নিরাপত্তাহীনতায় রাবি শিক্ষকরা

ক্যাম্পাসের খবর রাজশাহী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

অধ্যাপক এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে গত শনিবার সকালে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্রগতিশীল শিক্ষকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

গত এক বছরে মুঠোফোন, টেলিফোন ও চিঠির মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৭ জন শিক্ষক হত্যার হুমকি পেয়েছেন। তাদের মধ্যে এখন রীতিমতো শঙ্কা কাজ করছে। স্বাভাবিক জীবনযাপনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অনেকের। এ কারণেই ঠিকমতো শিক্ষা ও গবেষণা কাজ চালিয়ে যেতে পারছেন না।

হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস আগে অধ্যাপক রেজাউল করিমও এমন হুমকি পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তারই সহকর্মী অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ। অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে হত্যার পর এখন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন হুমকি পাওয়া প্রগতিশীল অন্য শিক্ষকরা। শঙ্কার মধ্যে থাকা শিক্ষকদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন ও কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকসহ প্রগতিশীল শিক্ষকরা রয়েছেন।

বিভিন্ন সময় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন অথবা চরমপন্থি দলের পরিচয় দিয়ে ওই শিক্ষকদের হুমকি দেয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময় হুমকির ঘটনায় শিক্ষকরা থানায় গিয়ে নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরি করলেও পুলিশ তেমন গুরুত্ব দেয়নি। এতে করে অপরাধীরা আরও বেশি উৎসাহী হচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা।

কথা সাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘কী পরিমাণ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, তার কোনো পরিমাপক নেই। প্রতিটি মানুষ তার নিরাপত্তা নিয়ে এখন চিন্তাগ্রস্ত। কীভাবে চললে এ ধরনের হামলা থেকে মুক্তি পাবেন তা তারা বলতে পারছেন না।’

প্রক্টর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক একেএম গোলাম রব্বানী মণ্ডল ও দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শরমীন হামীদকে তাদের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে গত বছরের ৫ মার্চ একই মুঠোফোন নম্বর (০১৯৫২৯৫৬৭৬৫) থেকে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেয়া হয়। রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. আজাহার আলীকে ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’ পরিচয় দিয়ে গত ৬ মার্চ বাংলালিংক নম্বর (০১৯৫২৯৫৬৭৬৫) থেকে ব্যক্তিগত মুঠোফোনে হুমকি দেয়া হয়। একই মুঠোফোন নম্বর থেকে ওই দিনই রসায়ন বিভাগের অপর অধ্যাপক মো.আখতার ফারুককে ‘চরমপন্থি গ্রুপের নেতা’ পরিচয় দিয়ে হুমকি দেয়া হয়। পরে ১০ মার্চ ‘লাল বাহিনী’ ২৭ নভেম্বর ‘সর্বহারা পার্টি’ পরিচয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মো. আবুল কাশেমকে হুমকি দেয়া হয়। দ্বিতীয়বার হুমকি পাওয়ার পর তিনি মতিহার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। ১৬ মার্চ বাংলালিংক নম্বর (০১৯৮৪৩৬৮৮৭৩) থেকে ‘লাল বাহিনী’ পরিচয়ে নিজস্ব মুঠোফোনে হুমকি পান দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। এ ঘটনার পরদিনই তিনি মতিহার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মজুমদারকে গত বছরের ২১ মার্চ দুটি মুঠোফোন নম্বর (০১৯৪৮০৬৩৩১৭ ও ০১৯৫৭৭৭৭০২৭) থেকে এবং ২২ মার্চ একই বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম সেলিম রেজাকে বাংলালিংক (০১৯১০৪২৫৮৩৭) নম্বর থেকে ‘লাল বাহিনী’ পরিচয়ে হুমকি দেয়া হয়। একইদিন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাসকে মুঠোফোন নম্বর (০১৯৮৫৭৮৬৪৪১) থেকে ‘পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’ পরিচয়ে টাকা চেয়ে হুমকি দেয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি মতিহার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন।

একই বছরের ২৩ মার্চ সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফয়েজার রহমানকে ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’ পরিচয়ে মুঠোফোন (০১৬২৩৮১৮৬৩৬) নম্বর থেকে টাকা চেয়ে হুমকি দেয়া হয়। ১০ জুলাই কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের প্রশাসক ও বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সফিকুন্নবী সামাদীকে মুঠোফোনে ‘জনযুদ্ধের কমান্ডার মেজর জিয়া’ পরিচয় দিয়ে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেয়া হয়। এর দুইদিন পর তিনি মতিহার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

