প্রেরণার অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ

মন্তব্য

অক্টোবর বিপ্লবের ১০০ বছর পূর্ণ হয়েছে এবছর। কেমন ছিলো সে আন্দোলন?

লিখেছেন নাজমুস গালিব, সাবেক শিক্ষার্থী,গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

শাসনে-শোষণে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে দেশ। পৃথিবীতে বয়ে চলেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা। যুদ্ধ,খাদ্য সংকট আর রক্তের লাভা কোথায় যেন নাড়িয়ে দিচ্ছে মানুষের। জনগণ তাদের অধিকারের প্রতি হয়ে উঠছে সোচ্চার। একটা অবধারিত বিপ্লব হয়ে গেছে। কিন্তু তাতেও মেলেনি শোষিত জনগণের কাঙ্ক্ষিত অধিকার। তাহলে ঠিক কোথায় নাড়া দিলে মিলবে তাদের বহু সাধনার স্বস্তি, গড়ে উঠবে সবার পরিশ্রমের সমতল দেশ? সেটাই বুঝে উঠতে পারছিলোনা দেশের শোষিত শ্রেণী। ঠিক এমন সময়ই হাজির হলেন ছোট-খাট খর্বকায় এক মানুষ। এক ডাকে লাখো জনতাকে হাজির করলেন রাজপথে। দিলেন অধিকার আদায়ের এমন এক মন্ত্র যা জনতার মনের কথা ও চাওয়ার সাথে মিলে যায়। এবার মেহনতি মানুষের চরম চাওয়া ও প্রকাশের জায়গা মিলে যাওয়ায় জনতা ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠে আওয়াজ তোলেন। আর তাতেই পাকাপোক্তভাবে রাশিয়ায় পতন ঘটে অবিরাম শোষণ যাত্রার।

১৯১৭ সালের অক্টোবরে ( জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসারে ২৫ অক্টোবর ও গ্রেগরিয়ান বর্ষপপঞ্জি বা খ্রিষ্টীয় মোতাবেক ৭ নভেম্বর) কিংবদন্তী বিপ্লবী ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে যে বিপ্লব পৃথিবীর মানুষের সাম্যতায় বাঁচার দিশা নিয়ে রাশিয়ায় সংঘটিত হয়েছিল। সেটাই মহান অক্টোবর বিপ্লব বা বলশেভিক বিপ্লব নামে পরিচিত।এই বিপ্লবই সমগ্র দেশের মানুষকে এক কাতারে এনে দ্রুত পাল্টে ফেলে দেশকে। গঠিত হয় বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ ও শক্তিশালী দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন।

মানুষ তার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করবে,প্রয়োজন মতো উৎপাদন করবে ও ভোগ করবে। বিনিয়োগ, মূলধন, ভূমি,উৎপাদন ইত্যাদি সবকিছুই থাকবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন।ব্যাক্তি মালিকানায় কিছুই থাকবেনা। সবই হবে সামগ্রিক। সমাজতন্ত্রের এই মূলমন্ত্রের ওপর দাঁড়িয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এগোতে শুরু করে। মানবতা সাম্যবাদকে পুঁজি করে কৃষি,শিল্প,বাণিজ্য, সংস্কৃতি সকল ক্ষেত্রেই জোরকদমে সামনের দিকে যেতে থাকে দেশ। সেই সময়ে নতুন এক সমাজ বদলের মাধ্যম চলচ্চিত্র ক্ষেত্রেও বিপ্লব আনে সোভিয়েত। মানুষকে নিয়ে, মানুষের দুঃখ- কষ্ট, সুখ,স্বপ্ন,ভালোবাসা তথা সকল বাস্তবতা নিয়ে সিনেমা তৈরি হতে থাকে রাষ্ট্রীয় সহায়তায়। সের্গেই আইজেনস্টাইনের মতো দুনিয়া কাঁপানো পরিচালকরা পৃথিবীর মানুষকে বোঝান সিনেমার আসল স্বাদ।

এক বিপ্লব এক উন্নত জাতি। তবে,এই বিপ্লবটি সহজে আসেনা। এর জন্য প্রয়োজন পড়ে বিপ্লবকাম্য জাতির সচেতনতা ও প্রস্তুতি। মহান বিপ্লবী লেনিন সেই কাজটিই করেছিলেন। তিনি রাশিয়ায় ১৯০৫ সালে সংঘটিত কিঞ্চিত সফল একটি বিপ্লব থেকে শিক্ষা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে ছুটতে থাকেন। যাদের ছাড়া কোনোভাবেই সফল বিপ্লব সম্ভব নয়।কৃষক, শ্রমিক, মেহনতিদের বোঝাতে থাকেন বিপ্লব কি ও কেন প্রয়োজন। বছরের পর বছর ছুটে চলেন এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চল। বোঝাতে থাকেন ঠিক যখন দেশ বিপ্লবের দাবী রাখবে তখনি আমাদের তার প্রতি সাড়া দিতে হবে।

