নজরুলের স্কুলজীবন

সাহিত্য

কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বিশ্বের সেই শিক্ষিত শ্রেষ্ঠদের একজন, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও, প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট বা ডিগ্রিহীন। সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি তিনি সহজেই অর্জন করতে পারতেন, তার ছাত্রজীবনের রেকর্ড, ফলাফল ও শিক্ষক সহপাঠীদের ভাষ্য থেকে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। কিন্তু কিছুটা অভাব ও কিছুটা স্বভাব তাড়নায় তৎকালীন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার ক’মাস আগেই ‘বিঘ্নিত ছাত্রজীবনের’ ও প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে তিনি যোগ দেন সেনাবাহিনীতে- ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে। সেখানে ও পরবর্তীকালে বিভিন্ন স্থানে অবস্থানে অব্যবস্থানে থেকেও তিনি ব্যক্তিগত আগ্রহে অধ্যয়ন করে ও বিভিন্নজনের কাছে শিখে বা তালিম নিয়ে শিক্ষিত শ্রেষ্ঠদের একজন হয়ে ওঠেন। চিন্তায়, কর্মে, আদর্শে ও সৃষ্টিশীলতায় উত্তরকালে তিনি পরিণত হন একটি প্রতিষ্ঠানে- ইনস্টিটিউশনে এবং পরম গৌরবে অধিষ্ঠিত হন দেশের জাতীয় কবির সুমহান মর্যাদার স্বর্ণাসনে।

কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত মুসলিম পরিবারে- বাপ-চাচারা সবাই ছিলেন শিক্ষিত; শিক্ষাদান কাজেও জড়িত ছিলেন তারা। তাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন ‘কাজী’, অর্থাৎ বিচারক। সেই পূর্বপুরুষের রক্তধারা তার মধ্যেও প্রবহমান ছিল।
নজরুলের শিক্ষার শুরু পরিবারে বাবার কাছে। বাবা কাজী ফকির আহমদ (মৃত্যু-১৯০৮) ছেলের শিক্ষার প্রতি বেশ গুরুত্ব দিতেন। সেই বাল্যকালেই তিনি তাকে ভর্তি করিয়ে দেন বেনেপাড়ায় স্থানীয় পাঠশালা বিনোদ চাটুর্জের পাঠশালায়। কিন্তু অল্প ক’দিন পরেই তাকে সেখান থেকে নিয়ে এসে ভর্তি করান মক্তবে। বিনোদ চাটুর্জের পাঠশালায় নজরুল বেশি দিন পড়েননি। মক্তবে না পড়িয়ে বেলপাড়ার পাঠশালায় পড়ানোর কারণে হয়তো ফকির আহমদ সমালোচিত হন, অথবা বিনোদ বাবুর পাঠশালা আর টিকবে না এটি বুঝে ফকির আহমদ নজরুলকে ওখান থেকে এনে মক্তবে ভর্তি করান। উল্লেখ্য, কিছু দিন পরে ওই পাঠশালাটি উঠে যায়।

নজরুল মক্তবে আরবি-ফার্সি ভালোভাবে শিক্ষার সুযোগ পান। এখানে তিনি কুরআন শরিফ পড়েন ও কুরআনের শেষ অংশ ‘আমপারা’ মুখস্থ করেন। স্মর্তব্য, পরবর্তী কবি জীবনে ‘কাব্য আমপারা’ নামে ওই আমপারা বাংলায় কাব্যানুবাদ করেন। মক্তবের শিক্ষক ছিলেন তার চাচা কাজী ফজলে আহমেদ, যিনি শিক্ষাদানে অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন।

