বগুড়ায় ৩৬ কোটি টাকার বাঁধ এখন ‘অভিশাপ’

বগুড়া রাজশাহী বিভাগ

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার কর্নিবাড়ি থেকে চন্দনবাইশা পর্যন্ত আট কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বিকল্প বাঁধ ১৮টি গ্রামের মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। যমুনা নদীর তীরবর্তী তিনটি ইউনিয়নের এসব গ্রামকে মাঝখানে রেখে বাঁধটি নির্মাণ করায় এসব এলাকা ভাঙনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।

যমুনা নদীর ভাঙন থেকে নদীপারের মানুষকে রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) দুই বছর আগে ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বিকল্প বাঁধটি তৈরি করে। এখন সেটি রক্ষার জন্য নদীর তীরে সিসি ব্লক ও বালুভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলতে ব্যয় করা হচ্ছে আরও প্রায় ৩২৬ কোটি টাকা।

কামালপুর, চন্দনবাইশা ও কুতুবপুর ইউনিয়নের ভুক্তভোগী লোকজন বলেন, ২০১৫ সালে এসব ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামকে মাঝখানে রেখে নদী থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূর দিয়ে বিকল্প বাঁধটি তৈরি শুরু করে পাউবো। সে সময় এর বিরুদ্ধে ঝাড়ুমিছিল করেন এলাকাবাসী। স্থানীয় সাংসদের কাছেও ধরনা দেন। এরপরও পাউবো বাঁধ নির্মাণ শেষ করে। তারপর থেকে২০টি গ্রামনদীর ভাঙনের শিকার হয়। এর মধ্যে ঘুঘুমারি মধ্যপাড়া ও নিজ চন্দনবাইশা গ্রাম ভাঙনে বিলীন হয়েছে। বাকি ১৮টি গ্রামও ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি বর্ষায় তিন মাস এসব গ্রামের মানুষকে বাঁধে আশ্রয় নিতে হয়।

এলাকাবাসী ও পাউবো সূত্রে জানা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীরবন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সারিয়াকান্দির রোহদহ থেকে দড়িপাড়া পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করে পাউবো।

২০১৪ সালের জুনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাঁধ বুঝে দেওয়ার এক মাসের মধ্যে যমুনায় পানি বেড়ে বাঁধটির ৩০০ মিটার ধসে যায়। ভেঙে যাওয়া অংশে নতুন করে ‘বিকল্প রিং বাঁধ’ নির্মাণ এবং সেখানে ৭৫ হাজার জিও ব্যাগ ফেলতে পাউবো ওই সময় আরও প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয় করে। কিন্তু দুই দফায় প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয় করার পরও ওই বছরের ২৯ জুলাই রোহদহ বাজারের কাছে বাঁধ ধসে গিয়ে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পদহানি ঘটে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ওই বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার পর পাউবো পরের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে কর্নিবাড়ি থেকে চন্দনবাইশা পর্যন্ত বিকল্প বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। জমি অধিগ্রহণ না করেই ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধটি তৈরি করা হয়। পরে বিকল্প বাঁধ এবং ৫ দশমিক ৯ কিলোমিটার নদীতীর প্রতিরক্ষামূলক কাজের জন্য ৩২৬ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড এ কাজ করছে।

এলাকার লোকজন বলেন, নদী থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে নির্মাণ করায়২০টি গ্রামবাঁধের ভেতরে পড়ে। গ্রামগুলো হলো চন্দনবাইশা ইউনিয়নের চন্দনবাইশা, চরচন্দনবাইশা, ঘুঘুমারি শেখপাড়া, ঘুঘুমারি দক্ষিণপাড়া, ঘুঘুমারি মধ্যপাড়া ও নিজ চন্দনবাইশা, কামালপুরের রোহদহ, ফকিরপাড়া, ইছামারা, আকন্দপাড়া, গোদাখালি, বয়ড়াখালি ও হাওড়াখালি এবং কুতুবপুরের ধলিরকান্দি, ছোট কুতুবপুর, বয়রাকান্দি, নিজ কর্নিবাড়ি, বরইকান্দি, কর্নিবাড়ি ও বয়রাকান্দি। এর মধ্যে গত দুই বছরে ঘুঘুমারি মধ্যপাড়া ও নিজ চন্দনবাইশা গ্রাম দুটি ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। আরও সাত-আটটি গ্রামযমুনা গ্রাস করেছে।

