প্রতিবাদে ক্ষোভে উত্তাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, দুই দিনে কিছুই পায়নি পুলিশ

ক্যাম্পাসের খবর রাজশাহী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ কিছুই খুঁজে পায়নি। শুধু হত্যাকাণ্ডের ধরন দেখে পুলিশ বলছে, ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের হাতে তিনি খুন হয়েছেন। এ ছাড়া এ ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও পাওয়া যায়নি।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ শনিবার রাতে শহরের ছোট বনগ্রাম এলাকা থেকে হাফিজুর রহমান নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে আটক করেছে। হাফিজুর মহানগরের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অধ্যাপক রেজাউল করিম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকালও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছিল প্রতিবাদমুখর। শিক্ষক সমিতি, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট পৃথক কর্মসূচি পালন করেছে। ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শাস্তি দাবি করেছে তারা।
আইএসের দাবি বিশ্বাস করছে না কেউ: গতকাল বিভিন্ন পত্রিকায় আইএসের দায় স্বীকার-সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হওয়ায় এলাকার ও পরিবারের লোকজন বিস্ময় প্রকাশ করেন। নিহত শিক্ষকের চাচাতো বোন স্কুলশিক্ষক জাহানারা বেগম বলেন, রেজাউল করিম গ্রামে এসে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। মসজিদ-মাদ্রাসায় দানও করতেন। ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্যও দেননি।
রেজাউল করিমের গ্রামের বাড়ির প্রতিবেশী কলেজশিক্ষক জহুরুল হক বলেন, ধর্মের প্রতি কখনো বিদ্বেষমূলক কোনো মনোভাব তাঁরা লক্ষ করেননি। তিনি দরগামাড়িয়ার বহু বছরের ইসলামি তাফসির কোরআন মাহফিলের সহসভাপতি ছিলেন, আবার কোনো বছর পৃষ্ঠপোষকের দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি দানও করেছেন।
রেজাউল করিমের সঙ্গে দীর্ঘ ৪২ বছরের পরিচয় ইংরেজি বিভাগেরই আরেক অধ্যাপক জহুরুল ইসলামের। কলেজজীবন থেকে তাঁরা একসঙ্গে আছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, রেজাউল মূলত কবিতা পড়াতেন। গান করা, সেতার বাজানো, ভিডিওগ্রাফি ও খেলাধুলার প্রতি রেজাউলের খুব আকর্ষণ ছিল। ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে তিনি কখনো কোনো মন্তব্য করেননি।
শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ বলেন, আইএসের টার্গেট হওয়ার মতো লোক তিনি নন। সহযোগী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ব্লগারদের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এ ঘটনাকে মিলিয়ে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।
ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের হাতে খুন?: রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. সামসুদ্দিন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, খুনের প্রকৃতি দেখে মনে হয় এটা খুবই প্রশিক্ষিত লোকের কাজ। এ ছাড়া এই এলাকায় সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের অনুসারীরা এখনো রয়ে গেছে। তাই ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের হাতে রেজাউল করিম খুন হয়েছেন বলে তাঁরা ধারণা করছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাফিজুরকে আটকের বিষয়ে মহানগর পুলিশ কমিশনার বলেন, সন্দেহভাজন হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে আটক করা হয়েছে। মোবাইল কললিস্ট, এসএমএস, ঘটনার সময় ওই এলাকায় কোন কোন মুঠোফোন সচল ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মামলার দায়িত্বভার ইতিমধ্যে রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা রেজাউস সাদিক প্রথম আলোকে বলেন, তিনি আসামিকে এখনো হাতে পাননি। মামলার তদন্তকাজও শুরু করেননি।
প্রত্যক্ষদর্শী কেউ নেই: রেজাউল করিমকে কতজন, কীভাবে হত্যা করেছে, সে বিষয়ে কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা পাওয়া যায়নি। গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, রেজাউল করিমের বাসা থেকে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক ১৩০ কদম দূরে। আর মহাসড়কে ওঠার ১৫ কদম আগে তাঁর মরদেহ একটি তিনতলা বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে পড়ে ছিল।
রেজাউল করিমের বাসা থেকে মহাসড়কে ওঠার এ গলিটি প্রায় ১০ ফুট চওড়া। গলির মুখে দুই পাশে দুটি দোকান (বদরুল টেলিকম ও স্মরণ এন্টারপ্রাইজ)। এরপরই দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে বাড়ি।