এ মক্তবের পাঠ্য বিষয় ছিল আরবি-ফার্সি-বর্ণ পরিচয়, কায়দা-আমপারা, কুরআন শরিফ, ফার্সি কিতাব পাঠ শিক্ষা, নামাজ শিক্ষা। এতদ্ব্যতীত আদব-কায়দা শিক্ষা ও ইসলামি রীতিনীতি-অনুশাসনাদিও শিক্ষা দেয়া হতো। নজরুল এ মক্তব্যে এসব শিক্ষা ভালোভাবে রফত করেন।
১৯০৯ সালে নজরুল মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় পাস করেন। সেকালে গ্রামীণ সমাজে এ পর্যন্ত ছিল সাধারণ লেখাপড়ার ধাপ। প্রচলতি বর্ণনানুসারে মক্তব পাস করার পর তিনি কিছুদিন ওই মক্তবে শিক্ষকতা করেন এবং একই সাথে বাবার অবর্তমানে পার্শ্ববর্তী মসজিদ ও মাজারে খাদেম হিসেবে কাজ করেন। এতে যে সামান্য আয় হতো তা দিয়ে তার মা ও ভাইদের সহযোগিতা করতেন।

মক্তবের শিক্ষা নজরুলের প্রতিভার উন্মেষে বিশেষ সহায়ক হয়, ‘বাবার মৃত্যুজনিত বেদনা, ধর্মীয় উপলব্ধি ও শিক্ষা নজরুলের মনে এমন এক শক্তি সঞ্চার করল যে, তিনি যেকোনো মনোভাব কবিতার আকারে রূপ দেয়ার দক্ষতা অর্জন করলেন।’
মক্তবের শিক্ষকতা ও মসজিদ-মাজারের খাদেমগিরিতে তিনি বেশি দিন থাকেননি। এসব গৎবাঁধা কাজ যেন তার নয়। তাই অল্প সময় পর সুযোগ বুঝে তিনি এসব ছেড়ে চলে যান, যোগ দেন লেটো দলে। তার আরেক চাচা কাজী বজলে করিমের হাত ধরে লেটো দলে ঢোকেন, তার কাছে লেটো গান ও গানের আসরে লড়বার তালিম নেন। এরপর তিনি বিভিন্ন লেটো দলে যোগ দেন এবং তাতে কিছু অর্থও আসে।

লেটো দলেও তিনি বেশি দিন থাকেননি, হয়তো বছরখানেক ছিলেন। এরপর তিনি আবার স্কুলে লেখাপড়ায় আগ্রহী হন। সম্ভবত ১৯১১ সালে তিনি বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট থানার মাথরুন গ্রামে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউটে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ওই স্কুলে ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক (১৮৭৩-১৯৭০)। তিনি স্মৃতিচারণায় ওই স্কুলে নজরুলের আদব-কায়দা ও সুন্দর আচার ব্যবহারের বর্ণনা দিয়েছেন। ষষ্ঠ শ্রেণীর পাঠ শেষ করে নজরুল এ স্কুল ত্যাগ করেন, শুরু করেন ভবঘুরে জীবন। একপর্যায়ে ফের লেটো দলে যোগদান করেন। কিছু দিন পর লেটো দল ছেড়ে এক রেলওয়ে গার্ডের স্টাফ হয়ে কাজ করেন। তাও করেন খুব অল্প সময়ের জন্য। পরে কাজ নেন রুটির দোকানে। এখানে কাজ করার একপর্যায়ে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর কাজী রফিজ উল্লাহর সদয় দৃষ্টিতে পড়েন। তিনি নজরুলের মুখে জীবনবৃত্তান্ত শুনে লেখাপড়ার জন্য ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার (বর্তমানে উপজেলা) কাজীরশিমলা গ্রামের নিজ বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। কাজী রফিজের বড় ভাই কাজী সাকায়াত উল্লাহ নজরুলকে পাঁচ-ছয় মাইল দূরবর্তী দরিরামপুর হাইস্কুলে (১৯১৩) সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে দেন। এ সময় একই সাথে ভর্তি হলেন কাজী রফিজের ছোট ভাই কাজী আবুল হোসেন, ভাই পো কাজী তালেবুর রহমান প্রমুখ। এখানে নজরুল কিছু দিন কাজী রফিজের বাড়িতে থেকে স্কুলে যাওয়া-আসা করতেন। পরে তিনি ত্রিশালের বিভিন্ন বাড়িতে জায়গির থাকার ব্যবস্থা করেন।

