নগরে আজ ভোট উৎসব

রাজশাহী

টানা ১৮ দিনের প্রাণান্ত প্রচার-প্রচারণা শেষে মাহেন্দ্রক্ষণের দিন আজ সোমবার। আজ রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচন। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজশাহী এখন উদ্বেলিত। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এখন রাজশাহীবাসী অপেক্ষার প্রহর গুনছেন নতুন নগর পিতা নির্বাচনের জন্য। তাই শেষবারের মত জয়-পরাজয়ের হিসেব কষছেন প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র, কাউন্সিলর, নারী কাউন্সিলর ও তাদের লাখো সমর্থক।

রাজশাহী সিটির ইতিহাসে আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পঞ্চমবারের মতো নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাই একদিন আগে থেকেই নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা পড়েছে নগরী। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে পাঁচস্তরের নিরাপত্তা বলয়। পুলিশের পাশাপাশি নগরীতে টহল দিচ্ছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। শনিবার মধ্যরাত থেকেই নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে ৩০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নেমেছেন। তারা আচরণবিধি মনিটরিং করছেন। এছাড়া সংরক্ষিত ১০টি আসনের জন্য রয়েছেন আরো ১০জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণের জন্য নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আরএমপি কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার।

রবিবার সকাল থেকে নগরীর প্রবেশ পথ কাশিয়াডাঙ্গা বাইপাস সড়ক, নওদাপাড়া ও অক্ট্রয় মাড়ে বসানো হয়েছে অস্থায়ী চেকপোস্ট। নগরীর মধ্যে শাহমখদুম থানার মোড়, গৌরহাঙ্গা রেলগেট, সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট, কল্পনা হলের মোড়, লক্ষীপুর মোড়, সদর হাসপাতালের মোড়, আদালত চত্বরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোবাইল চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহনে ব্যাপক তল্লাশি করা হয়। কাউকে সন্দেহ হলে দেহ তল্লাশি করা হচ্ছে।

এবার রাজশাহী সিটি নির্বাচনে মোট ১৩৮টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ করা হবে। এরমধ্যে ১১৪ টি গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে এরইমধ্যে শনাক্ত করেছে পুলিশ প্রশাসন। এবার একই ভেন্যুতে দুটি ইভিএম কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। নগরীর ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বিবি হিন্দু একাডেমী কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ হবে ইভিএম-এ।
এবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী মির্জাপুর, তালাইমারী, বিনোদপুর, মেহেরচণ্ডী, নওদাপাড়া, শালবাগান, লক্ষ্মীপুর, মহিষবাথান, ভাটাপাড়া, হেতেম খাঁ, কাদিরগঞ্জসহ বেশ কিছু এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যই এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন, রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা সৈয়দ আমিরুল ইসলাম।

এদিকে রবিবার সকাল থেকে নগরীর গভ. ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে স্থাপিত অস্থায়ী নির্বাচন অফিস থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ব্যালটবাক্স, ব্যালট পেপার ও নির্বাচন সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে কেন্দ্রে কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন প্রিজাইডিং অফিসার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার জানান, গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে সশস্ত্র আনসার সদস্যসহ নিয়মিত ফোর্স ছাড়াও অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে র‌্যাব-পুলিশের পৃথক মোবাইল টিম কাজ করছে বলে জানান তিনি।

তিনি জানান, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি’র স্ট্রাইকিং ফোর্স রিজার্ভ রয়েছে। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রস্তুত। কোনো কেন্দ্রে গোলযোগ দেখা দিলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নগরীতে সব মিলিয়ে সাত হাজারের বেশী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত রয়েছে।
রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা সৈয়দ আমিরুল ইসলাম জানান, আবহাওয়া ভালো থাকলে ৯০ ভাগের বেশী ভোট কাস্ট হওয়ার আশা রয়েছে। তবে বৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক দর্যোগ হলে ভোটারের উপস্থিতি কিছুটা কমে যেতে পারে। তবে ভোটগ্রহণ কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না উল্লেখ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, রাজশাহী সিটি নির্বাচনে এবার মোট ২১৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরমধ্যে মেয়র পদে ৫ জন, ৩০ টি সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে ১৬০ জন ও সংরক্ষিত ১০টি ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর পদে ৫২ জন ভোটযুদ্ধে নেমেছেন।
নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ লিটনের: এদিকে নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিবেন উল্লেখ করে বলেন অন্তত ৭০ হাজার ভোটের ব্যবধানে তিনি জয়লাভ করবেন।
ফের বুলবুলের অভিযোগ: রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ফের এজেন্ট এবং নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের অভিযোগ করেছেন। ভোটের আগের দিন রবিবার দুপুর ১২টার পর নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার দফতরে গিয়ে লিখিত এ অভিযোগ দেন বুলবুল।

