পবার ৯ গ্রাম বাল্যবিবাহ মুক্ত

পবা রাজশাহী রাজশাহী বিভাগ

আবারো পবার দামকুড়া ইউনিয়নের দু’টি গ্রামে বাল্যবিয়ে মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে ইউনিয়নের দেলুয়াবাড়ি ও দেলশাপাড়া গ্রামকে এ ঘোষণা করা হয়। আর এই সময়োচিত পদক্ষেপের পিছনে নিরলশ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সেন্টার ফর ম্যাস এডুকেশন ইন সায়েন্স (সিএমইএস) দামকুড়া ইউনিট। কয়েক বছর থেকেই ইউনিটটি সভা, সামবেশ, উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ওই এলাকার জনগণকে সচেতন করে এর আগে আরো ৭টি গ্রামকে বাল্যবিয়ে মুক্ত করেছেন। ওই গ্রামগুলো শতভাগ বাল্যবিয়ে মুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে।

সরজমিনে গ্রামের নাম গোবিন্দপুর, আলোকছত্র, ভিমের ডাইং, আসগ্রাম এবং গোদাগাড়ি উপজেলার ইমামগঞ্জ। সবাই এখন গ্রামগুলোকে চেনেন ‘বাল্যবিয়ে মুক্ত গ্রাম হিসেবে। রাজশাহী নগরী থেকে ১২ কিলোমিটার দুরে পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নে গ্রামগুলো। গ্রামগুলোর প্রবেশপথেই চোখে পড়বে বড় বড় সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডটি কয়েক বছর আগের লাগানো। তাতে লেখা আছে ‘বাল্যবিয়ে মুক্ত গ্রাম।’ বাল্যবিয়ে মুক্ত গ্রাম ঘোষণা দেয়ার পর থেকে গ্রাম গুলোতে বাল্যবিয়ে হয়নি। সেই আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছে আশেপাশের গ্রামগুলো।

তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল আরো দু’টি গ্রাম বাল্যবিয়ে মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এরআগে দামকুড়া ইউনিয়ন পরিষদ উদ্যোগে ঘোষণা করা হলেও এবার এলাকাবাসি ও বেসকারি সংস্থা সেন্টার ফর মাস এডুকেশন ইন সায়েন্স (সিএমইএস) এ উদ্যোগে এই দু’টি গ্রামকে বাল্যবিয়ে ঘোষণা করা হয়। নতুন করে যে দুইটি গ্রাম বাল্যবিয়ে মুক্ত গ্রাম ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো হলো দেলুয়াবাড়ি ও দেলশাপাড়া গ্রাম।

ঘোষণা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ওই এলাকার সমাজসেবী ও দামকুড়া ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম। সাথে ছিলেন বর্তমান ইউপি’র সদস্য সেলিম উদ্দিন, আলকাস আলী, মাওলানা রুস্তোম আলী, আব্দুল্লাহ আল মামুন। ঘোষণা শেষে এক সমাবেশে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সিএমইএস’র দামকুড়া ইউনিট অর্গানাইজার কেএম আসাদুজ্জামান। প্রতিষ্ঠানের অর্গানাইজার ট্রেড জাহাঙ্গীর হোসেনের পরিচালনায় বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন শিক্ষক জহুরুল হক, গোলাম রাব্বানী, মশিউর রহমান, খালেদা খাতুন ও জান্নাতুন বেগম। উপস্থিত ছিলেন ওই এলাকার অভিভাবক ও কিশোর-কিশোরী।

রাজশাহী বিভাগীয় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্য স্থানের তুলনায় রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় অল্প বয়সে মা হওয়ার হার শতকরা ৩৮ দশমিক ৮ ভাগের বেশি। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২৩ শতাংশই ২০ থেকে ১৯ বছর বয়সের ছেলেমেয়ে। এদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয় ৬৬ শতাংশ কিশোরীর। আর এই প্রবনতা রাজশাহী মহানগরীর পাশে হলেও কম না।

যেখানে সারা দেশে বাল্যবিয়ের এমন ভয়ঙ্কর রুপ সেখানে এ উদ্যোগ সকলের কাছে প্রসংশা কুড়াচ্ছে। আগের গ্রামগুলোতে সিএমইএস ও দামকুড়া ইউনিয়ন পরিষদ যৌথভাবে বাল্যবিয়ে মুক্ত ঘোষণা করেছিল। তারই সফলতা দেখে গতকাল দেলুয়াবাড়ি ও দেলশাপাড়ার জনগণ এই সৃজনশীল উদ্যোগ নিয়ে এবং বাল্যবিয়ে ঘোষণা করেন। গ্রাম দু’টি ছোট হলেও উদ্যোগটি নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।

গতকাল উদ্বোধনের সময় আয়োজকরা দুইটি গ্রামের বর্তমান চিত্র তুলে ধরেন। এরমধ্যে দেলুয়াবাড়ি গ্রামে মোট পরিবারের সংখ্যা ৭১টি, লোক সংখ্যা ২১৭ জন, ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে নারীর সংখ্যা ২৩ জন, ১২ থেকে ২১ বছর বয়সের ছেলের সংখ্যা ১৩ জন। বাল্যবিয়ের ঝুঁকিপূর্ণ কিশোর-কিশোরীর সংখ্যা ৬ জন। ২০১৫ সালের পহেলা জানুয়ারী থেকে চলতি নভেম্বর পর্যন্ত ওই গ্রামে মোট বিয়ে হয়েছে ১টি। আর এটাই হয়েছে বাল্যবিয়ে। এরমধ্যে বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে এক মেয়ে শিশু ও এক ছেলে শিশু। দেলশাপাড় গ্রামের মোট পরিবারের সংখ্যা ৬৯টি। মোট লোকসংখ্যা ২৯৬। ১২ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত মেয়ের সংখ্যা ১৫ জন, ১২ থেকে ২১ বছরের ছেলের সংখ্যা ১৯ জন। ১৩ থেকে ২১ বছর বয়সী বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা কিশোর-কিশোরীর সংখ্যা ১৯ জন। ২০১৫ সালের জানুয়ারী থেকে চলতি নভেম্বর পর্যন্ত ওই গ্রামে মোট বিয়ে হয়েছে ১টি। এর মধ্যে বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছেন ১ জন মেয়ে।

সমাজসেবক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, আগের আমলে বাল্যবিয়ে বিষয়টি প্রায় ঘটতো। তবে মানুষ এখন অনেক সচেতন হয়েছে। এছাড়া ছেলে-মেয়েরা এখন লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত। ছেলে হোক বা মেয়ে হোক বাল্যবিয়ের কথা এখন কম লোকেই চিন্তা করেন। তবে এখনো এলাকায় বাল্যবিয়ে হচ্ছে।

দামকুড়া ইাউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান আলী জানান, সিএমইএস প্রতিষ্ঠানটি এলাকায় ভাল কাজ করছে। তিনি তাদের সাথে সহযোগিতা করেন। তিনি আরো জানান সত্যিকার অর্থে বাল্যবিয়ে ঘোষণা হয়েছে এমন গ্রামে বাল্যবিয়ে হচ্ছে না।

দৈনিক সানশাইন