বাগমারায় রাতের বেলায় অসহায়দের দরজায় ওসির উপহার প্যাকেট!

বাগমারা রাজশাহী

রাতে পুলিশের গাড়ি দেখে সটকে পড়েন কয়েক যুবক। একটু আড়ালে যান তাঁরা। লক্ষ্য করেন গাড়িটি থামে গ্রামের একজন গরীব লোকের বাড়ির পাশে। গাড়ি থেকে দুইজন পুলিশ নেমে একটি থলে ওই বাড়ির দরজা পাশে রেখে চলে আসতে থাকেন। এসময় টের পেয়ে যান বাড়ির মহিলা। পরে তাঁকে জানানো হয় এটি বাগমারা থানার ওসির উপহার তাঁর পরিবারের জন্য। ওই নারী উপহারের প্যাকেটটি বাড়ি নিয়ে যান। এভাবে রাতের বেলায় বাগমারা থানার ওসির ত্রাণ বিতরণের বর্ণনা দেন উপজেলার বড়বিহানালী গ্রামের কয়েকজন যুবক।

রাজশাহীর বাগমারা থানার ওসি গত তিনদিন ধরে রাতের বেলায় এভাবে করোনাকালে বেকার ও অসহায় হয়ে পড়া পরিবারের জন্য উপহার নিয়ে হাজির হচ্ছেন। এই ধারা অব্যাহত রাখা হবে বলে জানিয়েছেন। রাতের বেলায় ওসির উপহার সামগ্রী বিতরণে তিনি প্রশংসার ভাসছেন, সাড়াও ফেলেছে এলাকায়।

বাগমারা থানার ওসি আতাউর রহমান গত শনিবার রাত থেকে শুরু করেছেন করোনাকালে বেকার ও অসহায় হয়ে পড়া লোকজনদের বাড়িতে নিজের টাকায় কেনা উপহার পৌঁছানো। প্রতিদিন রাত নয়টার পর তিনি গাড়ি নিয়ে নিয়মিত টহলে বের হন। সঙ্গে নেন উপহারের প্যাকেট। যেখানে রয়েছে নিজের টাকায় কেনা ১০ কেজি করে চাল। টহলের পাশাপাশি আগ থেকে প্রস্তত করা তালিকা ধরে লোকজনের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে উপহারের প্যাকেট। অনেক সময় বাড়ির মালিক জানছেন না কে রেখে গেছেন এই উপহারের প্যাকেট। আবার অনেক স্থানে উপহারের প্যাকেট দরজার সামনে রেখে রাখার সময় টের পাচ্ছেন তালিকাভূক্ত ব্যক্তিরা।

তালিকা প্রস্তুতেও চরম গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছে। যেসব ব্যক্তি করোনা সংকটে পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েছেন, সরকারি বা বেসরকারি ত্রাণ পাচ্ছেন না অথবা লজ্জায় নিজেদের অভাবের কথা অন্যকে বলতে পারছেন না, এমন ব্যক্তিদের নির্বাচিত করেছেন উপহারের জন্য। উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌরসভায় এই ধরণের ১৮জন ব্যক্তি বা পরিবারকে নির্বাচিত করা হয়েছে। সে হিসাবে চাল কেনা হয়েছে। গোপনে পুলিশ ওইসব ব্যক্তিদের নির্বাচিত করেছেন। সে অনুসারে রাতের বেলায় তাঁদের দেওয়া হচ্ছে ওসির উপহারের প্যাকেট।

থানার ওসি আতাউর রহমান বলেন, নিজের বেতন ও জমানো টাকায় শুধুমাত্র চাল কেনা হয়েছে। রাতে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি এই তালিকাভূক্তদের দরজায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে উপহারের প্যাকেট। দিনের বেলায় বিতরণ করলে অনেকে লজ্জায় নিতে আগ্রহ দেখাবেন না। এছাড়াও তাঁর সামান্য পরিমান উপহার সবাইকে দিতে পারবেন না। এতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে পারেন এমন আশংকা থেকে রাতের বেলায় উপহারের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তিনি গোপনেই এটা বিতরণ করছেন এবং করবেন বলে জানিয়েছেন।

বড়বিহানালী ইউপি চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান বলেন, গত রোববার রাতে তাঁর এলাকায় পুলিশ এসেছে এমন জানতে পেরে একজন বৃদ্ধার বাড়ির সামনে গিয়ে ওসির উপহারের প্যাকেট রেখে আসতে দেখেন। ওই রাতে তাঁর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি বাড়িতে উপহারের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়ার খবর তিনি পেয়েছেন। একজন পুলিশ কর্মকর্তার এমন মানবিক কার্যক্রমে তিনি বিস্মিত বলে মন্তব্য করেন। ওই রাতেই তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ওসির প্রশংসা করে একটি স্ট্যাটাস দেন। উপজেলার আরও কয়েকজন রাজনীতিক নেতা এবং জনপ্রতিনিধিও পুলিশ কর্মকর্তার এমন ত্রাণ তৎপরতার প্রশংসা করেন।
ছোটকয়া গ্রামের বাসিন্দা বৃদ্ধ বিনয় কুমারের সঙ্গে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বিষ্ময় প্রকাশ করে বলেন, রাতের বেলায় তাঁর বাড়িতে পুলিশ গাড়ি নিয়ে আসায় ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। পরে তাঁকে একটি থলে ধরে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ এমন কাজ করতে পারে তা আগে ভাবনায় ছিল না বলে জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাড়িয়া ইউনিয়নের তিনজন ব্যক্তি জানান, তাঁরা এ পর্যন্ত কোনো ত্রাণ পাননি। তবে সোমবার রাতে তাঁদের বাড়ির দরজার সামেন উপহারের থলে রেখে গেছেন। পরে টের পেয়েছেন এটি ছিল থানার ওসির উপহারের প্যাকেট।
থানার ওসি আরও বলেন, থানার অনেকে তাঁর এই কার্যক্রমে সহযোগিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আগামিতে এই পরিসর বাড়ানোর চিন্তাভাবনা রয়েছে। দেশের এই সংকটে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে পেরে ভালো লাগছে।

খবর কৃতজ্ঞতাঃ দৈনিক সানশাইন