রক্তের দাগ শুকোচ্ছে না রাবিতে

ক্যাম্পাসের খবর রাজশাহী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) হত্যার মিছিল থামছেই না। একের পর এক শিক্ষক হত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে। গত এক যুগে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষক নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ শনিবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে মহানগরীর শালবাগান এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

এর দুই বছর আগে ২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন চৌদ্দপাই এলাকায় নৃশংসভাবে খুন হন রাবি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর শফিউল ইসলাম।

প্রফেসর শফিউল ইসলাম লালন ভক্ত ছিলেন। তিনি মুক্তমনা ও প্রগতিশীল আদর্শের অনুসারী হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত। এ হত্যার পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে ফেসবুক  পেজে হত্যার দায় স্বীকার করে স্ট্যাটাস দেয় জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ। অবশ্য পরে জঙ্গি সংশ্লিষ্টটা পায়নি পুলিশ।

পরের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এন্তাজুল হক বাদী হয়ে অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে মতিহার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ২৩ নভেম্বর এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে যুবদল নেতা আব্দুস সামাদ পিন্টুসহ ৬ জনকে আটক করে র‌্যাব।

পরে পিন্টুর স্ত্রী নাসরিন আখতার রেশমাকে আটক করে রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা শাখা পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে রেশমা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

এ হত্যা মামলার কয়েকবার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়। পরে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক রেজাউস সাদিক চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে ১১ জনের নাম উল্লেখ ছিল।

আদালতে দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের  জের ধরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এখানে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ মেলেনি।

এর আগে ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস তাহের আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা থেকে নিখোঁজ হন। পরে দুই দিন পর ৩ ফেব্রুয়ারি বাসার পেছনের সেফটিক ট্যাংক থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে আদালত বিভাগের এক শিক্ষক, এক শিবির নেতাসহ চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন।

পরে ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। আর অন্য দু’জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা  হলেন- ড. তাহেরের সহকর্মী একই বিভাগের শিক্ষক ড. মিয়া মো. মহিউদ্দিন এবং ড. তাহেরের বাসার তত্ত্বাবধায়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম।

এর দুই বছর আগে ২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ভোরে প্রাতঃভ্রমণে বের হলে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুরের নিজ বাসভবনে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইউনুস।

এ ঘটনায় তার ছোট ভাই আব্দুল হালিম বাদী হয়ে ওইদিন মহানগরীর মতিহার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সিআইডি পুলিশ মামলার তদন্ত শেষে ৮ জেএমবি সদস্যকে আসামি করে এ মামলার চার্জশিট দাখিল করে। পরে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ছয়জনকে বেকসুর খালাস দিয়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয় রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল আদালত।

শনিবার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন আরেক শিক্ষক প্রফেসর রেজাউল করিম। শনিবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে কিছুটা পথ এগোতেই গলির মধ্যে দুর্বৃত্তরা তার ওপর হামলা চালায়। তাকে পেছন থেকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপকমিশনার একেএম নাহিদুল ইসলাম বলেন, হামলার ধরন ও আলামত দেখে মনে হয়েছে কেনো জঙ্গি সংগঠন এই হামলায় জড়িত।

ঢাকায় ব্লগার হত্যাকাণ্ডগুলোর হামলার ধরনের সঙ্গে এই হামলার ধরণের মিল রয়েছে। আমরা বিষয়টি খুবই গুরুত্বসহকারে দেখছি। হত্যার মোটিভ উদঘাটন ও জড়িতদের চিহ্নিত করতে সিআইডি ও পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট পিবিআই একসঙ্গে কাজ করছে বলে জানান তিনি।

এদিকে, একের পর এক শিক্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এবার ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন রাবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দীকি হত্যার প্রতিবাদে দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রোববার (২৩ এপ্রিল) স্বত:স্ফূর্ত ছাত্র ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানিয়েছেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

রাবি ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তমাশ্রী দাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটতেই থাকলে আমরা যাবো কোথায়। আগের হত্যাকাগুলো সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় হামলাকারীরা উৎসাহ পাচ্ছে। রাবির শিক্ষক হত্যা যেন মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।তমাশ্রী দাস বলেন, একের পর এক প্রগতিশীমনা মানুষ খুন হবেন আর আমরা নিশ্চুপ হয়ে দেখে যাবো, তা হতে পারে না। এ সময় তিনি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তুমূলক শাস্তির দাবি করেন।

রাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘বিভাগের সবাই একবাক্যে বলবো শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন প্রফেসর রেজাউল করিমG

এত ভালো একজন মানুষ এভাবে মারা যাবেন তা কিভাবে মেনে নেবো।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যেন বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। এখানে একের পর এক শিক্ষক হত্যার ঘটনা ঘটছে। আমরা আর কোনো হত্যা দেখতে চাই না। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই দ্রুত এসব হত্যকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হোক।’

খবরঃ বাংলানিউজ