পদ্মার তীর ঘেঁষা ওয়ার্ডে ঝুঁকি নিত্যসঙ্গি

রাজশাহী

রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) এলাকায় যে কয়টি ওয়ার্ড মাদকের অভয়ারণ্য হিসেবে চিহ্নিত তার মধ্যে অন্যতম চার নং ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডের নদীর ধারে রয়েছে ঘনবসতীপূর্ণ বস্তি। নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত ও নানা দুর্ভোগে জর্জরিত অস্তিবাসী দীর্ঘদিন থেকেই নিজেদের ভাগ্য ও জীবনমান পরিবর্তনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পানে চেয়ে রয়েছেন।
কেশবপুর, ভেড়িপাড়া, ঘোষপাড়া, গোয়ালপাড়া, নবীনগর, বুলনপুরসহ আশাপাশের আটটির অধিক এলাকা নিয়ে এই চার নং ওয়ার্ডটি সাজিয়েছে রাসিক। রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কমিশনের দেয়া কথ্য মতে ওয়ার্ডটিতে মোট ভোটারের সংখ্যা ১০ হাজার ১৮৬। আগামী ৩০ জুলাই আসন্ন রাসিক নির্বাচনে পাঁচ জন কাউন্সিলর পদে মনোনয়ম জমা দিয়েছে। এরা হলেন সদ্য বিদায়ী কাউন্সিলর রুহুল আমিন, ফজলে কবীর, সাজ্জাদ হোসেন, আজিমুদ্দিন (আজিম) ও ফিরোজ কবির মুক্তা।

এলাকায় খেলার মাঠ ও শিশু পার্ক নির্মাণের জোর দাবি স্থানীয়দের। এছাড়া ওয়ার্ডটি থেকে মাদক ও সন্ত্রাস চিরতরে নির্মূল করে এলাকার বিপথগামী যুব সমাজকে রক্ষা করার মতো একজন বলিষ্ঠ জনপ্রতিনিধি অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন ভুক্তভোগী ওয়ার্ডাবসী।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্ক এ ওয়ার্ডেই নির্মাণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্য মতে এই হাইটেক পার্কটি চালু হলে প্রায় ১৫ হাজার তরুণের কর্মসংস্থান হবে। এ এলাকার বেকাররা যেন হাইটেক পার্কে চাকরি পায় সেই আশায় স্থানীরা সময় পার করছেন।

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) চার নম্বর ওয়ার্ডটির প্রধান সমস্যা বস্তি এবং পয়োনিষ্কাশন। বস্তিগুলোর বাসিন্দারা অধিকাংশই সরকারী ভূমি দখল বা লিজ নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে বসবাস করে আসছেন। ওয়ার্ডটির বেশ কয়েকটি এলাকায় ঘনবসতি থাকার কারণে পয়োনিষ্কাশন সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। এছাড়া সময়মতো ময়লা-আর্বজনা পরিস্কার না করায় প্রায় সময়ই অপরিচ্ছন্ন থাকে এলাকার পরিবেশ। মাদকদ্রব্য হাতের নাগালে পাওয়ার কারণে এলাকার উঠতি বয়সের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন স্থানীয়অভিভাবকবৃন্দ। সইে সাথে বাড়ছে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড।

এছাড়া ওয়ার্ডটির রাস্তাগুলোও ভাঙাচোরা। রাস্তার পাশ দিয়ে ড্রেন থাকলেও সেগুলো হয় ভাঙা নয়তো ঢাকনা বিহীন। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে জলাবদ্ধতার সমস্যা দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি রয়েছে মশার উপদ্রব। নেই পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পোল। বাধ্য হয়েই অবৈধভাবে বেশ কয়েকটি মহল্লায় বাঁশ দিয়ে নেয়া হয়েছে আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ। এমনসব অভিযোগ এনে ওয়ার্ডবাসী জানিয়েছেন তারা মহানগরীতে থেকেও নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত।

ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর রুহুল আমিন টুনু ২০১৩ সালে নির্বাচিত হন। বিএনপি’র রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় ও বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পালিয়ে নয়তো জেলে সময় পার করেছেন। সম্প্রতি তিনি বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি নাগরিকসেবা নিশ্চিত করতে পারেননি। সাড়ে চার বছর দায়িত্বে থাকলেও ওয়ার্ডটিতে লাগেনি উন্নয়নের ছোঁয়া। ফলে ওয়ার্ডের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ।

