ফেসবুক বন্ধে লাভ-ক্ষতি কার?

জাতীয় তথ্য প্রযুক্তি

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) গত ১৮ নভেম্বর সরকারের নির্দেশে ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগের সব মাধ্যমই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। ফেসবুকে মত প্রকাশের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা থাকায় অনেক মিথ্যাচারের প্রপাগান্ডাও চলে। ফেসবুক শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, এর মাধ্যমে বিপ্লবেরও সূচনা হচ্ছে। অবাক করার বিষয় হলো ফেসবুক বন্ধ রাখায় ফেসবুকের শক্তিকে অনুভব করা যাচ্ছে।

আমাদের অনেকেই ফেসবুকের ওপর নির্ভরশীল অনেকখানি। এখন ফেসবুকের ওয়ালে কবিরা লিখেন কবিতা, গল্পকার লিখেন গল্প, প্রবন্ধকার লিখেন প্রবন্ধ। অনেকে তার সব ব্যাপার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে অতিশয় আনন্দ লাভ করেন। কেউ কেউ ফেসবুক থেকে চোখ রাখেন সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলোয়। বিনা পয়সায় ফেসবুকের ইনবক্সে গোপন আলাপ, মত ও শুভেচ্ছা বিনিময় এমনকি হৃদয় বিনিময়ের মতো ব্যাপার-স্যাপারও চলে। অস্থির এই পৃথিবীতে দূর-দূরান্তে অবস্থানরত বন্ধু, আত্মীয়স্বজনের সাথে ফেসবুকের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে পেরে পরম তৃপ্তি লাভ করি আমরা। আগে পছন্দের কিছু খুঁজতে হলে আমরা এক থেকে অন্য দোকানে ছুটে যেতাম। ফেসবুকের কল্যাণে এখন এফ-কমার্সের প্রসার ঘটেছে। ফলে পছন্দের পণ্য এখন আপনার ফেসবুক ওয়ালেই শোভা পায়।

ইন্টারনেট ব্যবহারে স্বাধীনতা
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিএনপির অবরোধ কর্মসূচি চলার সময় ‘নিরাপত্তার’ কারণ দেখিয়ে ভাইবার, ট্যাংগো, হোয়াটসঅ্যাপ, মাইপিপল ও লাইন নামে পাঁচটি অ্যাপসের সেবা বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার। তখন বলা হয়েছিল, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য এসব অ্যাপস ব্যবহার করছেন। এ ছাড়া বিতর্কিত ভিডিও না সরানোয় ২০১২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দেশে ভিডিও শেয়ারিং সাইট ইউটিউব বন্ধ করেছিল বিটিআরসি। এটি খুলে দেয়া হয় প্রায় নয় মাস পর। বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়লেও চলতি বছর ইন্টারনেটের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি পর্যবেক্ষক সংগঠন ফ্রিডম হাউজের ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত বার্ষিক জরিপ প্রতিবেদন ‘ফ্রিডম অব দ্য নেট ২০১৫’-এ এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

ব্যবহারকারীরা কতটা স্বাধীনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন- এ নিয়ে ‘ফ্রিডম হাউজ’ ৬৫টি দেশ নিয়ে গবেষণা চালায়। ২০১৩ সালের গবেষণার ফল অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যবহারে স্বাধীনতার দিক থেকে বাংলাদেশ এক শ’র মধ্যে ৪৯ নম্বর পেয়েছিল। এই ফল অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যবহারের দিক থেকে বাংলাদেশের ব্যবহারকারীরা ‘আংশিক স্বাধীন’ ছিল। ২০১৪ সালেও বাংলাদেশের অবস্থান একই ছিল। এবার সে অবস্থান থেকে কিছুটা পিছিয়েছে বাংলাদেশ। তবে এখনো ‘আংশিক স্বাধীন’ অবস্থানই রয়েছে বাংলাদেশের।