নবপ্রতিষ্ঠিত সেই দরিরামপুর হাইস্কুলে নজরুলের শিক্ষা গ্রহণ ও প্রতিভা বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ ছিল। সেকালের নিয়মানুসারে ওই স্কুলেও নিয়মিত বিতর্ক অনুষ্ঠান, নাটক অভিনয়, কবিতা, আবৃত্তি, রচনা ও সঙ্গীত প্রতিযোগিতা প্রভৃতি সহপাঠ্য কার্যক্রম চলত। নজরুল তাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন এবং প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হতেন। জানা যায়, একবার তিনি হজরত মোহাম্মদ সা:-এর জীবনী লিখে ও পাঠ করে, রবীন্দ্রনাথের ‘পুরাতন ভৃত্য’, ‘দুই বিঘা জমি’ আবৃত্তি করে ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘সাজাহান’ নাটকে অভিনয় করে প্রশংসিত হন। এ সুন্দর পরিবেশেও নজরুল থাকলেন না, মাত্র এক বছর পড়ে বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে বড়দিনের ২৫ ডিসেম্বর ১৯১৪ বন্ধে সেই যে ত্রিশাল ত্যাগ করলেন আর ফিরে আসেননি।
ত্রিশাল থেকে চলে যান বর্ধমানে। সেখানে তিনি ‘নিউ স্কুল’ নামে পরিচিত ‘অ্যালবার্ট ভিক্টোর ইনস্টিটিউটে’ ভর্তি হন বলে কেউ কেউ ধারণা করেন। তবে ভর্তি হলেও অচিরেই তিনি এ স্কুল ছেড়ে দেন।

১৯১৫ সালে তিনি ভর্তি হন সিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলে- অষ্টম শ্রেণীতে। এ স্কুলে তার বেতন মওকুফ হয়, স্কুলের মুসলমান ছাত্রদের বোর্ডিং-মোহামেডান বোর্ডিংয়ে ফ্রি থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়; উপরন্তু তার জন্য পাঁচ টাকা মাসিক বৃত্তিরও ব্যবস্থা হয়। বৃত্তিটি সম্ভবত পরের বছর পরের ক্লাসে মেধার ভিত্তিতে দেয়া হয়। জানা যায়, তিনি বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম বা দ্বিতীয় হতেন, ১৯১৭ সালের ২ মে (বুধবার) তারিখের স্কুল ম্যানেজিং কমিটির রেজুলিউশন থেকে জানা যায়, সহপাঠী জ্যোতিষচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সাথে নজরুলকেও পাঁচ টাকা হারে বৃত্তি দেয়া হয়।
এ স্কুলে তার কবি-প্রতিভা স্ফুরণে, জ্ঞান-শিক্ষা গ্রহণে ও বিকাশে এবং প্রাগ্রসর চেতনা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন ‘দুর্লভ ব্যক্তিত্বের অধিকারী’ প্রধানশিক্ষক নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘আদর্শ শিক্ষক’ সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল ও ‘বিপ্লবী শিক্ষক’ নিবারণচন্দ্র ঘটক প্রমুখ। প্রধানশিক্ষক নগেন্দ্রনাথ তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। সতীশচন্দ্র তার কাব্য প্রতিভা স্ফুরণে উৎসাহিত করেন, তিনিই তাকে হিন্দু পুরাণ শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করেন, গানের তালিম দেন- বিষ্ণুপুরী ঘরানা ও ধ্রুপদী গান শেখান; আর নিবারণচন্দ্র তাকে স্বদেশ প্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত করেন। এ নিবারণচন্দ্র নিজে ছিলেন বিপ্লবী দলের সদস্য। এ ছাড়া, ফার্সি শিক্ষক হাফিজ নূরনবীর সাহিত্যিক খ্যাতি তাকে অনুপ্রাণিত করে। উল্লেখ্য, হাফিজ নূরনবী তখন উর্দু সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতিমান। তিনি নজরুলকে সংস্কৃত থেকে ছাড়িয়ে ফার্সিতে যুক্ত করেন। ফার্সির আরেকজন শিক্ষক ছিলেন, তার নাম আবদুল গফুর।
এ স্কুলে পড়াকালে প্রায় দুই মাইল দূরের রানীগঞ্জ হাইস্কুলের একই শ্রেণীর ছাত্র শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সাথে নজরুলের পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। দুইজনই সে সময়ে লেখালেখির কসরত করেন।
এ সিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলই নজরুলের ছাত্রজীবনের শ্রেষ্ঠ স্কুল- শেষ স্কুল। এখানে তিনি দশম শ্রেণী পর্যন্ত ১৯১৭ সাল অবধি লেখাপড়া করেন। প্রিটেস্ট বা টেস্ট পরীক্ষা সামনে রেখে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টেনে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন।
সিয়ারশোল স্কুলে পড়ার সময়ে তিনি বেশ কিছু কবিতা লেখেন; যেমন- ‘চড়ুই পাখির ছানা’, ‘রাজার গড়’, ‘রানীর গড়’ প্রভৃতি। এ সময়ে এ স্কুলের দুইজন শিক্ষক ভোলানাথ স্বর্ণকার বি.এ ও হরিহর মিশ্র বি.এ বিদায় নেন। এ বিদায় উপলক্ষে বিদায় অভিনন্দন লেখার দায়িত্ব পড়ে নজরুলের ওপর। তিনি সে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভোলানাথের উদ্দেশে লেখেন ‘করুণ গাথা’ ও হরিহরের উদ্দেশে লেখেন ‘করুণ বেহাগ’। প্রচলিত প্রথা ভেঙে তিনি এ অভিনন্দন পত্র পদ্যে লেখেন এবং কৌশলে লেখক হিসেবে নিজের নামও অন্তর্ভুক্ত করেন।
এ স্কুলে ইংরেজি রচনা প্রতিযোগিতা হতো। নজরুল যথারীতি তাতে অংশগ্রহণ করতেন। এক প্রতিযোগিতায় ‘খড়ুধষঃু’ নামক রচনা লিখে তিনি প্রথমজনের চেয়ে মাত্র এক নম্বর কম পান। এতে এক নম্বর বেশি পেয়ে প্রথম হন সিয়ারশোল রাজবাহাদুরের দৌহিত্র পঞ্জু মালিয়াহ; পড়েন দশম শ্রেণীতে। নজরুল তখন নবম শ্রেণীতে। এ শ্রেণীতে থাকাকালে নজরুল ‘ঠঁষঃঁৎব’ নামে প্রতিযোগিতার জন্য একটি রচনা লেখেন। চৌদ্দ পাতার এ রচনাটির এক স্থান ছাড়া অন্য কোনো স্থানে কালির আঁচড় পড়েনি বলে শোনা যায়। এ রচনাটির জন্যই অন্যদের সাথে তিনিও চার টাকার এজলি (ঊফমরষু) পুরস্কার পান।

