রাজশাহীতে আরও একটি নতুন পাখি, “চিতিঠুঁটি গগনবেড়”

রাজশাহী

পাখিটির নাম চিতিঠুঁটি গগনবেড়। বিশ্বে সংকটাপন্ন। বাংলাদেশে উনিশ শতকে দেখা যেত। এখন নেই। এই প্রজাতির একটি পাখিকে গত মঙ্গলবার বৃষ্টিভেজা বিকেলে রাজশাহীতে পদ্মা নদীর চরে দেখা গেছে। পাখিবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কেউ এই পাখি দেখেননি। পাখিটি ক্যামেরাবন্দী করেছেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্য হাসনাত রনী।

চিতিঠুঁটি গগনবেড়ের ইংরেজি নাম Spot billed Pelican (Grey Pelican)। পাখিটি যখন ওড়ে তখন এর বিশাল পাখা যেন পুরো গগনকেই বেড় দিয়ে ফেলে! এ জন্য বাংলা নামটা এ রকম হয়েছে। গগনবেড়ের আরওএকটি প্রজাতি রয়েছে—বড় ধলা গগনবেড়। এই প্রজাতি অবশ্য বিশ্বে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক বলেন, এর আগে বাংলাদেশে এই পাখি কেউ দেখেননি। তিনি পৃথিবীর অন্য দেশে অনেক দেখেছেন। হাসনাত রনী তাঁকে মুঠোফোনে এই পাখির ছবি পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, গগনবেড় বড় ঠোঁটভরে পানি তোলে। তারপর ঠোঁট চেপে পানি বের করে দেয়। ঠোঁটের ভেতরে মাছটা থেকে যায়। এভাবে সে আহার করে কিন্তু বাংলাদেশে এখন এক ঠোঁট নয়, এক গামলা পানি তুললেও একটা ছোট মাছ পাওয়া যায় না। এ জন্যই সারা বিশ্বে ওদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

চিতিঠুঁটি গগনবেড় ঝুঁটিদার ঘাড় ও তিলাভরা ঠোঁটের বড় জলচর পাখি। এই প্রজাতির একটি পরিণত পাখির দৈর্ঘ্য ১৫২ সেন্টিমিটার, ওজন ৫ কেজি, ডানা ৫৫ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ৩৩ সেন্টিমিটার, পা ৮ দশমিক ৭ সেন্টিমিটার ও লেজ ১৮ দশমিক ২ সেন্টিমিটার। প্রজনন ঋতুতে প্রাপ্তবয়স্ক এই পাখির দেহ ধূসর, মাথা, ঘাড়, পিঠ ও ডানার পালকের আগা কালো। কোমর দারুচিনি-পাটকিলে। ঘাড়ের পেছনে খাটো ঝুঁটি রয়েছে। দেহতল কিছুটা পাটকিলে-সাদা। চোখের সামনের চামড়া কিছুটা বেগুনি। চক্ষুগোলকের চামড়া কিছুটা কমলা-হলুদ ও পাটকিলে।

এরা বড় জলাশয়, মোহনা ও উপকূলে বিচরণ করে। এর খাদ্যতালিকায় রয়েছে মাছ ও চিংড়িজাতীয় প্রাণী। শিকারের সময় সংঘবদ্ধ হয়ে অগভীর পানিতে মাছের ঝাঁক ঘিরে ফেলে। মাঝে মাঝে ঘোঁত ঘোঁত করে কিংবা ব্যাঙের মতো কর্কশ গলায় ডাকে। সেপ্টেম্বর-এপ্রিল মাসে প্রজননকালে পানির ধারে দল বেঁধে গাছে বাসা বাঁধে। বাসায় ৩-৪টি ডিম পাড়ে। ৩০ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা ওঠে। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (পাখি) বইতে এই পাখি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘চিতিঠুঁটি গগনবেড় বিশ্বে সংকটাপন্ন বলে বিবেচিত। বাংলাদেশে বন্য প্রাণী আইনে সংরক্ষিত। উনিশ শতকে ঢাকা বিভাগে পাওয়া যেত। এখন নেই। ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।’

পাখিটির ছবি তুলেই হাসনাত রনী পাখি বিশেষজ্ঞদের কাছে ছবি পাঠানো শুরু করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা ছবি দেখে নিশ্চিত করেন, এটি ‘চিতিঠুঁটি গগনবেড়’।

দুবাই চিড়িয়াখানার কিউরেটর প্রাণিবিজ্ঞানী ড. রেজা খান তাঁর ফেসবুক মেসেঞ্জারে লেখেন, ‘Tons of Congratulations. It’s a record for a life time.

গত ৫ মে হাসনাত রনী একই চরে আরও একটি নতুন পাখি আবিষ্কার করেন। তাঁর দেখার পর বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব পাখিটির নামকরণ করে ‘খয়রাটুপি বাটকুড়ালি’।

এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্যরা সাইক্সের রাতচরা পাখিটিও রাজশাহীতে আবিষ্কার করেন।

খবরঃ প্রথম-আলো

7 thoughts on “রাজশাহীতে আরও একটি নতুন পাখি, “চিতিঠুঁটি গগনবেড়”

  1. এসব খবর আমাদের জীববৈচিত্র সংরক্ষনের জন্য খুবই আনন্দের । যেহেতু শুধু রাজশাহীর চরেই একাধিক হারিয়ে যাওয়া পাখি গুলো নতুন করে আবিস্কৃত হয়েছে তাই রাজশাহীর সেই সব চরকে এখনই সরকারি ভাবে সংরক্ষিত চরের ঘোষনা দেওয়া উচিত । যাতে ভবিষ্যতে চর গুলোকে বনায়নের মাধ্যমে তাদের নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি করা যায় । এসব সংরক্ষনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাজশাহীতে ইকো-ট্যুরিজমকেও এগিয়ে নেওয়া যাবে ।

Comments are closed.