দাম কম হওয়ায় এবার চামড়া পাচারের শঙ্কা

রাজশাহী রাজশাহী বিভাগ

সরকার নির্ধারিত দাম কম হওয়ায় এবার কোরবানির পশুর চামড়া পাচারের আশঙ্কা করছেন সীমান্তবর্তী শহর রাজশাহীর ব্যবসায়ীরা। তবে সীমান্ত গলিয়ে কোনোভাবেই যেন চামড়া পাচার না হয় সেজন্য রাজশাহী জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী সীমান্ত এলাকাগুলোতে এরই মধ্যে চামড়া পাচারে সিন্ডিকেট গড়ে উঠছে। ফলে প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীরা এবার চামড়া কিনতে না পারার আশঙ্কা করছেন।

কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বছর জুড়েই চামড়া কেনাবেচায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে থাকেন তারা। অথচ শুধু কোরবানির ঈদে কমপক্ষে ২০ থেকে ২২ কোটি টাকার চামড়া কেনা-বেচা হয়। ওই টাকা ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে ঈদের আগে পাওয়া যায় না। ফলে ঈদে নতুন করে চামড়া কিনতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা যোগাড় করতে প্রতিবারই ভোগান্তিতে পড়েন তারা।

রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাদেকুর রহমান মাসুদ বলেন, ঈদে রাজশাহীতে প্রায় ৩০-৩৫ হাজার গরু, ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজারের মতো ছাগল, ৭০০-৮০০ মহিষ এবং প্রায় ৪ হাজারের মতো ভেড়া জবাই হতে পারে। এসব পশু জবাইয়ের পর চামড়া কেনা-বেচা হবে মাঠেই। যে চামড়া গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও ফড়িয়া ব্যবসায়ীরাই সংগ্রহ করবেন। এবারের ঈদে ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে চামড়া পাচার কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না।

তিনি বলেন, কোরবানির ঈদের আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চামড়া পাচার প্রতিরোধে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। তবে এবার ঈদের আগে সে ধরনের কোনো বৈঠক হয়নি। অবস্থা দেখে অনুমান করা যাচ্ছে, এবারও ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনতে পারেন না। তারা সন্ত্রাসী কায়দায় পাড়া-মহল্লায় ঢুকে গিয়ে সিন্ডিকেট করে চামড়া কিনে নেবেন এবারও।

ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা সরাসরি চামড়া কিনতে পারেন না। চড়া দামে চামড়া কিনে দেশের বাজারে বিক্রি করতে ব্যর্থ হন। এর ওপর সরকার নির্ধারিত চামড়ার দাম কম হওয়ায় পাইকারি ব্যবসায়ীরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ, ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা কখনও বর্গফুট মেপে চামড়া তা কেনেন না। অনুমাণনির্ভর আকারে চড়া দাম দিয়ে চামড়া কিনে নেন। যা আড়তে এসে বিক্রি করতে পারেন না। পরে গোপন স্থানে মজুদ করে সীমান্ত দিয়ে সুকৌশলে ভারতে পাচার করবেন। এর কোনো ব্যতিক্রম হবে না।

রাজশাহীর চামড়া ব্যবসায়ীদের এই নেতা জানান, বহিরাগত ব্যবসায়ীরা স্থানীয় কিছু এজেন্টের মাধ্যমে চামড়া সংগ্রহ করে অবৈধভাবে ভারতে পাচার করে থাকে। দেশি বাজারের চেয়ে ভারতে প্রতি বর্গফুটে ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা বেশি দাম পাওয়া যায়। তাই বেশি লাভের আশায় বর্তমানে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার বহিরাগত ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা আসতে থাকায় স্থানীয়রা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।

তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রাজশাহী-৩৭ ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর কামরুল হাসান জানান, পবিত্র ঈদ-উল আযহার পর সীমান্তপথ দিয়ে কোনোভাবেই চামড়া যেন পাচার না হতে পারে সেজন্য বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিটি বিওপিতে (বর্ডার আউট পোস্ট) ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাস্তায় যেসব বিজিবি চেকপোস্ট থাকবে তাদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় কোনো চামড়া পাচার হয় তাহলে সেগুলো আটকেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাজশাহীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী জানান, চামড়া পাচার রোধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকায় এবার বৈঠক করা হয়নি।

তবে মন্ত্রণালয়ের সকল নির্দেশনা বিজিবি, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে এরই মধ্যে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই যেন চামড়া পাচার না হয় সেজন্য সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

এছাড়া এলাকাভিত্তিক চামড়া কেনা-বেচা নিয়ে সহিংসতা এড়াতে ঈদের দিন বিশেষভাবে পুলিশ প্রশাসনকে সতর্ক থাকতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান রাজশাহীর জেলা প্রশাসক।

এবারও চামড়ার নির্ধারিত দাম গতবারের চেয়ে কম। ঘোষিত দাম অনুযায়ী এবার ঢাকায় কোরবানি হওয়া গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়া ৫০-৫৫ টাকা। ঢাকার বাইরে গরুর চামড়া ৪০-৪৫ টাকা। আর প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়া ২০-২২ টাকা, বকরির চামড়া ১৫-১৭ টাকা।

গত বছর ঢাকায় গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭০-৭৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৬০-৬৫ টাকা। খাসির চামড়া ৩০-৩৫ টাকা এবং বকরির চামড়া ২৫-৩০ টাকা।