বাংলায় নজরুল অসাধারণ ব্যুৎপন্ন ছিলেন। তার সহপাঠী জ্যোতিষচন্দ্র বলেছেন,
নজরুলের বাংলা প্রবন্ধ আমাদের কাছে টেক্সট বলে মনে হতো। তিনি বাংলায় বরাবর সর্বোচ্চ নম্বর পেতেন। তিনি যে বাংলায় কত ভালো ছিলেন ওই স্কুলের শিক্ষক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জবানী থেকে শোনা ভাষ্য থেকেও বোঝা যায়, ‘বাংলার ক্লাস। এক দিন নজরুল ক্লাসে শিক্ষককে বলেন- স্যার, আপনি শুনুন আমি পড়াচ্ছি। দেখুন তো ঠিক পড়াতে পারি কি না। নজরুল বাংলা পড়ালেন। প্রবীণ শিক্ষক মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে গেলেন। তার চমৎকার পড়ানোর কায়দা দেখে শিক্ষক অভিভূত। বাংলার ব্যুৎপত্তি দেখে বিস্মিত। এ যেন অর্জুনের কাছে দ্রোণের পরাজয় মানতে সাধ হয়। ছাত্রবৎসল শিক্ষক বলেছিলেন, নজরুলের পড়ানো দেখে মনে হয়েছিল- তার কাছে ছাত্র হয়ে পড়তে ইচ্ছে করে।’

