বেতন নেই চালকদের, বিআরটিসির টাকা যাচ্ছে কোথায়?

জাতীয়

রাস্তায় দেদারসে চলছে বিআরটিসির বাস। কিন্তু দিনশেষে হিসাব মিলছে না। ব্যয় দেখানো হচ্ছে বেশি। আয় কম। বাস যাচ্ছে ‘রিজার্ভে’, কিন্তু বলা হচ্ছে বাস আছে ট্রিপে। ‘রিজার্ভে’ গেলে বাস বেশি টাকা আয় করে, কিন্তু ট্রিপ হিসেব দেখিয়ে কম আয় দেখানো হচ্ছে।

হিসাবে-বেহিসাবে তেল কেনা চলছে বাসের। কিন্তু এতো তেল কি লাগে বিআরটিসির বাসে?

বিআরটিসির জোয়ার সাহারা ডিপোতেই এই সমস্যাগুলো দানা বেঁধেছে। ব্যয় বেড়ে গিয়ে দিনের পর দিন চালক হেলপারদের বেতন আটকে আছে। ডিপোর মধ্যম সারির বিআরটিসি কর্মকর্তাদের লুটপাটের কারণে বেতন পাচ্ছেন না– এমন অভিযোগ চালকদের। প্রতি মাসে ডিপোতে বেতন বাবদ দিতে হয় ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু অভিযোগ আছে, গত চার মাসে একটি টাকাও পাননি কোনো চালক-হেলপার-টেকনিয়াশিয়ান।

বুধবার সন্ধ্যায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বিআরটিসি জোয়ার সাহারা ডিপো অফিসের ক্যাশ কাউন্টারে চালক-শ্রমিকদের দীর্ঘ লাইন ছিলো। গত বছরের পাওনা বেতন নিতেই এ লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তারা। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতে অনেকেই ফিরে গেছেন বেতন না পেয়ে। বেতন না পাওয়াদের সংখ্যা চারশো’র ওপরে।

বিআরটিসি সূত্র জানায়, গত বছরের নভেম্বর থেকে বেতন বন্ধ আছে চার শতাধিক চালক-হেলপার, টেকনিশিয়ান শ্রমিকের। চার মাস ধরে দারুণ অর্থকষ্টে দুর্বহ দিন কাটছে তাদের। বেতন চাইলে উল্টো ঢাকার বাইরে বদলিসহ নানা বিপদের মধ্যে পড়তে হয় বলে মুখ খুলে কিছু বলতে পারেন না তারা।

জোয়ার সাহারাসহ কিছু ডিপোতে বেশকিছু বকেয়া বাকি থাকার ঘটনা সঠিক বলে জানিয়েছেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মিজানুর রহমান।

তিনি জানান, বেতন বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ায় একটু সমস্যা হয়ে গেছে। আর জোয়ার সাহারায় বেতন নিয়ে সমস্যা আছে এটা ঠিক।

এ অবস্থায় জোয়ারসাহারা ডিপোর ম্যানেজারকে বদলি করা হয়েছে অন্যত্র। মতিঝিলে বিআরটিসির সদর দপ্তরে বৈঠক ডেকে লোকসানে পড়া জোয়ার সাহারা ও মিরপুর ১২ নম্বর ডিপোতে নতুন ম্যানেজার আনা হয়েছে।

জোয়ার সাহারা ডিপো সূত্র জানায়, ম্যানেজার পরিবর্তন হলেও জোয়ার সাহারা অফিসের পিয়ন-কন্ডাক্টরসহ কয়েকজনের একটি সিন্ডিকেট পুরো ডিপো নিয়ন্ত্রণ করে।

পিয়ন রবিউল, স্টোর কিপার দেলোয়ার, এসি বাসের হেডমাস্টার মশিউর, দু’তলা বাসের হেডমাস্টার ফারুক-এদের নিয়েই এই সিন্ডিকেট। এই চারজনের হাতে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার নয়-ছয় হয়। যা উপরমহল জানে না। তাদের নিয়ন্ত্রণকর্তা সিবিএ সেক্রেটারি হাবিব।
তিনি তাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেন। বিনিময়ে কমিশন আছে—এমন কথা এ ডিপোর সবার মুখে মুখে।

যোগাযোগ করা হলে সিবিএ সেক্রেটারি হাবিব পুরো অভিযোগ অস্বীকার করেন। বেতন নিয়মিত হচ্ছে এবং ডিপোতে কোনো সমস্যা নেই বলে দাবি তার।

কিন্তু চালক-শ্রমিকরা বেতন নিতে ডিপোতে ঘুরছেন—একথা তাকে জানালে তিনি চালকদের বেতন পরিশোধ বিলম্বিত হওয়ার সত্যতা স্বীকার করেন।

ডিপোতেই গিয়ে জানা গেছে, এসি বাসের চালকরা লিজ নেয়া কাউন্টার কোম্পানি থেকে দিনে ২০০ টাকা পান। যে টাকা থেকে ৫০ টাকা দিতে হয় মশিউরকে। আর তেল কেনায় নয়ছয় করেন রবিউল। দু’সপ্তাহ আগে একদিনে প্রায় ৪০ হাজার টাকার তেল কেনার অনিময়ম ধরা পড়লে হুলস্থুল পড়ে যায় ডিপোতে।

এখানে আগে ম্যানেজার ছিলেন এমন একজন জানান, রবিউল, মশিউর, ফারুক তারাই মূলত ডিপোর হর্তাকর্তা। তেল কিনে বেশি দামের ভাউচার দেখান রবিউল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিসির চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, দু’একটি ক্ষেত্রে অনিয়ম ধরা পড়ার পর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে অনিয়মের কারণে কল্যাণপুর ডিপোতে মামলা করা হয়েছে।

জোয়ার সাহারার বিষয়টিতে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান তিনি। এছাড়া যে ডিপোগুলো অর্থসংকটে পড়েছে –সেগুলোতে ম্যানেজার পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে পিছিয়ে পড়া মিরপুর ১২ থেকে একজন ভালো ম্যানেজার দেয়া হয়েছে বলেও জানান চেয়ারম্যান।

খবরঃ বাংলানিউজ