মহাসড়কে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনাঃ ৩৮ জনের প্রাণ হরণ

রাজশাহী রাজশাহী বিভাগ

আজ মঙ্গলবার বড়াইগ্রাম ট্র্যাজেডি দিবস। ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর নাটোরের বড়াইগ্রামের রেজুর মোড়ে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় ৩৮ জন প্রাণ হারান। এ ঘটনায় গুরুদাসপুর উপজেলার সিধুলী গ্রামের ৬ সহোদরসহ নিহত হন ১৪ জন। বছর পেরিয়ে গেলেও নিহতদের পরিবারে হাহাকার থামেনি। প্রিয়জন হারানোর ব্যথা এখনও কান্না হয়ে ঝরছে তাদের চোখে। নিহতদের পরিবারগুলোকে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ১ লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল সে সময়। এরপর এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই সহায়তা পাননি পরিবারের সদস্যরা। অনেকে পেয়েছেন ঘোষণার অর্ধেক অর্থ
গত বছরের ২০ অক্টোবর একটি জোড়া খুনের মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়ে সিধুলী গ্রামের মৃত মফিজ মণ্ডলের ৭ ছেলে আতাহার (৭০), রায়হান (৬৫), রব্বেল (৬১), সোহরাব (৫৮), আবদুর রহমান (৫০), ছহির উদ্দিন (৪৫) ও কহিরসহ (৪২) অন্তত ৩০ জন নাটোর থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। তাদের বহনকারী অথৈ পরিবহনের বাসটিতে ছিলেন আরও অন্তত ৩০ যাত্রী। অনেকে বসেছিলেন বাসের ছাদে। বড়াইগ্রামের রেজুর মোড় এলাকায় বিপরীতমুখী কেয়া পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ৭ ভাইয়ের মধ্যে ৬ জনসহ ৩৮ জন নিহত হন। আহত হন অন্তত ৪০ জন। নিহতদের মধ্যে ১৪ জনই ছিলেন সিধুলী গ্রামের।
মণ্ডল পরিবারের সাত ভাইয়ের মধ্যে একমাত্র আবদুর রহমান মণ্ডল প্রাণে রক্ষা পান। সমকালকে তিনি জানান, চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে স্থায়ী পঙ্গুত্ব মেনে নিতে হয়েছে তাকে। ওই দুর্ঘটনায় আহত সিধুলী গ্রামের ইউনুস আলী (৪৫) জানালেন, জমি বিক্রি করে ভারতের চেন্নাইয়ে গিয়ে ভাঙা মেরুদণ্ডের চিকিৎসাও করিয়েছেন। কিন্তু সুফল পাননি। কৃষক ফারুক আহমেদের (৩৭) ভাঙা হাত ঠিক হয়নি গত এক বছরেও। জহুরুল নামে আহত এক যুবকের মা জামেলা বলেন, ছেলে হাসপাতালে থাকতে ২০ হাজার টাকা অনুদান পান। তারপর আর কিছু পাননি। জমি বিক্রি করে ছেলের চিকিৎসা করিয়ে এখন বাস করছেন সরকারি জমিতে। পেট চালাতে বেছে নিয়েছেন ভিক্ষার পথ।
দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারগুলোকে ১ লাখ টাকা করে সরকারি সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঘোষণা বাস্তবায়ন হয়নি এক বছরেও। কেউ পেয়েছেন অর্ধেক টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, সহায়তার অর্থ পেতে বারবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ উপজেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েও লাভ হয়নি। সিধুলী গ্রামের নিহত শরীফের স্ত্রী বিউটি ও আজাদের স্ত্রী মছিরন ৫০ হাজার করে টাকা পেয়েছেন। বাকি টাকার জন্য অনেক ঘুরেও লাভ হয়নি জানিয়ে বিউটি বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। সন্তানদের ভরণ-পোষণের জন্য এখন তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করেন।
সিধুলী গ্রামের নিহত লাবুর স্ত্রী রাশিদা সহায়তার পুরো টাকা পেয়েও আছেন বিপদে। সমকালকে তিনি জানান, ১ লাখ টাকা পেয়ে দুই মেয়ের নামে ব্যাংকে রেখে দেন। কিন্তু সেই টাকার ভাগ দাবিতে শাশুড়ি ও ভাসুর নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। বাধ্য হয়ে মেয়েদের নিয়ে বাবার বাড়ি ফিরে এসেছেন রাশিদা।
সিধুলী গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আলাল উদ্দিন জানান, সরকারি অনুদানের পাশাপাশি নিহতের পরিবারকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ভিজিএফএর চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আহতদের কোনো সাহায্য দেওয়া হয়নি। তবে নাম ভুলের কারণে অনেকে সরকারি সহায়তার অর্ধেক ৫০ হাজার টাকা পাননি বলে জানিয়েছেন এই ইউপি সদস্য।
নাটোরের জেলা প্রশাসক মশিউর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে নিহত ৩৮ জনের পরিবারকে বরাদ্দকৃত ১ লাখ টাকা দুটি চেকের মাধ্যমে নিহতের স্ত্রী ও বাবার নামে দেওয়া হয়। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে মৃত বাবার নামে চেক ইস্যু হওয়ায় সহায়তার ৫০ হাজার টাকা পাননি। চেক সংশোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। অচিরেই সবাই টাকা পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। আহত ব্যক্তিদেরও নানাভাবে সহায়তা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। টাকার কারণে কাউকে নির্যাতনের খবর জানেন না উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ঘটনা জেনে ব্যবস্থা নেবেন।
এদিকে দুর্ঘটনার পর নাটোরের তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আলীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে দুর্ঘটনার তিনটি কারণ উল্লেখ করে ১৭টি সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি। সেসব সুপারিশ এখনও আলোর মুখ দেখেনি। বনপাড়া হাইওয়ে থানা সূত্র জানায়, বড়াইগ্রাম ট্র্যাজেডির পর গত এক বছরে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের নাটোর অংশে আরও প্রায় ২০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণহানি ঘটেছে অন্তত ৬০ জনের। বনপাড়া হাইওয়ে থানার ওসি আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। বেশ কিছু যানবাহনকে সতর্ক করা হয়েছে। এ ছাড়া যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশ কাজ করছে।