কমরেড লেনিনের জন্য এই পথ সহজ ছিলনা। জেল,জুলুম,নির্বাসন সব কিছুকে উপেক্ষা করেই চলতে থাকে তার সংগ্রাম।আত্মগোপনে থেকেও বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করতে থাকেন জনগণকে। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিপ্লব ঘণিয়ে আসে। একটি প্রায় বাধ্য বিপ্লব সংঘটিত হয়। মার্চের মধ্যভাগে পরিপূর্ণভাবে পতন ঘটে ‘জার’ রাজত্বের। তারপরেই গঠিত হয় মধ্যম সরকার। পাশ্চাত্য অর্থনীতিতে বিশ্বাসী আলেকজান্ডার কেরেনস্কি সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে,কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনা দেশের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর।পুনরায় বিপ্লব শানিত হতে থাকে মজুরের চোখ ও মনের হুংকারে। এবার মহামতী লেনিনের নেতৃত্বে ও বলশেভিক পার্টির আওতায় দেশের সাধারণ জনগণের সহায়তায় ২৫ অক্টোবর সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ‘অক্টোবর বিপ্লব’।গঠিত হয় পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক সাম্যবাদী রাষ্ট্র। সূচনা হয় মুক্তির এক নতুন অধ্যায়।

পৃথিবীতে এর পূর্বে বিপ্লব সংঘটিত হয়নি তা কিন্তু নয়। তবে,অক্টোবর বিপ্লবের সাথে পূর্বের বিপ্লবগুলোর প্রধান পার্থক্য হলো- অন্য বিপ্লবগুলো শাসক শ্রেণীর রদবদল ঘটাতে সক্ষম হলেও সংখ্যালঘিষ্ঠ দ্বারা সংখ্যাগুরুর উপর শোষণের পরিবর্তন আনতে পারেনি। কিন্তু অক্টোবরের বলশেভিক বিপ্লব দুই ক্ষেত্রেই রদবদলে সক্ষম হয়। ফলে,কৃষক,শ্রমিক,মজুরদের হাতে ক্ষমতা আসে। সাধারণেরা পায় তাদের অধিকার,সকল নাগরিক পায় শিক্ষার নিশ্চয়তা,নারীরা পায় সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান। সমগ্র রাষ্ট্র থেকে ভোগবাদ,কুসংস্কার, সীমাবদ্ধতা দূরে সরে যায়। জমি,শান্তি ও রুটির শ্লোগানে সুসংঘটিত হতে থাকে নতুন তৈরী মানুষরা। অল্প সময়েই দুই-তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণের মধ্যে দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয়।সমগ্র পৃথিবীর রোল মডেল হিসেবে পরিগণিত হতে শুরু করে।
অক্টোবর বিপ্লব সোভিয়েতের বাইরেও পুরো পৃথিবীতে প্রভাব ফেলতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ইউরোপসহ বেশ কিছু দেশ সমাজতন্ত্রের পতাকা তলে স্থান নেয়। সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে আফ্রিকা, এশিয়াসহ সমগ্র পৃথিবীর প্রায় শতাধিক দেশ স্বাধীনতা লাভ করে। এমনকি আমাদের বাংলাদেশের জনগণও স্বাধীনতা সংগ্রামকালে বলশেভিক বিপ্লবের শিক্ষা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হয়।

অনেকে মনে করেন ঐতিহাসিক অক্টোবর বিপ্লব যদি মানব মুক্তির প্রকৃত প্রেসক্রিপশন হয়ে থাকে তাহলে, ৭২-৭৩ বছর পরেই তা অকার্যকর হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার মধ্য দিয়ে ব্যার্থ হলো কন? সেক্ষেত্রে কথা হলো মহান কার্ল মার্কস ও লেনিনের তত্বের ভূল থেকে নয়। প্রয়োগের সমস্যার কারণে ব্যার্থ হতে পারে বিপ্লব। আবার এটাও সত্য যে, প্রকৃতপক্ষে কোন বিপ্লব ব্যার্থ হয়না। কেননা বিপ্লবগুলো আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে যায়। অভিজ্ঞতা দিয়ে যায় যা আমাদের মুক্তির সংগ্রামে এগিয়ে চলার সাহস ও মদত যোগায়। প্রকৃতপক্ষে অক্টোবর বিপ্লব হচ্ছে সেই তাপ ও আলো যা আমাদের অন্যায়ের প্রতি ভয়াল আন্দোলন গড়ে তুলতে শেখায়। যে আন্দোলন তথা যে বিপ্লব সঠিক সময়ে ছিনিয়ে আনবে মজলুমের প্রাপ্য। সব ভেঙে, গুঁড়িয়ে-মিশিয়ে দিয়ে নির্মাণ করবে সাম্যের পৃথিবী,শোষণহীন এক সম্ভাবনার আগামী।
মহান ‘অক্টোবর বিপ্লব’ চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে পৃথিবীর ইতিহাসে। দলিত মানুষের দিশা হয়ে নতুন রুপে ফিরবে যুগে-যুগে। ভুখা-নাঙা, মেহনতিদের স্বপ্ন ও অধিকারের প্রশ্নে সাহসের মূর্তি হয়ে থাকবেন বিপ্লবী মহানায়ক কমরেড লেনিন। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পতাকা হাতে অক্টোবর বিপ্লবের চেতনার বলে সমাজতান্ত্রিক সাম্যবাদের জয় হবেই হবে!

গ্রন্থ সহায়িকা- History of the Russian revolution -Leon Trostsky এবং উইকিপিডিয়া