পদ্মার চরে সবুজ বিপ্লব

বাঘা রাজশাহী

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে বয়ে চলেছে পদ্মা। তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বিস্তৃর্ণ চরাঞ্চল। এক সময় পদ্মা প্রমত্তা থাকলেও এখন তা শুকিয়ে পলি পড়ায় আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। অক্টোবরের পর পদ্মার পানি কমতে থাকায় সেখানে হরেক রকম ফসলের চাষ হয়েছে। নদীর চরে জেগে ওঠা এ সব জমিতে চাষ করা সোনার ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কৃষক। এখন বিস্তীর্ণ পদ্মার বুকে যে চর জেগে উঠছে, তার যেদিকে চোখ যাক না কেন-চোখে পড়বে শুধু সবুজ আর সবুজ।

চরাঞ্চলের কৃষকরা জানান, এক সময় শুধু চরের জমিতে ধান ও গম চাষ করা হতো। কিন্তু এখন সেই জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে আম বাগান, পেয়ারা বাগান, বরই বাগান, কলা বাগানসহ হরেক রকম সবজি। আগের মতো বন্যার পানিতে জমি প্লাবিত হয় না। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে সেখানে বাগান গড়তে শুরু করে। গত চার বছর ধরে সেই হার বেড়েছে কয়েকগুণ।
সরেজিমন দেখা যায়, বাঘা উপজেলার নদী তীরবর্তী এলাকার চকরাজাপুর, পলাশি ফতেপুর, দাদপুর, কালিদাসখালী, কলিগ্রাম, টিকটিকি পাড়া, করারি নওসারা, সরের হাট, চাঁদপুর এসব চরে চাষ হয়েছে আলু, বেগুন, টমেটো, কফি, লাও, মিষ্টি কুমড়া ও ঢেঁড়সসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি। এরমধ্যে পেঁয়াজ ও রসুনে বিপ্লব ঘটেছে এবার। পাশা-পাশি চাষ হয়েছে গম, ছোলা, মসুর, আখ, ভুট্টা সরিষা, ধান ও বাদাম। এ ছাড়া শতাধিক আম, পেয়ারা, পেঁপে, বরই ও কলা বাগান।
পলাশি ফতেপুরের চাষি আনোয়ার শিকদার জানান, তিনি ৪০ বিঘা জমিতে ফসল চাষ করেছেন। এসব জমিতে ছিল গম, ছোলা, মসুর ও বাদাম। জমিতে লাঙলের পরিবর্তে আধুনিক পদ্ধতিতে ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করতে হয়। মাটি নরম থাকার কারণে চাষের খরচ কম। এ ছাড়া সেচের জন্য ব্যবহার করা হয় শ্যালো মেশিন। একটি মেশিনে ৩০ থেকে ৩৫ বিঘা জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া যায়।

তিনি জানান, শ্যালোমেশিনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় ডিজেল। কিন্তু ডিজেলের দাম বেশি হওয়ায় সেচ খরচ বেশি পড়ে। তবে চাষের খরচ এবং শ্রমিক কম লাগার কারণে চরের জমিতে উৎপাদন ব্যয় অনেক কম। এর ফলে চাষিরা ফসল চাষ করে লাভবান হন।

চকরাজাপুর এলাকার কৃষক মুস্তাফিজুর মাষ্টার বলেন, তিনি এ বছর ১৫ বিঘা জমিতে গম চাষ করে ছিলেন। তাতে বিঘা প্রতি প্রায় ৯ মন হারে গম উৎপাদন হয়েছে। একই সাথে তিনি সরিষা ও মসুর তুলে সেখানে সবজির চাষ করেছেন। চরের জমিতে বন্যার সময় পলি পড়ায় উর্বরতা বেড়েছে।

এ কারণে কম খরচে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়। তিনি বলেন শুধু আমি একা নয়, চরাঞ্চলের কম খরচে বেশি ফসল উৎপাদন করে অধিকাংশ কৃষক এখন স্বচ্ছল। তার মতে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর যদি এদিকে নেক নজর দেয় তাহলে অল্প সময়ের মধ্যে সবুজ বিপ্লব ঘটবে পুরো চরে।

চকরাজাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুল আলম জানান, চরাঞ্চল এখন আর চর মনে হবে না। চারদিকে ফসলের চাষ হচ্ছে। গড়ে উঠেছে বিপুল পরিমাণ আম বাগান। ফলে চরে সবুজের বিপ্লব ঘটেছে। গত ৪-৫ বছর ধরে চরে ফসলের চাষ বেড়েছে। এখন বাগান গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকছে মানুষ। তাঁর মতে, চরের আমে কোন ক্যামিক্যাল দেয়ার দরকার হয়না। আবহাওয়া গত কারণে এখান কার আম যেমন ঠিকসই তেমসি সাদেও ভরপুর।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাবিনা বেগম বলেন, চরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে। ভালো ফসল ফলানোর জন্য তারা কৃষকদের সহযোগিতা করছেন। তিনি বলেন, চরের জমি খুবই উর্বর। ফসল উৎপাদনও ভালো হয়। এ কারণে কৃষকের মাঝে পদ্মার চরে ফসল ফলানোর আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। গত কয়েক বছরে চরে সবুজের নীরব বিপ্লব ঘটেছে। তাঁর মতে, উপজেলার সমতল এলাকার ৬ ইউনিয়ন মিলে যে পরিমান সবজি চাষ না হয় তার চেয়ে বেশি সবজি চাষ হয় চরাঞ্চলে।

খবরঃ দৈনিক সানশাইন

1 thought on “পদ্মার চরে সবুজ বিপ্লব

Comments are closed.