রোহদহ পূর্বপাড়ার বিমল কুমার সাহা বলেন, ‘১৮ বিঘা ধানি জমি ছিল। ছিল বসতভিটা, মাছভরা পুকুর ও গাছভরা ফল। যমুনা সব গিলে ফেলেছে। এখন বাঁধে মুদি দোকান দিয়ে জীবিকা চালাই।’ তিনি বলেন, এ গ্রামে ৪ হাজার পরিবার ছিল। ৩ হাজার পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। এখন ১ হাজার পরিবার পৈতৃক ভিটায় রয়েছে। কিন্তু তিন মাস বাঁধে আর নয় মাস ঘরে কাটাতে হয়। বিকল্প বাঁধটা নদীর আধা কিলোমিটার দূরে নির্মাণ করলে ১৫টা গ্রাম রক্ষা পেত।

বিজিবির অবসরপ্রাপ্ত সদস্য হাকিম খান বলেন, ‘রোহদহ গ্রামে ১০ বিঘা জমি ছিল। ছিল বাপ-দাদার বসতভিটা, কবর। এখন নদীতে বিলীন। এখন বাঁধের পশ্চিম পারে আশ্রয় নিয়েছি।’

নওখিলা পিএন উচ্চবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আহসান রেজা বলেন, ‘প্রাচীন এ জনপদের ৮-১০টি গ্রাম নদীতে বিলীন হলো। নতুন বাঁধ নির্মাণের আগে কত আকুতি–মিনতি করেছি। কেউ সে আকুতি শোনেননি। এখন বাড়িঘর হারিয়ে এলাকাছাড়া।’

পাউবো বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন বলেন, আগে নদীর কাছাকাছি বাঁধ করা হয়েছিল। সেটি রক্ষা হয়নি। ফলে বিশেষজ্ঞ দলের নিরীক্ষার ভিত্তিতে নদী থেকে নিরাপদ দূরত্বে বিকল্প বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। কিছু মানুষকে রক্ষা করা না গেলেও এ বাঁধ যমুনা নদী থেকে সারিয়াকান্দিবাসীর রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। নতুন করে ৩২৬ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে গত বছরের এপ্রিলে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। কাজের মধ্যে রয়েছে ৫০০ মিটার নদী খনন, নদীতীরে ৩০ লাখ সিসি ব্লক ও ১৩ লাখ জিও ব্যাগ ফেলা।

গত সোমবার প্রকল্প এলাকা ঘুরে ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীতীর সংরক্ষণের কাজ ১৪ মাসে ৫০ শতাংশও শেষ হয়নি। নদী খননের কাজ এখনো শুরুই হয়নি। ধীরগতিতে চলছে সিসি ব্লক ও জিও ব্যাগ ফেলার কাজ। এ কারণে বিকল্প বাঁধ হুমকিতে পড়েছে। বাঁধের কয়েকটি অংশ ধসে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুতুবপুর এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ রক্ষায় ১৭০ মিটার অংশে সিসি ব্লক ফেলা হচ্ছে। বাঁধ সংরক্ষণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনের সাংসদ আবদুল মান্নান গত সোমবার ঘুঘুমারি এলাকায় একটি অনুষ্ঠানে বলেন, ‘৩৫ কোটি টাকার এই বাঁধ নির্মাণের সময় আপনারা ঝাঁটা নিয়ে বাধা দিয়েছিলেন। এটি নির্মাণ করা না হলে বগুড়া শহরে নৌকায় যাতায়াত করতে হতো। সকলকে দরদ দিয়ে এ বাঁধ রক্ষা করতে হবে।’

খবরঃ প্রথম-আলো