তিন মাস ধরে রাবির বাস বন্ধ: টিউশনির টাকা যাতায়াতেই শেষ!

রাজশাহী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

rbi

গত তিন মাস ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বাস বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া গাড়িভাড়া বাবদ বাড়তি টাকা ও সময় গুনতে হচ্ছে তাদের।

শিক্ষার্থীরা নগরীর বিভিন্ন স্থানে টিউশনি করে যে টাকা পাচ্ছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস বন্ধ থাকায় এর অর্ধেকেরও বেশি টাকা যাতায়াতে খরচ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতেও বাড়তি টাকা ও সময় লাগছে তাদের। তাই দ্রুত বাস চালুর দাবি শিক্ষার্থীদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী বাহারুল ইসলামকে সপ্তাহের ছয় দিনই যেতে হয় নগরীর লক্ষ্মীপুরে কোচিং করাতে। তাকে কোচিং থেকে দেওয়া হয় মাসে দুই হাজার পাঁচশ’ টাকা।

তিনি জানান, গত তিন মাস ধরে প্রতিদিন তাকে অটোরিকশায় করে কোচিংয়ে যেতে হয়েছে। এতে মাসে অন্তত এক হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অথচ আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে চলাচল করায় যাতায়াতের জন্য কোনো টাকা খরচ করতে হতো না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী নায়িম পারভেজকে লক্ষ্মীপুর ও কোর্ট এলাকায় টিউশনির জন্য প্রতিদিন যেতে হয়। এ জন্য প্রতি মাসে যাতায়াতের পেছনে তার অন্তত এক হাজার দুইশ’ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস চালু থাকলে এ বাড়তি খরচ তাকে করতে হতো না।

শাহ মখদুম হলের এই আবাসিক শিক্ষার্থী জানান, রাজশাহীতে টিউশন ফি অনেক কম। এক বা দুই হাজার টাকায় তাদের অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস বন্ধ থাকায় সেই কষ্টের টাকা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জাহাঙ্গীর আলমও সাহেব বাজার ও লক্ষ্মীপুরে নিয়মিত টিউশনি করান। টিউশনির টাকা দিয়ে তার শিক্ষাজীবন পরিচালনা করতে হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস বন্ধ থাকায় তাকে বাড়তি এক হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার রেনি থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মন্নুজান হলে। পড়াশোনা ও বিভিন্ন প্রয়োজনে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন তাকে যেতে হয় নগরীর সাহেব বাজারে। আগে বাস চালু থাকায় যাতায়াতের জন্য কোনো বাড়তি খরচ করতে হতো না। কিন্তু এখন তাকে হল থেকে কাজলায় রিকশায় যাতায়াত করতে প্রতিদিন ২০ টাকা এবং সেখান থেকে সাহেব বাজারে যাতায়াত করতে আরও ২০টাকা খরচ করতে হয়। এ সমস্যা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল রয়েছে ১৭টি। এ সব হলে ৩০ হাজারের মধ্যে ১০ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন ব্যবস্থা করা গেছে। বাকি শিক্ষার্থীদের সকলকেই ক্যাম্পাসের বাহিরে মেসে বা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে হয়। শিক্ষার্থীদের অনেকেই ক্যাম্পাসের ১০-১২ কিলোমিটার দূর থেকে গণপরিবহনে চেপে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন। এতে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ২০-৭০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। রিকশা কিংবা অটোরিকশায় ক্যাম্পাসে আসতেও গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ। বাস বন্ধ থাকায় বাড়তি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে শিক্ষকদেরও।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সজল ইসলাম জানান, প্রতিদিন বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে তাকে বাড়তি ৭০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। কিন্তু এরপরও কোনো কোনো ক্লাসে সঠিক সময়ে উপস্থিত হওয়া যায় না। তিনি দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস চালুর দাবি জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ভাড়াবাবদ কেটে নেওয়া হয় তিনশ’ টাকা। কোনো শিক্ষার্থী এক দিন বাসে না উঠলেও তাকে ওই টাকা দিতে হয়। এ হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এ খাতে একটি মোটা অংকের টাকা নিয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া শিক্ষকদের কাছ থেকেও মোটা অংকের টাকা নেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দফতর সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরে সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস চলাচল করেছে। গত তিন মাসে এক দিনও আর বাস চলেনি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট বাস রয়েছে ৩৫টি। আগে প্রতিদিন বাসগুলো চলাচলে অন্তত ৮০০ লিটার তেল খরচ হতো। এর মূল্য ধরা হয়েছে ৫০ হাজার টাকারও বেশি। সেই হিসাবে গত তিন মাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস বন্ধ থাকায় অন্তত ৪৫ লাখ টাকার তেল খরচ করতে হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জানুয়ারি মাসে কোনো বিভাগে ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। ৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হয়। ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগে স্বাভাবিক হতে থাকে ক্লাস-পরীক্ষা।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশনের সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সকল বিভাগে ক্লাস-পরীক্ষা চালু হয়। ক্লাস-পরীক্ষা চালু হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস চলাচল না করায় চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।

বাস চালুর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দফতরের প্রশাসক অধ্যাপক মো. সাইয়েদুজ্জামান জানান, হরতাল-অবরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস চলাচলের কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস চলাচল শুরু করলে তা ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। ক্ষতির আশঙ্কায় বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান জানান, বাস বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে- এ কথা সঠিক। বাস চলাচল করলে এবং তা যদি দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয় সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও সম্পদের ক্ষতির দায়ভার তো আমাদের ওপরে বর্তাবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই বাস চলাচল শুরু করা হচ্ছে না।

সুত্রঃ দ্য রিপোর্ট২৪

Leave a Reply

Your email address will not be published.