পরে ১৫ নভেম্বর দর্শন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হককে মুঠোফোনে হুমকি দেয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি ওই দিনই মতিহার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। ২৭ নভেম্বর মুঠোফোন নম্বর (০১৬২৫২৯৩২০) থেকে ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ শাফিকে টাকা চেয়ে হুমকি দেয়া হয়। এর আগেও তিনি মুঠোফোনে হুমকি পেয়েছিলেন। ২৮ নভেম্বর ওই একই মুঠোফোন নম্বর (০১৬২৫২৯৩২০) থেকে ইতিহাস বিভাগের আরও চারজন শিক্ষককে টাকা চেয়ে হুমকি দেয়া হয়।

গত বছরের ৩০ নভেম্বর উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন এবং কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হককে হত্যার হুমকি দিয়ে উপাচার্য দপ্তরে চিঠি পাঠায় আনসার আল ইসলাম নামে জঙ্গি সংগঠন। ‘রাজশাহী অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম শুরু এবং আল্লাহ ও রাসূলের দ্বিন প্রতিষ্ঠায় তাদের হত্যা করা হবে’ উল্লেখ করে ওই জঙ্গি সংগঠনটি।

এছাড়া চলতি বছরের ১১ ও ১২ জানুয়ারি একই মুঠোফোন নম্বর (০১৬৩০২৯৮১৫৭) থেকে বিভিন্ন পরিচয়ে হুমকি পান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় শিক্ষক। তাদের থেকে বিভিন্ন অংকের টাকাও দাবি করা হয়। তারা হলেন-প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আজিজুল হক, একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও শাহ্ মখদুম হলের প্রাধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম, অ্যানিমেল হাসবেন্ড্রি অ্যান্ড ভেটেরিনারি সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এসএম কামরুজ্জামান, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ফেরদৌসি খাতুন ও আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মতিউর রহমান-২। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে পুলিশকে জানানো হয়েছে।

এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান, শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা ও ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন মিশ্র বিভিন্নভাবে হুমকি পেয়েছেন।

দুইবার মুঠোফোনে হুমকি পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও প্রাণি গবেষক বিধানচন্দ্র দাস বলেন, ‘মুঠোফোনে হুমকির পর স্বভাবতই গবেষণায় ভালোভাবে মন দেয়া যায় না। শিক্ষার সার্বিক কার্যক্রমেও খারাপ প্রভাব পড়ে। একবার হুমকি পাওয়ার পর যদি তাকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা যেত তাহলে দ্বিতীয়বার এসব ঘটনা ঘটতো না।’

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীলতার চর্চা হোক এটা মৌলবাদীরা চায় না। তাই বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি সংগঠনের নামে আমাদের হুমকি দেয়া হয়। অধ্যাপক রেজাউল করিমকে খুন করার পর নিজের জীবন নিয়েই শঙ্কার মধ্যে আছি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ঘরের মধ্যে থাকলেও আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মুজিবুল হক আজাদ খান বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে নিরাপত্তাহীনতায় আমরা সবাই ভুগছি। অধ্যাপক রেজাউল করিম হত্যাকাণ্ডের পর শিক্ষকদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের কাছ থেকে মুঠোফোনে হুমকির যে অভিযোগগুলো এসেছে বর্তমানে সেগুলো খতিয়ে দেখে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হবে।’

রাজশাহী নগরীর মতিহার থানার ওসি হুমায়ূন কবির বলেন, ‘শিক্ষকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা নম্বরগুলো ট্র্যাক করার চেষ্টা করেছিলাম। তবে যেসব ফোন নম্বর থেকে হুমকি দেয়া হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো বন্ধ থাকে। এর সঙ্গে জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতা আছে বলে আমরা কোনো তথ্য পাইনি। তবে এ নিয়ে আরো তদন্ত করা হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ‘প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর অব্যাহত হুমকির মধ্যেই আমরা বসবাস করছি। তারমধ্যেই অধ্যাপক রেজাউল করিমকে হত্যা করা হলো। এটা নিরাপত্তাহীনতার দিকটিকেই তুলে ধরে। শিক্ষক হত্যার যথাযথ বিচার না হলে যেকোনো মুহূর্তে আমার মাথাটাও কেটে নামিয়ে দিতে পারে।’

খবরঃ বাংলামেইল২৪