ভোট শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভোটার, পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং গ্রেফতার বন্ধের আবেদনও জানান তিনি। এর আগে নির্বাচন দফতরে ২১টি লিখিত অভিযোগ দেন ধানের শীষ প্রতীকের এই প্রার্থী। তিনি বলেন, আমরা সকল নির্যাতন-জুলুম সহ্য করে এখন পর্যন্ত নির্বাচনে আছি। কিন্তু সব কিছুরই সীমা থাকা উচিত। প্রশাসন-পুলিশ যেভাবে আওয়ামী লীগের মতো কাজ করছে, তাতে নির্বাচন পরিস্থিতি সুষ্ঠু নয়। প্রয়োজনে ভোটের দিন মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে মাঠে নামবো আমরা।
জয়-পরাজয়ের নতুন হিসেব: রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন এবং বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের মধ্যে শেষ পর্যন্ত মূল লড়াই হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভোটাররা।

সাধারণ মানুষ বলছেন, নির্বাচনী ফলাফলে দুজনের অবস্থান একেবারেই সমান্তরাল না হলেও অল্প ভোটের ব্যবধানেই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে। তাই উভয় প্রার্থীর সমর্থকরা ভোটের আগের দিন নিজ নিজ প্রার্থীর জয়ের ব্যাপারে আশা ব্যক্ত করেছেন।
এবারের রাসিক নির্বাচনে ৩ লাখ ১৮ হাজার ১৩৮ ভোটারের মধ্যে এক লাখ ৫৬ হাজার ৮৫ জন পুরুষ এবং এক লাখ ৬২ হাজার ৫৩ জন নারী। এবারের নির্বাচনকে বিশ্লেষণ করে ‘লিটন ও বুলবুলের মধ্যে মূল লড়াই’ হবে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটার ও বিশ্লেষকরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত টার্মে (২০০৮-২০১৩) মেয়র থাকাকালীন এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড আর বুলবুলের শেষ টার্মে (২০১৩-২০১৮) উন্নয়ন বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভোটাররা উন্নয়নের পক্ষেই রায় দেবেন। লিটনের বিগত উন্নয়ন এবারের নির্বাচনে ‘প্রভাব’ ফেলবে বলেও মনে করছেন নগরবাসী।
অনেকে বলছেন লিটনের টার্মের পাঁচ বছরের উন্নয়ন কার্যক্রমসহ তরুণ ও নারী ভোটাররা এবারের নির্বাচনে ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। কারণ মানুষ অনেক সচেতন। সব কিছু বিবেচনা করেই তারা ভোট দেবেন।

রাজশাহী সদর আসনের এমপি ও ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, লিটনের পক্ষেই ভোট দেবে জনগণ। তার যুক্তি, রাজশাহীর দৃশ্যমান উন্নয়ন এবং লিটনের কার্যক্রম মূল্যায়ন করেই জনগণ ভোট দেবে। এছাড়া তরুণ প্রজন্ম ও নারী ভোটাররা লিটনের পক্ষে ভোটের ব্যবধান গড়ে দেবে।
প্রসঙ্গত, এবারেই প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক মনোনয়ন ও দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে। নৌকা প্রতীকে লড়ছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন আর ধানের শীষে লড়ছেন বিএনপির মনোনীত মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। অপর তিন প্রার্থীর মধ্যে বাংলাদেশ ইসলামী অন্দোলনের শফিকুল ইসলাম লড়ছেন হাতপাখা নিয়ে। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী মুরাদ মোর্শেদের প্রতীক হাতি এবং অপর প্রার্থী হাবিবুল রহমানের প্রতীক কাঠাল।

খবর কৃতজ্ঞতাঃ ডেইলি সানশাইন