‘কাংখিতা’ নামের তিনতলা ভবনের সামনে রেজাউলের মরদেহ পড়ে ছিল। ভবনের বাসিন্দারা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা ঘটনাটি দেখেননি। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে তাঁরা বেরিয়ে লাশ পড়ে থাকতে দেখেন।
ঘটনাস্থলের ঠিক উল্টো পাশের বাড়িতে তখন রান্না করছিলেন ডলি বেগম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘লোকজন চিৎকার না দিলে তো টেরই পেতাম না।’
গলির প্রতিটি বাসার বাসিন্দাদের সঙ্গেই কথা হয়। কেউ বলেন, তাঁরা ঘুমাচ্ছিলেন, কেউবা নাশতা করছিলেন। সবাই চিৎকার শুনে বের হয়ে লাশ পড়ে থাকতে দেখেছেন।
‘গলির ভেতর এক ব্যক্তি রেজাউল করিমের পিছু পিছু এসে হঠাৎ তাঁর গতি রোধ করে গলায় আঘাত করে দৌড়ে মোটরসাইকেলে উঠে পালিয়ে যায়।’ ‘দুজন ব্যক্তি তাঁকে হত্যা করে রাস্তার পাশে চালু একটি মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।’ গত শনিবার এ রকম দুটি বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু কারা এই বর্ণনা দিয়েছেন, তা জানা যায়নি। প্রত্যেকেই বলছেন, তাঁরা অন্যের কাছে শুনেছেন।
স্মরণ এন্টারপ্রাইজের মালিক দুলাল হোসেন ঘটনার সময় গলিমুখ থেকে একটু দূরে রাস্তার উল্টো পাশে চা পান করছিলেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ঘটনার সময় গলির মুখে অনেকেই দাঁড়ানো ছিলেন। এঁদের অনেকে চিৎকারও করেছেন। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পর তাঁরা সবাই উধাও। তিনি বলেন, কেউ না কেউ তো ঘটনাটি দেখেছে। কিন্তু হেনস্তার ভয়ে হয়তো বলছে না।
পুলিশ কমিশনার মো. সামসুদ্দিন বলেন, একজন ভ্যানচালক দুজন ব্যক্তিকে কোপ দিয়ে পালিয়ে যেতে দেখেছেন বলে শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু পরে আর তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
প্রতিবাদমুখর ক্যাম্পাস: অধ্যাপক রেজাউল করিমকে হত্যার প্রতিবাদে গতকাল শিক্ষক সমিতি সিনেট ভবনের সামনে মানববন্ধন করেছে। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সেখান থেকে মৌন মিছিল বের করা হয়।
কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেছেন, ‘এ বিশ্ববিদ্যালয় শান্ত হবে না, যতক্ষণ না হত্যাকারীদের আমাদের সামনে হাজির করা হয়, বিচার করা হয়। আমরা আইনের শাসন দেখতে চাই।’
হত্যাকারীদের বিচার দাবি করে ইংরেজি বিভাগের সংবাদ সম্মেলনে তিন দফা কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আগামীকাল পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, সপ্তাহব্যাপী মানববন্ধন এবং আজ সোমবার শোকসভা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিভাগের সভাপতি মাসউদ আখতার।
সকাল ১০টায় শহীদুল্লাহ কলাভবনের সামনে থেকে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রতিবাদ র্যা লি করেন। সিনেট ভবনের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক ১০ মিনিট অবরোধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। বিভাগের শিক্ষার্থীরা দুপুর ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে প্রতিবাদ র্যা লি ও সমাবেশ করেছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতবিনিময়: গতকাল মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. সামসুদ্দিনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অধ্যাপক রেজাউলের কর্মস্থল ইংরেজি বিভাগ পরিদর্শন করেছেন। তাঁরা বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পাশাপাশি অধ্যাপক রেজাউলের কক্ষ দেখেন। তাঁরা উপাচার্য ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন।
উড়ো চিঠি: বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাস দুয়েক আগে একটি বেনামী চিঠি দপ্তরের দরজার নিচ দিয়ে কে বা কারা দিয়ে যায়। একটি চিঠি গিয়েছিল অধ্যাপক জহুরুল ইসলামের কাছে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, চিঠিতে বিভাগের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরার পাশাপাশি কিছু শিক্ষক ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত দিয়ে কথা বলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে সেখানে কোনো শিক্ষকের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া কাউকে হুমকিও দেওয়া হয়নি।
অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রতিবাদ: রেজাউল করিমের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গতকাল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটি ক্যাম্পাসে ইংরেজি বিভাগ মানববন্ধন করেছে।
ময়মনসিংহের ত্রিশালে কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মানববন্ধনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন।
শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও মানববন্ধন হয়েছে।

খবরঃ প্রথম আলো