যাত্রার নায়িকা থেকে ফেরিওয়ালা

বিচিত্র

বোমাবাজি আর অশ্লীলতার জন্যেই এখন যাত্রাপালা হয় না। আমরাও কোনো অনুষ্ঠানে যেতে পারি না। তাই বাধ্য হয়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাপড় বিক্রি করি, না হয় বাসাবাড়িতে কাজ করি। এভাবেই চলছে জীবন।

বেশ আক্ষেপ নিয়ে দিনাজপুর জেলা সদরের নিমনগর ঢাকাইয়া পট্টির ঝুপড়ি ঘরে বসে কথাগুলো বলছিলেন এক সময়ে যাত্রার নামকরা নায়িকা সাজেদা বেগম।

বলেন, আগে সামাজিক ছিলো, এখন অসামাজিক হয়ে গেছে। তাই কেউ যাত্রা দেখে না। যা হয় তা যাত্রা না, অশ্লীলতা।

সাজেদা বেগমের স্বামী মৃত গণি মিয়া। তিনিও যাত্রাদলে বাঁশি বাজাতেন। নাম করা ব্যান্ডপার্টি ছিলো তার, গণি মিয়া ব্যান্ড পার্টি। ক’বছর হলো স্বামী মারা গেছেন। যাত্রার সে ধরনের অনুষ্ঠানও হয় না। এক ছেলে আছে সেও খোঁজ-খবর নেয় না। তাই নীরবেই কষ্টে দিনাতিপাত করছেন সাজেদা। ঢাকাইয়া পট্টিতে শুধু সাজেদাই নন, তার মতো অবস্থা রোজিনা, সোনাবান, লাকি, ঝরনা, রেহেনা, মোতালিব, হেমেন্দ্রদের মতো অনেক যাত্রাশিল্পীর।

কেউ যাত্রাপালা ছেড়ে অটোরিকশা চালাচ্ছেন তো কেউ কাঠমিস্ত্রির কাজে নিয়োজিত। কেউ কেউ আবার ঢাকায় গিয়ে তৈরি পোশাকসহ অন্য পেশায় ‍যুক্ত হচ্ছেন।

পঞ্চাশোর্ধ্ব সাজেদা বলেন, এখন আমি নায়িকা কিংবা সাইট নায়িকার রোল পাই না। তবে মাদারের ভূমিকায় যেতাম। কখনও মেয়ে (নারী যাত্রাশিল্পী) নিয়ে গেলে কমিশনও পেতাম। কিন্তু গত তিনবছর ধরে কোথাও যাওয়া হয় না। এখন মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় যাই, কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে পুরান কাপড়ের ব্যবসা করে কোনোমতে চলি।

তিনি বলেন, শখ করে এখন মাঝে মধ্যে কোনো অনুষ্ঠান করলেও বেশ ভয়ে ভয়ে থাকে মানুষ। আগে মেয়েরা দিনে একবেলা খাওয়ারও সময় পেতো না।

লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম ধারা যাত্রাপালার দূরাবস্থা প্রসঙ্গে এ শিল্পী বলেন, এখন থানায় কনট্রাক্ট করতে হয়, নিরাপত্তা দিতে হয়। বিদেশি গান-সিনেমা মোবাইলে পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া নানা ঝামেলা করে কেউ আর আসতে চায় না।

স্মৃতির ঝাঁপি মেলে ধরে এক সময়ের যাত্রার ক্রেজ এই শিল্পী বলেন, ভ্যারাইটি শো-তেও যেতাম। জীবন নদীর তীরে, মা হারা সন্তান, জেল থেকে বলছি, রূপবান, কাশেম মালার প্রেম, মা মাটি প্রেম ইত্যাদি সামাজিক যাত্রাপালা অসংখ্যবার করেছি। কিন্তু এখন নৃত্য আর নাচ-ই বেশি হয়। যাত্রা বলতে তাই বুঝায় এখন। ঢাকা, চট্টগ্রামের শিল্পীরা এসে অশ্লীল নৃত্য করে এখানকার পরিবেশটা নষ্ট করেছে।

তার ভাষায়, শিল্পীদেরও দোষ নেই, তারা জীবিকার প্রয়োজনে এ পন্থা নিয়েছে। আর দর্শকও এসব দেখে, সামাজিক যাত্রাপালায় তাদের আগ্রহ নেই। আমাদেরও অনেকে বলেন-নৃত্যের মেয়ে আছে কিনা। কিন্তু আমাদের তো নেই। কারণ শিল্পীরা কখনও এসব করবে না। তাই না করে দেই, যেতেও পারি না।

বাদ্যযন্ত্র বিষয়ে যাত্রাশিল্পী মোহাম্মদ আলী বলেন, এখন সাউন্ড সিস্টেম বাইরে থেকে নিয়ে আসে। আগে আমাদের সঙ্গেই কনট্রাক্ট ছিলো। এখন আর এসবের প্রয়োজন হয় না। বর্তমানে বিদেশি গান, সিনেমা আমাদের ছেলে-মেয়েদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। কেউ দেশীয় যাত্রাপালা দেখে না। সবাই উচ্ছৃঙ্খলতাই দেখে

এ প্রসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক আবু হোসেন চৌধুরী বলেন, এটি আমাদের ঐতিহ্যের একটি অংশ। কিন্তু নানা পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আর আগ্রহের অভাবে এটি হারিয়ে যেতে বসেছে। আমাদের এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

খবরঃ বাংলানিউজ

2 thoughts on “যাত্রার নায়িকা থেকে ফেরিওয়ালা

Comments are closed.