বরেন্দ্র অঞ্চলে বিলুপ্তি পথে মাটির তৈরি টালির ঘর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ রাজশাহী রাজশাহী বিভাগ

বরেন্দ্র অঞ্চলে এক সময় মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম বাসস্থান হিসেবে মাটির তৈরি টালি ঘরের ব্যাপক প্রচলন ছিল। গ্রাম এবং শহরে হরহামেশা চোখে পড়তো লালচে রংয়ের টালির ঘর বা চালা। কিন্তু এখন আর এগুলো খুব একটা চোখে পড়ে না। যুগের পরির্বতনের সাথে শহরের পাশাপাশি গ্রামের মানুষের রুচি বোধের পরিবর্তন হয়েছে শতভাগ। জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈরি টালির চালা।
দেড় যুগ আগেও গ্রামের ৩০ থেকে ৪০ ভাগ একতলা বা দ্বিতল মাটির বাড়িতে বাস গৃহের প্রাচীন ঐতিহ্য টালির চালা ব্যবহার হতো। কাঠ বা বাঁশের ফ্রেমের উপর থরে থরে ছোট ছোট টালি সাজানো থাকতো। যা ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। যতদিন ফ্রেম পচে নষ্ট না হয় তত দিন টালির চালে আর কোন খরচ লাগেতো না। টালি চালায় আগুনে বা বৃষ্টিতে নষ্ট হয় না।

তবে, বরেন্দ্র অঞ্চলের দুই বাড়িতে এখনো দেখা মিলছে মাটির তৈরি টালির চালা। রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাঁচন্দর স্কুলপাড়া গ্রামের মুঞ্জুর রহমান (লালু) বাড়িতে। অপরটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার লক্ষিপুর গ্রামে মৃত আব্দুল লতিবের বাড়ির চালায় সোভা পাচ্ছে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈরি টালি।

রোববার তানোর উপজেলার পাঁচন্দর স্কুলপাড়া গ্রামের মাটির তৈরি টালির বাড়ির মালিক মুঞ্জুর রহমান লালুর সাথে কথা হয়। তিনি জানান, ৩৫ বছর আগে নতুন মাটির বাড়ি তৈরি করে মাটি তৈরি টালি দিয়ে চালা করেছেন তিনি। এখন পর্যন্ত রয়েছে তার ঘরের চালায় মাটির টালি। টালির ঘরে বসবাস করা বেশ আরাম। গরমের সময় টালির ঘর ঠান্ডা থাকে। তিনি আরও জানান, রান্না ঘরে টালির চালা থাকলেও ধোঁয়া বেরুতে কোনো অসুবিধা হয় না।

তিনি আরো জানান, ওই যুগ শেষ। এখন ইচ্ছে থাকলে আর নতুন করে টালি দিয়ে ঘরের চালা করতে পারবেনা। মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামেও এসেছে আধুনিকতার শোয়া। তাই তার সন্তানেরা এ মাটির তৈরি টালি দিয়ে আর ঘরের চালা করতে চাই না।

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার লক্ষ্মিপুর গ্রামে মৃত আব্দুল লতিবের বাড়ির গিয়ে দেখা মিললো মাটির তৈরি টালি চালা দ্বিতল মাটির বাড়ি। কথা হয় মৃত আব্দুল লতিবের বড় ছেলে আরিফ এর সাথে।

আরিফ জানান, বাবা খুব সৌখিন মনের মানুষ ছিলেন। সখের বসে দুইতলা মাটির বাড়িতে টিনের বদলে মাটির টালি দিয়ে ঘরের চালা করেছিলে। বাবা ঐতিহ্য ধরে রাখতে তারা এখনও মাটির তৈরি টালির বাড়িতেই বসবাস করতে চাই। এছাড়াও কুমারেরা আর টালি বানায় না। বর্তমানে কোথাও নতুন করে টালির ঘর তৈরি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। আবার পুরাতন ঘর সংস্কারকল্পে টালির ব্যবহারও করতে চাইলেও টালি পাওয়া যায় না।

রাজশাহীর তানোর উপজেলা সদরের পালপাড়া মোহন কুমার জানান, কয়েক পুরুষ আগে থেকে তারা মাটির তৈরি সকল উপকরণ তৈরি করে আসছে। আমার বর্তমান বয়স এখন ৫০ বছর হতে চলেছে। মাটির তৈরি টায়েল বাবা সাথে যুবক বয়সে তৈরি করেছেন তিনি। এরপর থেকে প্রায় ৩০ টায়েল বানানি তিনি।

কারণ বলতে তিনি আরো জানান, টালির প্রচলন শেষ হয়ে গেছে। মানুষ ঘরে বাড়িতে টালির বদলে টিন ব্যবহার শুরু করেছে।

খবরটি প্রকাশ করেছেঃ দৈনিক সোনালী সংবাদ

2 thoughts on “বরেন্দ্র অঞ্চলে বিলুপ্তি পথে মাটির তৈরি টালির ঘর

Comments are closed.