বাংলাদেশে কম্পিউটার ব্যবসায় ধস

তথ্য প্রযুক্তি

দেশে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার ঘটলেও ক্রমেই কম্পিউটার ব্যবসা থেকে সরে আসছেন এ খাতের সংশ্লিষ্টরা। গত তিন বছরে দেশের ৩২টি পরিবেশক প্রতিষ্ঠান, মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের প্রায় ১০০টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। বেশকিছু প্রতিষ্ঠান কোনো রকমে টিকে আছে। কয়েকটি অচিরেই বন্ধের পর্যায়ে রয়েছে। আবার অনেকে তাদের ব্যবসার পরিসর ছোট করে এনেছেন। রাজধানীর আল্পনা প্লাজা, সুবাস্তু টাওয়ার ও আইডিবি ভবনের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও একই অবস্থা। এদিকে বড় কম্পিউটার ব্যবসায়ীদের প্রায় ৯০ শতাংশ ব্র্যান্ডের কম্পিউটার বিক্রি কমেছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেও কম্পিউটার সামগ্রীর ব্যবসায়ীদের জন্য বাজেটে কোনো বরাদ্দ নেই। এছাড়া শুধু কম্পিউটারের কাস্টম ডিউটি ৮ শতাংশের মধ্যে থাকলেও এ-সংক্রান্ত অন্যান্য প্রডাক্টে এ হার ৩৭ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত, যা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে অন্যতম প্রধান বাধা। এদিকে কম্পিউটার সামগ্রীর দামের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত কোনো সীমারেখা নেই। একই পণ্য বিভিন্ন খুচরা ব্যবসায়ী বিক্রি করছেন ভিন্ন ভিন্ন দামে। এক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ নেই দেশের কম্পিউটার ও কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ আমদানিকারক, পরিবেশক, বাজারজাতকারী, খুচরা বিক্রেতাদের সংগঠন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির।

জানা গেছে, নির্ধারিত মূল্যহার না থাকায় কম দামে বেশি বিক্রির অসুস্থ প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে বিভিন্ন পরিবেশক প্রতিষ্ঠানের অপেশাদার আচরণে এ খাত থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের বেশকিছু পরিবেশক প্রতিষ্ঠান খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে যে দামে প্রডাক্ট বিক্রি করছেন, একই দামে সরাসরি বিক্রি করছেন ব্যবহারকারীদের কাছেও, যা এ ব্যবসার সম্প্রসারণে একটি বাধা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। দেশের কম্পিউটার ব্যবসায়ীদের অনেকে ব্যাংকঋণের চাপে ছেড়েছেন দেশ। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে ৫ হাজার কোটি টাকার এ বাজার ক্রমে বড় হচ্ছে। দিন দিন এ সামগ্রীর ব্যবহার বাড়লেও শুধু অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন তরুণ উদ্যোক্তারা। বছর দুয়েক আগে ব্যবসা বন্ধ করেছে পরিবেশক প্রতিষ্ঠান এডেক্সেল। খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ২ কোটি টাকার বেশি বকেয়া রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানের। এছাড়া গত দুই বছরে কমভ্যালি, খান জাহান আলী কম্পিউটারস, ডেস্কটপ কম্পিউটারের মতো পরিবেশক প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার সামগ্রীর ব্যবসা থেকে সরে এসেছে। আইডিবি ভবনের অন্যতম পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ডলফিন কম্পিউটার বিক্রি হয়ে গেছে ড্যাফোডিল কম্পিউটারের কাছে।

খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে প্রায় ১০ কোটি টাকা রয়েছে দেশের বৃহত্তম পরিবেশক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ব্র্যান্ডের। ব্যবসার এ অবস্থায় টিকে থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবদুল ফাত্তাহ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, কম্পিউটারের বাজারটা চলছে বাকিতে ব্যবসার ওপর। অনেক প্রতিষ্ঠান এর ফলে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরো অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবেন। এ ব্যবসা করে টিকে থাকা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই এর পাশাপাশি অন্য কোনো খাতে ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনা করছেন তিনি। তিনি আরো বলেন, সরকারেরও এ খাতে বিশেষ কোনো নজর নেই। পাশাপাশি এসব পণ্যের মূল্যহার নির্ধারণেও সরকারি বা বেসরকারি পক্ষ থেকে কেউ উদ্যোগী হয়নি।
এদিকে গত এক দশক আগেই দেশে ব্র্যান্ড পিসির কদর ছিল। এইচপি ও ডেল ব্র্যান্ড পিসি খাতে একচেটিয়া ব্যবসা করেছে। গত বছরের শেষ দিকে কম্পিউটার বিক্রি কিছুটা বাড়লেও বিক্রি কমেছে ব্র্যান্ড পিসির। বিভিন্ন অফিস আগে ব্র্যান্ড পিসি ব্যবহার করলেও বর্তমানে তারাও কাস্টমাইজ পিসি ব্যবহার করছে। তাছাড়া বিক্রয়োত্তর সেবার দিক থেকেও কোনো পার্থক্য না থাকায় ব্যয় কমাতে সবাই বর্তমানে কাস্টমাইজ পিসি ব্যবহার করছে। দেশে কম্পিউটার বিক্রেতা বড় দুই প্রতিষ্ঠান ফ্লোরা লিমিটেড ও কম্পিউটার সোর্স বলছে, বর্তমানে তাদের ব্র্যান্ড পিসি বিক্রি ৯০ শতাংশ কমে ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির মহাসচিব নজরুল ইসলাম মিলন বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কম্পিউটার ব্যবসা খাতে অস্থিরতা চলছে। বিষয়টি আমাদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। সম্প্রতি প্রডাক্টের মূল্য নির্ধারণ-সংক্রান্ত একটি নীতিমালা আমরা তৈরি করেছি। তবে কীভাবে এর প্রয়োগ হবে, সে বিষয়ে কাজ চলছে। আশা করছি শিগগির এসব সমস্যার সমাধান হবে।