ওয়েবসাইটে প্রবেশের বাধার ক্ষেত্রে ১২, কোনো লেখায় বাধার ক্ষেত্রে ১২ ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর অধিকার আটকানোর ক্ষেত্রে ২৭ পয়েন্ট পেয়েছে বাংলাদেশ। এক শ’র মধ্যে পয়েন্ট যত কম হবে, সেই দেশটি ইন্টারনেট স্বাধীনতার দিক থেকে তত উদার। পয়েন্টের দিক থেকে শূন্য থেকে ৩০ হলে, সে দেশটি ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে স্বাধীন হিসেবে ধরা হয়েছে। পয়েন্ট ৩১ থেকে ৬০ হলে, সে দেশটিকে আংশিক স্বাধীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

ফ্রিডম হাউজের গবেষকেরা বলেন, বিশ্বের ৬১ শতাংশ মানুষ এমন সব দেশে বাস করে, যেখানে সরকার, সামরিক বাহিনী বা ক্ষমতাসীন ব্যক্তির পরিবারের সমালোচনার ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আর ৫৮ শতাংশ মানুষ এমন দেশে বাস করে, যেখানে অনলাইনে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়ে মতামত জানিয়ে কারাবন্দী হতে হয়। গুগল, ফেসবুক ও টুইটারে প্রকাশিত নানা তথ্য সরিয়ে নেয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের সরকার সেখানকার ব্যক্তি ও বেসরকারি খাতগুলোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ এখনো ‘আংশিক স্বাধীন’ অবস্থানে রয়েছে। স্বাধীন হতে যেখানে আরো সময়ের প্রয়োজন, তখন জনগণের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই ফেসবুক, ভাইবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম।

বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের সহাকারী পরিচালক তৌসিফ শাহরিয়ার স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বলা হয়, ‘ফেসবুক, ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপ তাৎক্ষণিকভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করার আপনাকে নির্দেশ দেয়া হলো।’ পরে একই রকম আরেকটি নির্দেশনায় স্কাইপ, লাইন, ট্যাংগো, হ্যাংআউটসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের ওয়েবসাইটও বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়।
যদিও বিটিআরসির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ জানিয়েছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুরোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বন্ধের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে তা সাময়িক।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার সীমিত বা বন্ধ করার বিষয়ে চলতি মাসের শুরুর দিকে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নেদারল্যান্ডস থেকে ফিরে গত ৮ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলনে জঙ্গি অর্থায়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধরতে জটিলতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ডিজিটাল করেছি। এর শুভ ফলও যেমন আছে, খারাপ ফলও আছে। আমরা থ্রিজি ও ফোরজিতে চলে গেছি। এ কারণে জঙ্গিরা ইন্টারনেট, ভাইবার থেকে শুরু করে নানা ধরনের অ্যাপস ব্যবহার করে জঙ্গিকার্যক্রম চালাচ্ছে। সে জন্য আমাদের চিন্তাভাবনা আছে, যদি খুব বেশি ব্যবহার করে, হয়তো একটা সময়ের জন্য বা কিছু দিনের জন্য বন্ধ করে দেবো।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বার জানিয়েছেন, সরকার যা করছে তা মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো অবস্থা। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ প্রযুক্তি দিয়েই মোকাবেলা করতে হবে। অ্যাপস বন্ধ না করে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিই সমাধান। এজন্য আমাদের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম জনবল তৈরির ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। যদিও এ ক্ষেত্রে আমরা রাষ্ট্রকে দুর্বল দেখতে পাই। এখন যে অবস্থা হয়েছে সেটা সরকারের অবহেলার জন্য হয়েছে। এ জন্য প্রযুক্তিগত অপরাধ মোকাবেলার মতো পর্যাপ্ত প্রযুক্তি ও জনবল দরকার। এখনই এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ আমরা সামাল দিতে পারব না।

 

সুত্রঃ নয়া দিগন্ত