ওয়ার্ডটির পদ্মা নদীর বাঁধ বরাবর প্রায় এক কিলোমিটারের বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে বস্তি। সরেজমিন দেখা গেছে, এ বস্তির পরিবেশ অপরিচ্ছিন্ন। এখানকার ডোবাগুলো ময়লা ও অপরিচ্ছন্ন। নেই পর্যাপ্ত রাস্তা। এমনকি পয়নিষ্কাশনও অপর্যাপ্ত । এক বাড়ির মধ্য দিয়ে অন্য বাড়ির মানুষদের যাতায়াত। যেখানে সেখানে বেঁধে রাখা হয়েছে গরু-ছাগল। তবে স্থানীয়দের দাবি নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে তাদের দীর্ঘনিনের দুর্ভোগগুলো কমতে শুরু করেছে। এখন নিয়মিত রাস্তা, ড্রেন ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হচ্ছে।
বাঁধ এলাকার বাসিন্দা আবদুল মালেক জানান, ভোটের সময় ছাড়া খুব একটা চোখে পড়েনা কাউন্সিলরকে। এমনকি যারা কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হন তাদেরও অন্য সময়ে খোঁজ মেলে না। ভোট ছাড়া বস্তির মানুষদের প্রতি কারও তেমন চাহিদা নাই। এ এলাকায় ঘনবসতি রয়েছে। এ কারণে এলাকায় ময়লা-আর্বজনার স্তূপ যত্রতত্র পড়ে থাকে। পরিষ্কারের কোনো উদ্যোগে নেই। এছাড়া পয়োনিষ্কাশন সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যেই বস্তির লোকজন স্বাস্থ্যঝুঁকি আর দুর্ভোগের মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে বসবাস করছেন।

এ ওয়ার্ডের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হল ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট। আড়াই যুগ আগে এলাকার রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হয় বলে জানিয়েছেন বসবাসরতরা। গোয়ালপাড়া, কেশবপুর, ঘোষপাড়া, ভেড়িপাড়া এবং নবীনগর মসজিদ এলাকার রাস্তাগুলো বেহাল। অধিকাংশ রাস্তার ওপরের অংশ উঠে গেছে। ফলে খানাখন্দে পরিণত হয়েছে রাস্তা। ওয়ার্ড কাউন্সিলর রুহুল আমিন টুনু বলেন, আমি আমার দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করতে পারিনি। বরাদ্দ অপ্রতুল থাকার কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করা সম্ভব হয়নি। আগামীতে কাউন্সিলর নির্বাচিত হলে জনভোগান্তি দূর করতে জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

চার নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী ফজলে কবীর বলেন, ১৯৮৮ সালে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন গঠনের পর থেকে দু’জন ব্যক্তি কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। এ দুই ব্যক্তিই অতীতে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। দল বদল করে তারা আওয়ামী লীগে এসেছেন। এর মাধ্যমে হয়তো তারা নিজেদের ভাগ্য বদল করেছেন, কিন্তু এলাকার উন্নয়ন হয়নি। ফলে ওয়ার্ডে বসবাসরতরা চরম ভোগান্তি আর দুর্ভোগের মধ্যে পড়েন। এবার আমি নির্বাচিত হলে এ সমস্যাগুলো সমাধান করতে চেষ্টা করব।

১৯৮৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৫ বছর কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালন করেছেন সাজ্জাদ হোসেন। ২০০৮ সালের পর তিনি বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। সাজ্জাদ হোসেন বলেন, এলাকা থেকে মাদক ও সন্ত্রাস দূর করা হবে আমার প্রধান কাজ। কারণ বর্তমান কাউন্সিলরের সময়ে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। আমি নির্বাচিত হলে জলাবদ্ধতা দূর করতে হড়গ্রাম এলাকার ডা. নূরুজ্জামানের বাড়ি থেকে কেশবপুর পুলিশ লাইন পর্যন্ত ড্রেন নির্মাণ করার জন্য সবধরণের পদক্ষেপ নেব।
এদিকে বর্তমান কাউন্সিলর রুহুল আমিন টুনু ওয়ার্ডে বরাদ্দের অর্থাভাবসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় কাঙ্খিত উন্নয়ন করতে পারেননি উল্লেখ করে বলেন বলেন, রাস্তা সংস্কারে বেশ কয়েকটি টেন্ডার করা হয়েছে। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ না হওয়ার কারণে ঠিকাদাররা কাজ শুরু করেননি। একই কারণে নতুন ড্রেন নির্মাণ করে জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব হয়নি।
তবে তিনি দাবি করেন, এলাকা ময়লা-আবর্জনামুক্ত রাখতে আমি পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগ করেছি। এলাকা আগের থেকে এখন অনেক পরিচ্ছন্ন। আমি আবারও কাউন্সিলর প্রার্থী। ভোটররা আমাকে নির্বাচিত করলে অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব। (কাল পড়ুন ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চালচিত্র)।

খবর কৃতজ্ঞতাঃ ডেইলি সানশাইন