পানি উন্নয়ন বোর্ডের ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হারিয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা নদী পাগলা

রাজশাহী

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্তে পদ্মা নদীর বামতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের অধীন বাঁধ নির্মাণ করায় পাগলা নদী মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে একসময়ে খরস্রোতা নদী পাগলা। জরুরি ভিত্তিতে পাগলা নদী খনন করে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার দাবি জেলাবাসীর। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ঘোড়াপাখিয়া ইউনিয়নের কালিনগরের মোহনপুর থেকে শাহবাজপুর ইউনিয়নের আজমতপুর ব্রিজ পর্যন্ত পাগলা নদী একেবারে ক্ষীণ হয়ে গেছে। একমাত্র পদ্মা নদীর বামতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রায় ২০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করায় এ নদীতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পদ্মা নদীর বন্যার পানিতে পাগলা নদীতেও বন্যা হয়ে থাকে। ১৮ কলম ও উজিরপুর ইউনিয়নের দশরশি দাঁড়ায় বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহের পথ বন্ধ করায় পদ্মা নদীর পানি পাগলা নদীতে প্রবেশ করতে পারে না। মহানন্দা নদীর সঙ্গে পাগলার যে সংযোগ করা হয়েছে তাও অর্থহীন। বরং মহানন্দার বন্যার পানি পাগলা নদীতে প্রবেশ করে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে থাকে। পদ্মা নদীতে প্রবল ভাঙন শুরু হয় ৯০ দশকের দিকে। ভাঙন রোধ করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড পদ্মা নদীর বামতীর সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করে। শুরু হয় পদ্মা নদীর বামতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ।
অতীতে সমগ্র শিবগঞ্জ উপজেলাবাসীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের সাথে একমাত্র যোগাযোগ ছিল পাগলা নদীর ওপর নির্ভরশীল। নৌপথেই যাতায়াত করত সাধারণ মানুষেরা বেশি। পাগলা নদীতেই একসময় চলাচল করত ঢাকুয়ালদের বড় বড় পণ্যভর্তি নৌকা, স্টিমার ও লঞ্চ। পাগলা নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল বাংলার পুরাতন রাজধানী গৌড়, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার কুঁজে রাজার কানসাটে জমিদারি।
এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের রামচন্দ্রপুর হাটে ব্রিটিশ বেনীয়ারা গড়ে তুলেছিল নীলকুঠি। এই নদী দিয়েই সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য চলত সারাবছর। কিন্তু ১৮ কলম ও উজিরপুর দাঁড়ার মুখ বন্ধ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী গবেষণা বিভাগের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে পদ্মা নদীর বামতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের যে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছে, সেই কারণেই পাগলা নদীতে বর্ষাকালিন সময়ে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। অন্যদিকে খরা মৌসুমে পাগলা নদী পানি শূন্য হয়ে পড়ে। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণীর অবৈধ দখলদার পাগলা নদীর দুইপাড়ের মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নদীর বুক অবৈধভাবে দখল করে ইটভাটা গড়ে তুলেছে। জানা যায়, পাগলা নদীর উত্স মুখ ভারতের মালদহ জেলায়। সেই উত্স মুখে ভারত মাটি ভরাট করে গড়ে তুলেছে জনবসতি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী শাহবাজপুর থেকে পাগলা নদী শুরু হয়ে শ্যামপুর, কানসাট, দুর্লভপুর, ছত্রাজিতপুর, ঘোড়াপাখিয়া ও সুন্দরপুর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে এই নদীটি পদ্মা ও মহানন্দার সাথে মিশেছে সদর উপজেলার কালিনগরের মোহনপুর নামক স্থানে।
পাগলা নদীর ওপর নির্ভরশীল শিবগঞ্জ উপজেলার তেলকুপি, কয়লার দিয়াড়, শ্যামপুর, কানসাট, শিবগঞ্জ, তক্তিপুর, মোহদিপুর, ছত্রাজিতপুর, চকঘোড়াপাখিয়া, রশিকনগর, কমলাকান্তপুর, সদর উপজেলার ঘোড়াপাখিয়া, রামচন্দ্রপুর সুন্দরপুর, কালীনগরসহ বহু সংখ্যক গ্রামের মানুষ। পদ্মা নদীর সাথে পাগলা নদীর পূর্বের ন্যায় সংযোগ করা না হলে দেশের অন্যান্য স্থানে যে ৫৫টি নদী রয়েছে তার মধ্য থেকে হারিয়ে যাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার এককালের প্রবল খরস্রোতা পাগলা নদী (শাড়িন নদী)।