কোনো কোনো লেখক (?) যে বলেছেন, নজরুল ক্লাসে উদাসীন বা অঙ্কের খাতায় কবিতা লিখতেন। এখন বোঝা যাচ্ছে এসব একেবারেই গালগল্প, কল্পনাপ্রসূত অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তথাকথিত ভালো ছাত্রের মতো হয়তো তিনি ধীরস্থির ছিলেন না ও বাঁধা ধরা নিয়ম মেনে চলতেন না। এ ছিল তার জন্মবৈশিষ্ট্য। তিনি মেধাবী না হলে, পরীক্ষার খাতায় কবিতা লিখে জমা দিলে বা পরীক্ষায় খারাপ করলে তিনি তো পরবর্তী শ্রেণীতে উঠতে পারতেন না। স্মর্তব্য, সেকালে বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করলে পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ করা হতো না; আর নজরুলের তো কোনো অভিভাবকও ছিলেন না যে তার জন্য সুপারিশ করবেন। তদুপরি, ফ্রি স্টুডেন্টশিপ, হোস্টেলে ফ্রি থাকা, ফ্রি খাওয়া, প্রাইজ পাওয়া, আবার মাসিক বৃত্তি পাওয়া- এসব তো এক্সিলেন্ট রেজাল্টের কারণেই জোটে, নাম থাকতে হয় মেধা তালিকার একেবারে প্রথম দু’তিনজনের মধ্যে, দারিদ্র্যের বিবেচনা তো পরে। সিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক নগেন্দ্রনাথ ও বিদ্যোৎসাহী বিশ্বেশ্বর মালিয়াহ রাজা কৃতী ছাত্রদের জন্য থাকা খাওয়ার সুবিধা ছাড়াও বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। উল্লেখ করেছি পূর্বেই যে, নজরুল এ স্কুলে এ ধরনের সুযোগ ভোগ করেছেন। আরো একটি বিষয় লক্ষ্য করার যে, তৎকালে হিন্দু প্রতিষ্ঠিত পরিচালিত এসব স্কুলে ও হিন্দু শিক্ষিত পরিবারের মেধাবী ছেলেদের সাথে প্রতিযোগিতা করে ক্লাসে বা সহপাঠ্য কার্যক্রমে নজরুলের মতো উদ্বাস্তু ও মুসলমান ছেলের প্রথম বা দ্বিতীয় স্থানাদি দখল করা ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়া নিশ্চয়ই অসাধারণ মেধার কারণেই সম্ভব হয়েছে। যেমন সিয়ারশোল হাইস্কুলে নবম-দশম শ্রেণীতে নজরুলের সমকক্ষ প্রতিযোগী ছিলেন জ্যোতিষচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও গৌরীশঙ্কর রায়। তারা দুজনই ১৯১৮ সালে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন ও ইংরেজিতে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় পাঁচ টাকা করে স্কলারশিপ পান। নজরুলের পক্ষেও ওই স্কলারশিপ পাওয়া হয়তো সম্ভব হতো, তার সহপাঠী গৌরীশঙ্কর রায় তেমনটিই ইঙ্গিত করেছেন, ‘নজরুল তো পরীক্ষার আগেই যুদ্ধে চলে গেল। না-গেলে ঐ বৃত্তির প্রাপক কে হতো বলতে পারি না।’

ছাত্র হিসেবে স্কুলে নজরুলের অবস্থান ও পল্টনে যাওয়া প্রসঙ্গে তার নিজের উক্তি এবার মিলিয়ে নেয়া যাক, ‘ক্লাসে ছিলাম আমি ফার্স্ট বয়। হেড মাস্টারের বড় আশা ছিল- আমি স্কুলের গৌরব বাড়াব, কিন্তু এ সময় এলো ইউরোপের মহাযুদ্ধ। এক দিন দেখলাম, এ দেশ থেকে লোক পল্টনে যাচ্ছে যুদ্ধে। আমিও যোগ দিলাম এই পল্টন দলে।’
ওই পল্টনে ও পরবর্তীকালে নজরুল নিজে নিজে পড়েছেন অনেক, অন্যের কাছ থেকেও শিখেছেন প্রয়োজনে। তার কবিতায়, গানে, ভাষণ প্রতিভাষণে, প্রবন্ধে, পত্রে এবং তার সম্পর্কে অন্যদের স্মৃতিচারণায় রয়েছে তার পঠন-পাঠনের প্রমাণ।