টানা ৪৮ ঘন্টা গবেষণা করে যুবতীর আত্মহত্যা!

বিচিত্র
একটানা ৪৮ ঘন্টা ! গুগলে সার্চের পর সার্চ! আতিপাতি খুঁজে চলা, খ্যাপার পরশপাথর খোঁজার মতো করে। প্রতিটা ঘণ্টা, প্রতিটা সেকেন্ড হয়তো ঘোরে ঘোরেই কেটেছে, যে ঘোর কাটেনি শেষ শ্বাস পড়া ইস্তক! যে উদ্দেশে বিনিদ্র ‘গবেষণা’, শেষপর্যন্ত তা সম্পন্ন করেই মৃত্যুর পরের ঠিকানা খুঁজে নিয়েছেন ভারতের বেঙ্গালুরুর তরুণী। তেরো তলা ভবনের ওপর থেকে ঝাঁপ মেরে, জীবনে ইতি টেনেছেন। পুরোটাই সন্তর্পণে। এতটাই গোপনে খুঁজেছেন ‘মৃত্যুর সিঁড়ি’, কেউ টেরটিও পায়নি। স্বজন না, বন্ধু না।
মৃত্যুর আগে বুকের ভিতর তোলপাড়। উথালপাতাল সে স্রোতের কোনও ঢেউ ভাঙেনি বাইরে। জানত শুধু সর্বক্ষণের সঙ্গী স্মার্টফোনটা। গোটা ঘটনার নীরব সাক্ষী সেই। আর কোনও সুইসাইড নোট নেই। যা, আছে তা ওই সঙ্গীর সার্চে ধরা হিস্ট্রি! সেই ‘সার্চ-হিস্ট্রি’ই তদন্তকারীকে সাহায্য করেছে মৃত্যুর সূত্র সন্ধানে। নয়তো এটা যে আত্মহত্যাই, রহস্যজনক কোনও মৃত্যু বা খুন নয়, তাই বুঝে ওঠা দুষ্কর ছিল পুলিশের পক্ষে।
সুইসাইড আর নতুন কী! রোজ কত জনই তো কত ভাবে মরছে। কিন্তু, বেঙ্গালুরুর বছর ছাব্বিশের ফ্যাশন ডিজাইনার কাম ওয়েলনেস কনসালট্যান্ট ইশা হান্ডা মৃত্যুর আগে ৪৮ ঘণ্টা ধরে যে ভাবে নাগাড়ে গবেষণা চালিয়েছেন, অতীতে সে নজির নেই। How to commit suicide, Best method to do so- এমন অজস্র সার্চ। দড়ির ফাঁস? বিষ? আগুন?… পেন্ডুলামের মতো দোলাচল। খঁটিয়ে খঁটিয়ে কাটাছেঁড়া। শেষ পর্যন্ত, ইশার মনে হয়েছে বহুতলের উপর থেকে ঝাঁপই হতে পারে, নিশ্চিত মৃত্যুর সেরা উপায়।
ইশা হান্ডার স্মার্টফোনটি হাতে পেয়ে তাজ্জব বনে যান ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা। এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন আগে হতে হয়নি কখনও। মৃত্যুরহস্যের কিনারা করে ফেললেও, এ ভাবে গবেষণা করে মৃত্যু, তাঁদের মনেও দাগ কেটেছে।ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা জানান, জীবনের শেষের ৪৮ ঘণ্টায় ৮৯টা ওয়েবসাইট ঘেঁটেছেন ইশা। ২৯ অগস্ট সকালে স্মার্টফোন হাত সেই যে বসেছিলেন ইশা, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একটি বারের জন্যও ওঠেননি। একবার মনে হয়েছে ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিলে কেমন হয়, মনঃপুত হয়নি। পরক্ষণেই দেখেছেন বিষপান। তার পর মনে হয়েছে, যদি ঘুমের ওষুধ হয় বা গলায় দড়ির ফাঁস? ঘাঁটতে ঘাঁটতে একের পর এক ওয়েব পেজ। শেষে এসে থামেন বহুতল থেকে ঝাঁপে।

তদন্তকারীরা বলছেন, আত্মহত্যার প্রতিটা পেজ খুঁটিয়ে পড়েছেন এই তরুণী। বাঁচার সম্ভাবনা কতটা, দেখেছেন তা-ও। যখন ঝাঁপ দেবেন বলে মনঃস্থির করেন, তখন আবার অঙ্ক কষতে বসেন, শরীরের যা ওজন, তাতে ঠিক কত তলার ওপর থেকে ঝাঁপ দিলে, নিশ্তিত মৃত্যুই হবে। তেমন বিল্ডিংয়ের হদিশ পেয়ে, এগোন গবেষণার পরবর্তী ধাপে। ঝাঁপ মারবেন কী ভাবে? বেঙ্গালুরুর এই ফ্যাশন ডিজাইনার দেখেন, ১০তলা বিল্ডিং হলেই হবে। ঝাঁপ মারতে হবে মাথা নিচু করে। এরপর গবেষণার পাট চুকিয়ে, ট্যাক্সি ধরে বেরিয়ে পড়েন সেই বাড়ি খুঁজতে। সরজাপুর রোড হয়ে হরালুর রোড। খুঁজে বেড়ান বহুতল। ১৩ তলার যে বহুতলের ওপর থেকে শেষ পর্যন্ত ঝাঁপ মেরেছেন, তার আগে আরও দুটো বিল্ডিংও দেখেছেন বেঙ্গালুরুর এই তরুণী।

পুলিশ বলছে, ওই বিল্ডিংয়ে ওঠার আগে সাড়ে ৩টা ঘণ্টা তার আশপাশে এলোমলো ঘুরেছেন ইশা। কীভাবে সবার নজর এড়িয়ে উঠবেন, রক্ষীরা কোথায় আছে, কেউ আটকে দেবে কি না, এসবই ততক্ষণে দেখে নেন। তার আগে বিকেলে ৪টে নাগাদ যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন, বলে আসেন বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হবে। অপেক্ষা করেন, চারপাশের অন্ধকারের জন্য। এরপর সাড়ে আটটায় সেই তেরো তলা থেকে মরণঝাঁপ দেন তরুণী।
ইশা হান্ডার ব্যাগ থেকে ২৫০ গ্রাম মারিজুয়ানার প্যাকেট পেয়েছে পুলিশ। কিছু সাদা বড়িও পাওয়া গিয়েছে। পুলিশের ধারণা, আত্মহত্যা করার আগে মাদক নিয়েছিলেন ইশা। কারণ, পুলিশের কথায়, স্বাভাবিক অবস্থায় এভাবে কেউ ঠান্ডা মাথায় বহুতল থেকে ঝাঁপ মেরে আত্মহত্যা করতে পারেন না। যদিও, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এখনও হাতে পায়নি পুলিশ। ব্যাগ থেকে একটি দড়িও পাওয়া গিয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, শেষপর্যন্ত ঝাঁপ মারতে ব্যর্থ হলে, গলায় দড়ির ফাঁস দিয়েই আত্মহত্যা করবেন বলে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন ওই তরুণী।
কেন হঠাৎ এত ঘটানাটা করে আত্মহত্যা করতে গেলেন ওই তরুণী, তা পুলিশের কাছে রহস্যই। তবে, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা, ব্যক্তিগত কারণেই এই আত্মহত্যা। হতে পারে তা প্রেম। হতে পারে পারিবারিকও। তদন্ত চলেছে।
ঢাকাটাইমস