রাজশাহীতে আগুনমুখো আবহাওয়ায় হাঁসফাঁস

রাজশাহী

বৈশাখ পেরিয়ে জ্যৈষ্ঠ। মাঝখানে একটি মাস চলে গেছে। কিন্তু অসহনীয় গরমে কোনো তারতম্য ঘটেনি। মাথার উপরের আকাশটা যেন তাপানো কড়ই হয়ে উঠেছে।

রুদ্র প্রকৃতি যেন তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ছে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত, একই মাত্রায় তাপ নামছে। ঘর থেকে বের হলেই লু হাওয়া গায়ে জ্বালা ধরাচ্ছে। আগুনমুখো আবহাওয়ায় জনজীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে। মানুষের পাশাপাশি পশু-পাখিরাও হাঁসফাঁস করছে। ঘরে অথবা বাইরে কোথাও শান্তির লেশমাত্র নেই।

টানা তাপপ্রবাহে উত্তরের শহর রাজশাহীর জনজীবন এমনই অসহনীয় হয়ে উঠেছে। অগ্নিক্ষরা দহনে সবুজ নিসর্গ যেন তামাটে বর্ণ ধারণ করছে। দীর্ঘ সময় থেকেই তাপদাহ বয়ে চলেছে এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে। এই গরমেই যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাতে মাঝারি তাপপ্রবাহ শুরু হলে প্রাণ যাওয়ার উপক্রম হবে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের।

সূর্যের প্রখর কিরণে এখনই খালি মাথায় বাইরে বের হওয়া দায় হয়ে পড়েছে। তাপমাত্রার পারদ কেবল উপরেই উঠছে। আবহাওয়া অফিস বলছে, এই তাপপ্রবাহ আরও ৩/৪ দিন থাকতে পারে। এ সময় বাড়তে পারে তাপমাত্রাও। গরমে অতিষ্ঠ কাকও। ছবি: শরীফ সুমন

ফলে বাড়তি গরম নিয়ে উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছেন পদ্মাপাড়ের মানুষ। এরই মধ্যে রোববার (২১ মে) রাজশাহীতে আবারও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে গত ১৯ মে একই তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। যা এখন পর্যন্ত চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বলে জানাচ্ছে আবহাওয়া অফিস।

ফলে এই তাপপ্রবাহে রাজশাহীর শ্রমজীবী মানুষের কষ্টের সীমা চরমে পৌঁছেছে। অসহনীয় গরমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেকেই হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন। মহানগরীজুড়ে প্রকোপ বেড়েছে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের। ঘরে-ঘরে শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। গাছে থাকা আম ও লিচু শুকিয়ে ঝরে যাচ্ছে। আর বরেন্দ্র অঞ্চলের বিস্তীর্ণ সবুজ ফসল বিবর্ণ আকার ধারণ করেছে।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত আবহাওয়া কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, সাধারণত ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রির মধ্যে তাপমাত্রা থাকলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলা হয়। ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রিতে উঠলে মাঝারি তাপপ্রবাহ, আর ৪০ থেকে ৪২ এর ওপরে উঠলে তীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়। বর্তমানে রাজশাহীর ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। রোববার দুপুর ৩টায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এর আগে গত ১৫ ও ১৬ মে ৩৩ দশমিক ০৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৭ মে ৩৪ দশমিক ০৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৮ মে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৯ মে ৩৭ দশমিক ০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০ মে ছিল ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।তীব্র গরমে শান্তির খোঁজ। ছবি: শরীফ সুমন

এক প্রশ্নের জবাবে আশরাফুল আলম বলেন, বেশী সময় ধরেই রাজশাহীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বাড়ছে। এর আগে ২০০৫ সালের ১২ জুন রাজশাহীতে মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর পর ২০১২ সালের ৪ জুন রেকর্ড হয় ৪২ ডিগ্রি। আর ২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৪ সালের ২১ মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ৪২ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৫ সালের ২২ মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ২০১৬ সালের ২৯ এপ্রিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

মূলত ১৯৪৯ সাল থেকে বাংলাদেশে তাপমাত্রার রেকর্ড শুরু হয়। এর মধ্যে ১৯৭২ সালের ১৮ মে এই রাজশাহীতেই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, তীব্র গরমের কারণে ডায়রিয়া, জ্বর, সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই। এসব রোগে বয়ষ্ক ও শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের সংখ্যাও বাড়ছে।

এ সময় বৃদ্ধ ও শিশুদের রোদে না বের হয়ে ঠাণ্ডা পরিবেশে থাকার পরামর্শ দেন ডা. আজাদ। এছাড়া তৃষ্ণা মেটাতে পথে-ঘাটের অস্বাস্থ্যকর কোমল পানীয়, আখের রস, বরফ দিয়ে তৈরি লেবুর শরবত ইত্যাদি পান না করে বিশুদ্ধ পানি, ডাব পান ও দেশি ফলমূল বেশি খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

খবরঃ বাংলানিউজ