বগুড়ায় জমে উঠেছে ‘গরিবের ঈদ বাজার’

বগুড়া রাজশাহী বিভাগ

বগুড়ার একটি পাটকলে শ্রমিকের কাজ করেন সারিয়াকান্দির যমুনা নদীর দুর্গম কাজলার চরের রাশেদা বেগম (৪০)। স্বামী-সন্তানেরা থাকেন চরের বসতভিটায়। মাস শেষে বেতনের টাকা হাতে পেলে শহর থেকে চাল-ডাল, বাজার-সওদা কিনে দেড়-দুই ঘণ্টা নৌকায় পাড়ি দিয়ে পরিবারের কাছে যান।

ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবেন রাশেদা। এ জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বেতনের আগাম ১ হাজার ২০০ টাকা নিয়ে পরিবারের জন্য কেনাকাটা করতে এসেছেন। গতকাল রোববার ফুটপাত থেকে ছেলের জন্য ২৫০ টাকায় শার্ট-জুতা, মেয়ের জন্য ৩৫০ টাকায় রঙিন জামা-জুতা, ৩৫০ টাকায় স্বামীর জন্য পাঞ্জাবি-লুঙ্গি কিনেছেন।

দুপুর ১২টার দিকে শহরের কাঁঠালতলায় ফুটপাতের রাশেদা একটি দোকানে নিজের জন্য শাড়ি কিনতে দর-কষাকষি করছিলেন। দোকানি ২৭০ টাকার কমে বিক্রি করবেন না। পরিবারের জন্য কেনাকাটা শেষে তাঁর হাতে আছে ২৫০ টাকা। এর বেশি তিনি দিতে পারবেন না। দোকানি ২৫০ টাকাতেই রাজি হলেন। তবে দোকানি বললেন, ‘লন, ঈদে অনেক ব্যবসা করেছি। আপনার কাছে লাভ করব না।’ রাশেদা স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘গরিবের ঈদ বাজারে ১ হাজার ২০০ টেকা অনেক বেশি।’

কাঁঠালতলার মতোই শহরের সাতমাথা, কবি নজরুল ইসলাম সড়ক, ফুল মার্কেট, হকার্স মার্কেটের সামনে ফুটপাতে জমে উঠেছে স্বল্প আয়ের মানুষদের ঈদের কেনাকাটা। ‘গরিবের ঈদ বাজার’-এ ছেলেদের শার্ট-গেঞ্জি-পাঞ্জাবি মিলছে ১০০ থেকে ২০০ টাকায়। মেয়েদের রঙিন জামা ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। ছেলে-মেয়েদের জুতা-স্যান্ডেল বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। লুঙ্গি-শাড়ি ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে কেনাবেচা।

শহরের কবি নজরুল ইসলাম সড়কের ফুটপাতের পোশাকবিক্রেতা রুবেল হোসেন বলেন, দিনে ভিড় করছেন গ্রাম থেকে কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতারা। ইফতারের পর শহরের শ্রমজীবী ক্রেতারা।

শহরের নামাজগড় এলাকার একটি মোটরসাইকেল সারাইখানায় কাজ করেন মোহসেন আলী। গতকাল স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছিলেন রেলওয়ে হকার্স মার্কেটে। কথা বলার ফাঁকেই ১০ বছরের মেয়ের জন্য একটা ফ্রকের দর-কষাকষি করেন মোহসেন। দোকানি গুলজার হাঁকেন ৪০০ টাকা। মোহসেন বলেন, ১০০। শেষ পর্যন্ত ১৫০ টাকা দাম করে রাজি না হওয়ায় পা বাড়াতেই ডাক দেন বিক্রেতা। বলেন, ‘ভাই, লিয়ে যান।’ মেয়ের জামা কেনার পর ১২ বছরের ছেলের জন্য ১৫০ টাকায় গেঞ্জি কিনলেন তিনি। শেষে স্ত্রীর জন্য থ্রি-পিস ও জুতা কেনার জন্য সামনে পা বাড়ালেন।

শহরের রেললাইনের ওপর হঠাৎ মার্কেটে ছোট বোনকে নিয়ে সালোয়ার-কামিজ কিনতে এসেছেন হোটেলশ্রমিক মজনু মিয়া। দীর্ঘক্ষণ ঘুরেও বোনের জামা পছন্দ না হওয়ায় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের কোচাশহরের মজনু বলেন, ‘দ্যাখেন তো কী যন্ত্রণা! এক ঘণ্টা ধরে জামা দেখছি। সালোয়ার পছন্দ হয়, তো কামিজ পছন্দ হয় না। কামিজ পছন্দ হয় তো টাকায় কুলায় না।’ শেষ পর্যন্ত সাড়ে চার শ টাকায় একটা থ্রি-পিস কিনে হকার্স মার্কেটের দিকে ছুটলেন তাঁরা।

শহরের একটি বহুতল ভবনে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি করেন নন্দীগ্রামের কাথম এলাকার মোকছেদুল। ছেলেমেয়েদের জন্য তিনি কবি নজরুল ইসলাম সড়কের একটি দোকানে জামাকাপড় পছন্দ করছিলেন। তিনি বলেন, পকেটে রয়েছে ৫০০ টাকা। কিন্তু ওই দামে পছন্দসই জামাকাপড় মিলছে না।

কবি নজরুল ইসলাম সড়কের ফুটপাতের দোকানি আসলাম হোসেন বলেন, এবার পুলিশের উৎপাতে বেচাকেনা জমছে না।

জুয়েল মিয়া নামের একজন দোকানি বলেন, ফুটপাতে স্থায়ী ও ভাসমান মিলে ৩০০-এর বেশি দোকান রয়েছে। এর বাইরে ভ্যানগাড়িতে দোকানের পসরা সাজিয়েছেন প্রায় ১০০ ব্যক্তি। পুলিশের তাড়া খেয়ে এসব ভ্যানগাড়ি নিয়ে দোকানিরা শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরছেন।

আট বছরের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে জুতা কিনতে এসেছেন কাহালুর পাইকড় গ্রামের আনেছা বেগম। ২০০ টাকায় তিনি মেয়ের জন্য জুতা কিনলেন। তবে দোকানি বললেন, ‘এ দামে জুতা বেচে লাভ হয় না।’

খবরঃ প্রথম-আলো

2 thoughts on “বগুড়ায় জমে উঠেছে ‘গরিবের ঈদ বাজার’

Comments are closed.