পরীক্ষা জালিয়াত চক্রের হুমকিতে দিশেহারা ছিল রাবির লিপু, মোবাইল ফোন ভেঙ্গেও শেষ রক্ষা হয়নি

ক্যাম্পাসের খবর রাজশাহী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

হুমকি থেকে মুক্তি পেতে মোবাইল ফোন ভেঙ্গেও শেষ রক্ষা হলো না রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপু। গত মঙ্গলবার সকালে মোবাইলে লিপুকে হুমকি দেয়া হয়। এর পর সে মোবাইল ফোন ভেঙ্গে ফেলে। তার পরও ভয়ে বাড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইছিল না লিপু। কিন্তু পরীক্ষার ফরম পুরণের জন্য পরিবারের সদস্যদের চাপে লিপু বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে বলে জানান তার দিনমুজুর বাবা বদর উদ্দিন।

শুক্রবার মুঠোফোনে লিপুর বাবা বদর উদ্দিন বলেন, আমার ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কে বা কারা হুমকি দিতো। এ নিয়ে লিপু চিন্তায় থাকতো। কে বা কারা এ হুমকি দিত তা লিপু কোন দিন স্পস্ট করে জানায়নি। তবে যারা অন্যের হয়ে পরীক্ষা দেওয়ায় ছিল তারা হুমকি দিতো বলে লিপু বলেছিল। তারা কারা তা শুধু আমার ছেলে আর ওই লোকেরাই জানে বলেন বদর উদ্দিন।

তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার সকালে লিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে লিপুকে ফোনে হুমকি দেয়া হয়। ফোনকারির সঙ্গে কথা বলা শেষে লিপু তার মোবাইল ফোন আছাড় মেরে ভেঙ্গে ফেলে। এর পর সে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইছিল না। লিপু শুধু বলেছিল বিপদে আছি। এর পরও ফরম পুরনের জন্য চাপ দিয়েই তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাহিরে তার এক আত্মীয়র বাড়িতে থাকতে বলা হয়েছিল। লিপুর চাচা বছির উদ্দিন বাড়ি থেকে বাইসাইকেলে করে এক কিলোমিটার নিয়ে গিয়ে তাকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে দেয়। তবে যাওয়ার সময় তার ফোনের সিম কার্ড ও বাড়ি থেকে নষ্ট হওয়া মোবাইল নিয়ে যায় বলে জানান বদর উদ্দিন।

তিনি বলেন, সকালে বাড়ি থেকে একশ গজ দূরে বাগানে ফোনে কথা বলছিলো লিপু। ওই সময় ফোনে বলতে শোনা যায়, প্রশাসনকে জানিয়ে দিব, আমি ক্যাম্পাসে আসছি তুই যা পারিস করিস। এ কথা লিপুর দাদি ও রোস্তম নামের এক প্রতিবেশী শুনেছেন বলেও জানান বদর উদ্দিন।
লিপুর মা হোসনে আরা বেগম জানান, বুধবার দুপুরের আগে লিপু তার সঙ্গে সর্বশেষ মোবাইলে ফোন কথা বলেছে। বন্ধুর ফোনে সিম ঢুকিয়ে লিপু তার সঙ্গে কথা বলে জানান হোসনে আরা।

তিনি বলেন, তার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তার রুমমেটের মোবাইল নাম্বার তাকে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার রুমমেট মোবাইল নাম্বার দিতে রাজি হয়নি। তাই সে নতুন সিম কিনে এবং পুরাতন মোবাইল ঠিক করে নাম্বার দিতে চেয়েছিল। তার মোবাইলে কারা যেন হুমকি দিতে এ কারণে লিপু তার পুরাতন নাম্বার বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল।

হোসনে আরা বলেন, মঙ্গলবার বিকেলে বাড়ি থেকে গিয়ে সে কাটাখালি তার এক আত্মীয়র বাসায় ছিল লিপু। সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ফরম পুরন করে। আগামী ২ নভেম্বর তার দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা ছিল বলে লিপু জানিয়েছিল। বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় লিপুকে চার হাজার টাকা দেয়া হয় বলে জানান হোসনে আরা।

আর্তনাদ করতে করতে লিপুর মা হোসনে আরা বলেন, মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে উঠে লিপু বলল, ফরম ফিলাপ করতে হবে টাকা লাগবে। আমি ওকে চার হাজার টাকা দিলাম। টাকা না দিতে পারলে তো রাগারাগি করতো, মন খারাপ করতো। কিন্তু আমার মনি তো ভালোভাবেই গেল। ওর চাচা ওকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসলো।

আমার মনিরে অতিরিক্ত চাপা মাইর দিয়েছে। মাথায় মাইরেছে। মাথায় মাইরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। আমার মনিরে কীভাবে আঘাত কইরে মাইরেছে। আমার মনিরে খুব আঘাত কইরেছে। আমার মনিরে আমি কোনো দিন একটা থাপ্পরও দেই নাই। আর আমার এই দেখতি হল। আমি আমার মনিরে যারা মারছে, আমি তাদের বিচার চাই। আর কিছুই চাই না। বিলাপ করতে করতে মা হোসনে আরা এভাবেই সন্তান হত্যার বিচার চান।

মতিহার থানার ওসি হুমায়ন কবির বলেন, লিপু গত বছর পরীক্ষা জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। গত বছরের ডিসেম্বরের দিকে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় পক্সি দিতে গিয়ে ধরে পড়ে ভ্রাম্যমান আদালতে তার তিন মাসের সাজা হয়। তিন মাস কারাগারে থাকার পর লিপু মুক্তি পান। তবে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পরীক্ষ জানিয়াতি চক্রের সঙ্গে লেন দেন নিয়ে বিরোধ বাধে। এমন কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। সে বিষয়টি গুরুত্বে রেখে এ ঘটনাটি তদন্ত চলছে বলে জানান ওসি।

ওসি বলেন, এ ঘটনায় তার রুমমেট মনিরুল ইসলামসহ চারজনকে থানা হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনজনকে থানা থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। তবে মনিরুল ইসলামকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে বলে জানান ওসি হুমায়ন কবির।

বৃহস্পতিবার সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আবদুল লতিফ হলের ড্রেন থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপুর লাশ উদ্ধার করা হয়। মাথায় আঘাত জনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ময়নাতদন্তের চিকিৎসক জানায়। লিপু ওই হলের ২৫৩ নম্বর কক্ষে থাকতেন। তার বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার হরিনাকুণ্ড উপজেলার মকিমপুর গ্রামে।

খবরঃ দৈনিক সানশাইন