ভূতের ভয়ে শিক্ষার্থী শূন্য স্কুল!

জাতীয়

খাগড়াছড়ির গোলাবাড়ী ইউনিয়নের বড় পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৬ জন। কিন্তু এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির সংখ্যা মাত্র ৩ থেকে ৪ জন!

ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ভূতের ভয় বিরাজ করায় এরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফেরাতে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকদের অব্যাহত প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হচ্ছে। আর এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়া একমাত্র কারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভূত আতঙ্ক!

এই ভূতের ভয়ের কারণে চলতি মাসের ৭ তারিখ থেকে প্রতিদিনই শ্রেণীকক্ষ পুরোটাই ফাঁকা থাকে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় অভিভাবকদের এরই মধ্যে সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে।school_1_524487584সর্বশেষ শনিবার সকালে এই বিষয়ে স্কুলে বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়।

সরেজমিন গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৬ সেপ্টেম্বর ক্লাস চলাকালীন সময় এক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে যায়। তখন সে তার হাত জ্বালা-পোড়া করছে জানালে শিক্ষকরা তার শরীরে পানি ঢেলে সুস্থ করার চেষ্টা করে। কিন্তু উন্নতি না হওয়ায় তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

চলতি মাসের ৪ অক্টোবর ক্লাস চলাকালীন সময় লিপিটি ত্রিপুরা এবং বলিকা ত্রিপুরা নামে ৪র্থ শ্রেণীর আরো দু’জন ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ার পর থেকে শিক্ষার্থীরা ভয়ে আস্তে আস্তে স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়।school_022_589815433শনিবার সকালে স্কুলে আসে মোট ৫ জন শিক্ষার্থী। এরমধ্যে মাইকেল ত্রিপুরা ও রাজু ত্রিপুরা নামের দুই শিক্ষার্থী জানায়, আমাদের ক্লাসের কয়েকজনকে ভূতে ধরায় আমরা আর স্কুলে আসিনা। আজকে স্যাররা বলাতে বাবার সঙ্গে স্কুলে আসছি।

বড় পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা বিপুলী বড়ুয়া জানান, ক্লাসে ছাত্রী অসুস্থ হওয়ার ঘটনাকে স্থানীয়রা ‘ভূত ধরেছে’ বলে গুঞ্জন ছড়াচ্ছে। ইতিমধ্যে স্থানীয়রা নিজ ধর্মের বিশ্বাস মতে ওঁঝা এনে ঝাড় ফুকুর করছে। এখন ভয়ে বেশ কিছুদিন ধরে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসছেনা। সামনে সমাপণী পরীক্ষা। এভাবে চলতে থাকলেতো পরীক্ষাও নেওয়া যাবেনা।

এদিকে শনিবার সকালে শিক্ষক ও স্কুল পরিচালনা কমিটির সঙ্গে অভিভাবকদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।khagrachari_pic_7_971119744বৈঠকে আসা স্থানীয় বাসিন্দা যোগেন্দ্র ত্রিপুরা ও নগেন্দ্র ত্রিপুরা জানান, কয়েকজন অসুস্থ হওয়ার পর থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। এখন স্কুলে এলে তারা আবার অসুস্থ হবেনা তার গ্যারান্টি কি। তাই আপাতত মেয়েদের স্কুলে পাঠাবোনা।

বড় পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শংকরী সাহা জানান, ক্লাসে কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়াকে স্থানীয়রা ভিন্নভাবে নিচ্ছে। যার কারণে আতঙ্কে-ভয়ে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছে না। স্কুল কার্যক্রম এখন মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। স্কুলের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আমাদের চেষ্টা চলছে।school_5_382535862স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি থৈইহ্লাপ্রু মারমা বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরাও চিন্তিত। অনেক দিন ধরে স্কুলে ক্লাস হচ্ছেনা। সামনে ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষা। অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেও লাভ হচ্ছেনা। তারা কিছুতেই সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে রাজি হচ্ছেনা। তারপরও আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাসিরুল্লা সাইকো থেরাপি ইউনিটের কো-অর্ডিনেটর সাবিহা জাহান এ প্রতিবেদককে জানান, অসুস্থতার ধরণ শুনে প্রাথমিকভাবে রোগটিকে মাস হিসটেরিয়া (mass hysteria) বলে মনে হচ্ছে। এই রোগটি যদি হয় আর শারীরিক কোনো সমস্যা না থাকলে তাহলে অসুস্থদের শরীর জ্বালা পোড়া করবে, হাত অবশ হয়ে যাবে, কানে শুনবেনা, অজ্ঞান হয়ে যাবে।Innner_03_434546486আর গ্রামবাসীরা যেহেতু ওঁঝা, বৈদ্যে বিশ্বাসী তাই তারা ধারণা করে নিচ্ছে অসুস্থদের অলৌকিক কিছু পেয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত যাচাই করা দরকার বলেও তিনি জানান।