ আমাদের কঠিন পরীক্ষা করছে।

প্রত্যেক শিশুই জন্মগ্রহণ করলে সব বাবা-মা আনন্দিত হয় কিন্তু আমার বেলা ছিল একটু ভিন্ন চিত্র। আমার মা ২ মাস নানির বাড়িতে থাকার পর আমার দাদার বাড়িতে আসে এর মধ্যে আমার বাবা একটি বারের জন্যেও আমাকে দেখতে যায়নি এবং দীর্ঘ ৬ মাস আমার মায়ের সাথে কথা বলেননি। আমার মা আমাকে নিয়ে সব সময় কান্নাকাটি করতে করতে এক সময় চোখ নষ্ট হয়ে যাবার উপক্রম হয়েছিল। অনেক চিকিৎসার পরে মায়ের চোখ ভালো হয়। আমার বাবা কখনও আমার মাকে বলেনি এ শিশুকে মেরে ফেল তবে প্রতিবেশীদের কথায়, বন্ধুদের কথায় সব সময় আমার বাবার মন খারাপ থাকতো আর মন খারাপ হওয়াটাও স্বাভাবিক।

সীমা আরো বলেন, ‘আমার নাম আমার দাদা রাখে ফিরোজা আক্তার সীমা। কারণ ‘ফিরোজা’ নামের অর্থ নীলাভ মনি মুক্তা এবং ‘সীমা’ নামে অর্থ নিদর্শন। আমার দাদা বলে সত্যিই একদিন সীমা বড় হয়ে আমার পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য নীলাভ মনি মুক্তা এবং নিদর্শন হয়ে দেখা দিবে। আমি আমার চুল বাঁধা ছাড়া অপরের সহযোগিতা ছাড়াই ব্যক্তিগত সব কাজই করতে পারি। যা হোক আমি যখন বড় হতে থাকি তখন আমার দাদা আমার মাকে বলে বৌমা তোমার মেয়ের পায়ে পেন্সিল ধরিয়ে লেখার অভ্যাস করতে থাক দেখ সে লিখতে পারে কিনা? আমার দাদার কথা শুনে আমার মা ঠিক সেভাবে অগ্রসর হতে থাকে।

সর্ব প্রথমে মা আমার পায়ের আঙুলে পেন্সিল ধরিয়ে দিয়ে লেখার অভ্যাস করতে থাকে এবং পানি দিয়ে দাগ দিয়ে মা ‘ক’ লিখতো আমি সে ‘ক’ লিখার উপর পা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লেখা শিখতাম। যেদিন আমি ‘ক’ লিখা শিখেছি সেদিন আমার দাদা আমার মাকে বলেছে হ্যাঁ তোমার এ মেয়েকে দিয়ে পড়ালেখা করানো সম্ভব হবে। তুমি একটু বেশি সময় তার পেছনে দেবে এতে আমার সংসারের কাজ হোক বা না হোক তোমার দেখার বিষয় নেই। এভাবে আমার লেখার জীবন শুরু হয়।

যখন আমার স্কুলে যাবার বয়স হল তখন থেকেই আমি স্কুলে যেতে শুরু করলাম স্কুলে যাবার পর থেকে আমার মা চেষ্টা করতে লাগল হাত দিয়ে লেখানোর। আস্তে আস্তে আমি হাত দিয়ে লিখতে শুরু করলাম।

আমি যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম তখন একটি গ্রাম পেরিয়ে আমাকে স্কুলে যেতে হত এবং স্কুলে যাবার সময় গ্রামের লোকজন দল বেঁধে বের হত আমাকে দেখার জন্য এভাবে প্রতিদিনই একই চিত্র দেখা যেত এবং কিছু ছেলে মেয়ে ছিল যারা আমার প্রতিবন্ধিতার ধরণ নিয়ে অনেক রকমের বাজে বাজে কথা বলত একেক সময় মনে হত আর স্কুলে যাব না কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে হত না আমাকে আরও সামনে অনেক দূর যেতে হবে এ গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আমার মা আমাকে বলতো, তোমার পিছে ফিরে তাকানোর সময় নেই তুমি নিজেকে এমনভাবে তৈরি করবে যারা তোমাকে নিয়ে আমাকে তোমার বাবাকে বাজে কথা বলেছে তারা যেন তোমাকে দেখে অনুতপ্ত হয় তুমি সবার উদাহরণ হিসেবে গড়ে উঠবে।

এভাবে আমি প্রাথমিক স্কুল জীবন শেষ করে, ১৯৯৮ সালে তালন্দ আনন্দ মোহন উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসি দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হই, ২০০০ সালে তালন্দ ললিত মোহন ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হই। ২০০২ সালে তালন্দ ললিত মোহন ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হই এবং ২০০৪ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজ, রাজশাহী মনোবিজ্ঞান বিভাগ হতে এমএসসি শেষ করি। স্কুল জীবন থেকে শুরু করে এমএসসি পর্যন্ত প্রত্যেক শিক্ষক থেকে শুরু করে বন্ধু-বান্ধবী সবাই আমাকে খুব সহযোগিতা করতো। তাদের কাছ থেকে আমি কোনো রকম নেতিবাচক আচরণ পাইনি। পড়ালেখার ক্ষেত্রে আমার বাবা খরচ দিতে কখনও কার্পণ্য বোধ করেননি। তিনি আমার অন্য ভাই-বোনের মতোই আমাকে দেখতেন।

আমি এডিডির সঙ্গে যুক্ত হবার আগে নিজেকে মনে করতাম আমি মনে হয় এ পৃথিবীতে একা একজন ব্যক্তি। এ রকম আমার মতো মনে হয় আর কেউ নেই। আস্তে আস্তে আমার ধারণাও পরিবর্তন হতে লাগল। বড় বড় অনুষ্ঠানে যখন অনেক প্রতিবন্ধী একত্রিত হত তখন আমার মা-বাবাকে কয়েকটি অনুষ্ঠানে নিয়ে এসে দেখিয়েছি। কত রকমের প্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছে, শুধু তাদের মেয়েই প্রতিবন্ধী নয়। এ বিষয়টি আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি। আমার অনুষ্ঠান থেকে গিয়ে আমার মা-বাবা বলতো আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া আমার এ মেয়েকে আমি শিক্ষিত করতে পেরেছি।

আমার মা ২০০৮ সালের ২১ জুলাই আমাকে ছেড়ে চলে যায়। আমার মায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর কথা এখনও আমি ভুলতে পারি না। আমি ২০১০ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য অধিদপ্তরে পরীক্ষার মাধ্যমে উপ-খাদ্য পরিদর্শক পদে চাকরি পাই। বর্তমানে আমি সফলতার সঙ্গে চাকরি করছি।

সুত্রঃ বাংলামেইল২৪

Leave a Reply

Your email address will not be published.